-তারপর?
-মির্জা এই নিকাহ মেনে নিতে পারেননি। আবার সেই বড়লোকের বাড়িতে বন্দি হওয়া। মির্জা তো নিজেই বলেছেন, আমার পায়ে শেকল পরানো হল। জস্ দওয়া অওর পাওঁ কী বেড়ি, মান্টোসাব লিখেছেন, এইসব বিয়ে-ফিয়ে নিয়ে একটা অধ্যায় লেখার কোনও মানেই হয় না। কিন্তু জমিয়ে তো লেখা যেত। অভিজাত মুসলিম পরিবারের বিয়ে। হাতি, ঘোড়া, পাল্কি, রোশনচৌকি, নাচা-গানা, বাঈ শরাব। আর মান্টোসাব কিছুই লিখলেন না?
-আর কিছু লিখেছেন?
-না। …ওঁ হ্যাঁ, একটা গল্প লেখা আছে।
-গল্প?
-শ্বশুর মারফকে নিয়ে।
-বলুন, শুনি।
-বেশ মজার গল্প। মারুফসাব একদিন মির্জাকে তাঁর বংশতালিকা নকল করে দিতে বললেন। মির্জা নকল করে দিলেন ঠিকই, কিন্তু প্রথমজনের পর তৃতীয়জন, তারপর পঞ্চম-এইভাবে। দ্বিতীয়, চতুর্থ পুরুষদের বাদ দিয়ে গেলেন। মারুফসাব তো নকল দেখে রেগে কাঁই। এ কী করেছ তুমি মিঞা? মির্জা শান্ত গলায় বললেন, বংশতালিকা তো একটা মই ছাড়া কিছু নয়। এই মই বেয়েই তো আল্লার কাছে পৌঁছতে হয়। মাঝে মাঝে দুএকটা ধাপ বাদ গেলে ক্ষতি কী? আপনাকে একটু কষ্ট করে উঠতে হবে, এই আর কী!
-তারপর?
-মারুফসাব রেগে বংশতালিকার নকলটা ছিঁড়ে ফেললেন। মির্জাও তখন মুচকি হাসছেন।
-মান্টোসাব আর কিছু লেখেন নি?
-না।
-পাগল। চ্যাপ্টারটা লিখতেই পারতেন।
-কেন?
-নবাবের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে। কত স্কোপ ছিল বলুন তো? বাঙালি নভেলিস্টরা পেলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। চার পাতা জুড়ে উমরাও বেগমের সৌন্দর্যের বর্ণনা। তারপর দশ পাতা বিয়ের ডেসক্রিপশন। ইতিহাস থেকে ডিটেল খুঁজে খুঁজে এনে একেবারে টু টু দ্য লাইফ বর্ণনা। ভাবা যায়? পাঠককে গেলানোর মশলামুড়ি। মান্টোসাব এটাই লিখলেন না। প্রথম দেখার প্রেম থাকত -বড় বড় ডায়লগ লিখতে পারতেন, যাতে–
-আপনি বিশ্বাস করেন?
-কী?
-এইভাবে লেখা?
-তবসুম
সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি তাঁর দৃষ্টিপথে হাজার সারস উড়ে যাওয়ার ছবি দেখতে পাই। তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আয়নায় তবসুমের প্রতিচ্ছবি দেখি।
-উপন্যাস কেন লেখা হয় তবসুম?
-কেন?
-অন্ধকারের ভেতরে অনেক কণ্ঠস্বর শোনার জন্য।
-কাদের কণ্ঠস্বর?
-যাদের আমরা চিনি না।
-তার মানে, নভেলিস্ট তাঁর চরিত্রদের চেনে না?
-না।
-তা হলে মান্টোসাব তা হলে কেন মির্জাকে নিয়ে লিখছিলেন?
-মির্জাকে চিনতেন না বলে।
-উপন্যাস লেখার পর চিনতে পারবেন?
-না।
-তা হলে মান্টোসাবের উপন্যাস কোথায় পৌঁছবে?
-কোথাও না।
-আর মির্জা?
-তিনিও থাকবেন না। একটা ছায়া পড়ে থাকবে।
-কার?
-অনেকের। যারা আর কেউ নেই। তবসুম, আমি এই জন্য আর উপন্যাস লিখতে পারি না। অনেক কঠিন জিনিস আমি সহ্য করতে পারি। একটা ছায়া পড়ে আছে, আমি তাকে বইতে পারি না। চলুন, পরের চ্যাপ্টার থেকে শুরু করা যাক।
-আজ থাক। চলুন, আজ একটু কফি খেয়ে আসা যাক।
আমি সেই আয়ানায় তবসুমকে দেখি। কফি খেতে যাওয়ার কথা বলে সে কেমন নাচের ছন্দে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত ডানার মতো মেলে দেয়।-কফি ভালবাসেন তো?
-হুঁ।
-আপনাকে আজ একটা স্পেশাল কফি খাওয়াব।
-মির্জাকে ছেড়ে কফি খেতে যাওয়াটা কি ঠিক? একটু সুরাপান করলেই কি ওনার প্রতি সম্মান জানানো হত না? আমি হেসে বলি।
-সে তো আমার সঙ্গে হওয়ার নয়, জনাব।
আমি এমন কফি শপে কখনও আসি নি। এ শহরে নতুন গজিয়ে ওঠা মুশায়েরা যেন। তবে এখানে হাফিজসাব বলতে পারবেন না,
সুবহস্ত সাকিয়া কদহ
পুর শরাব কুন
দোরে ফলক দিরেগ
নদাবদ শিবকুন।
(চেয়ে দেখো, সাকি, রাত্রি পোহায়
দাও মদিরায় ভরে এ পেয়ালা
ঊর্ধ্বে সমানে দে দৌড় দে দৌড় তাড়াতাড়ি করো, বয়ে যায় বেলা) এখানে বসা যায়, তাকিয়ায় হেলান দিয়ে আধশোয়া হওয়া যায়। কফিশপ জুড়ে হাল্কা ভেসে বেড়ায় জোন বেজ বা কখনও কৈলাস খের; কখনও বেজে ওঠে এক ফেরারি মন-এর গান। তবসুম যে কফির অর্ডার দেয় তার নাম ব্ল্যাক কফি উইথ হানি। কাচের দীর্ঘ পাত্রে সেই গভীর বাদামি তরল আসে। একটু চুমুক দিতেই আমার মুখের ভিতর যেন কোমল এক পাখির উড়াল। তার ডানায় ক্যারামেলের সৌরভ।
-কেমন? তবসুম চোখ নাচিয়ে বলে।
-য়ে ন হী হমারি কিসম কে বিসাল-এয়ার হোতা
অগর অওর জীতে রক্তে য়হী ইন্তজার হোতা।
-আই ব্বাস। কফির টেস্ট এইরকম না কি?
-আপনি লক্ষ্য করেছেন তবসুম
-কী?
-কফি যত ফুরিয়ে আসছে, সুধাসাগর যেন ফুলেফেঁপে উঠছে।
-তাই?
-হুঁ।
-মির্জার কেমন লাগত এই কফি?
-গালিব মিঞা হয়তো লিখতেন-
গালিব ছুটি শরাব পর অব্ ভি কভি কভি
পীতা হুঁ রোজ-এ অবর ব শ-এ-মাহতাব মে
কিন্তু আজ আমাকে এই অমৃতের স্বাদের কাছে কেন নিয়ে এলে তবসুম?
তবসুম অনেক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, কাল থেকে আমরা সত্যি সত্যিই দোজখে ঢুকব জনাব।
-তাই?
-পরের চ্যাপ্টারে গালিব দিল্লিতে আসছেন। সে এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়। মান্টোসাব কী করে লিখলেন? দিল্লিতে এসে মির্জার প্রথম কথাবার্তা হল মৃতদের সঙ্গে। মৃতেরা তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। পড়তে পড়তে আমি কেঁদে ফেলেছি। বড় নিষ্ঠুর মান্টোসাব।
আমি মুখের ভিতর ক্যারামেলের স্বাদ নিয়ে খেলতে থাকি।
০৯. শাহজাহানাবাদে আমি ঢুকেছিলুম
শিকবহ্-এ আব্লহ অভী সে মীর?
হ্যায় পেয়ারে হুনুজ দিল্লি দূর।।
(ফোসকা পড়ার কান্না এখন থেকেই মীর?
বন্ধু, দিল্লি এখনও যে অনেক দূর।।)
