গৌতমী নামে এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী ছিলেন, তাঁর পুত্র সর্পের দংশনে হতচেতন হয়। অর্জুনক নামে এক ব্যাধ ক্রুদ্ধ হয়ে সর্পকে পাশবদ্ধ করে গৌতমীর কাছে এনে বললে, এই সর্পাধম আপনার পুত্রহন্তা, বলুন একে কি করে বধ করব; একে অগ্নিতে ফেলব, না খণ্ড খণ্ড করে কাটব? গৌতমী বললেন, অর্জুনক, তুমি নির্বোধ, এই সৰ্পকে মেরো না, ছেড়ে দাও। একে মারলে আমার পুত্র বেঁচে উঠবে না, একে ছেড়ে দিলে তোমারও কোনও অপকার হবে না। এই প্রাণবান জীবকে হত্যা করে কে অনন্ত নরকে যাবে?
ব্যাধ বললে, আপনি যে উপদেশ দিলেন তা প্রকৃতিস্থ মানুষের উপযুক্ত, কিন্তু তাতে শোকার্তের সান্তনা হয় না, যারা শান্তিকামী তারা কালবশে এমন হয়েছে এই ভেবে শোক দমন করে, যারা প্রতিশোধ বোঝে তারা শত্রুনাশ করেই শোকমুক্ত হয় এবং অন্য লোকে মোহবশে সর্বদাই বিলোপ করে। অতএব এই সৰ্পকে বধ করে আপনি শোকমুক্ত হন। গৌতমী বললেন, যারা আমার ন্যায় ধর্মনিষ্ঠ তাদের শোক হয় না; এই বালক নিয়তির বশেই প্রাণত্যাগ করেছে, সেজন্য আমি সর্পকে বধ করতে পারি না। ব্রাহ্মণের পক্ষে কোপ অকর্তব্য, তাতে কেবল যাতনা হয়। তুমি এই সর্পকে ক্ষমা করে মুক্তি দাও। ব্যাধ বললে, একে মারলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা হবে, অপরাধীকে বিনষ্ট করাই উচিত।
ব্যাধ বার বার অনুরোধ করলেও গৌতমী সৰ্পবধে সম্মত হলেন না। তখন সেই সৰ্প মৃদুস্বরে মনুষ্যভাষায় ব্যাধকে বললে, মূখ অর্জুনক, আমার কি দোষ? আমি পরাধীন, ইচ্ছা করে এই বালককে দংশন করিনি, মৃত্যু কর্তৃক প্রেরিত হয়ে করেছি; যদি পাপ হয়ে থাকে তবে মৃত্যুরই হয়েছে। ব্যাধ বললে, অন্যের বশবর্তী হলেও তুমি এই পাপকার্যের কারণ, সেজন্য বধযোগ্য।
সর্প বললে, কেবল আমিই কারণ নই, বহু কারণের সংযোগ এই কার্য হয়েছে। ব্যাধ বললে, তুমিই এই বালকের প্রাণনাশের প্রধান কারণ, অতএব বধযোগ্য। সর্প ও ব্যাধ যখন এইরূপ বাদানুবাদ করছিল তখন স্বয়ং মৃত্যু সেখানে আবির্ভূত হয়ে বললেন, ওহে সর্প, আমি কাল কর্তৃক প্রেরিত হয়ে তোমাকে প্রেরণ করেছি, অতএব তুমি বা আমি এই বালকের বিনাশের কারণ নই। জগতে স্থাবর জঙ্গম সূর্য চন্দ্র বিষ্ণু ইন্দ্র জল বায়ু অগ্নি প্রভৃতি সমস্থই কালের অধীন, অতএব তুমি আমার ওপর দোষারোপ করতে পার না। সৰ্প বললে, আপনাকে আমি দোষী বা নির্দোষ বলছি না, আমি আপনার প্রেরণায় দংশন করেছি-এই কথাই বলেছি; দোষ নির্ধারণ আমার কার্য নয়। ব্যাধ, তুমি মৃত্যুর কথা শুনলে, এখন আমাকে মুক্তি দাও। ব্যাধ বললে, তুমি যে নির্দোষ তার প্রমাণ হল না, তুমি ও মৃত্যু উভয়েই এই বালকের বিনাশের কারণ, তোমাদের ধিক।
এমন সময় স্বয়ং কাল আবির্ভূত হয়ে ব্যাধকে বললেন, আমি বা মৃত্যু বা এই সর্প কেউ অপরাধী নই, এই শিশু নিজ কর্মফলেই বিনষ্ট হয়েছে। কুম্ভকার যেমন মৃৎপিণ্ড থেকে ইচ্ছানুসারে বস্তু উৎপাদন করে, মানুষও সেইরূপ আত্মকৃত কর্মের ফল পায়। এই শিশু নিজেই তার বিনাশের কারণ।
গৌতমী বললেন, কাল বা সর্প বা মৃত্যু কেউ এই বালকের বিনাসের কারণ নয়, নিজ কর্মফলেই এ বিনষ্ট হয়েছে, আমিও নিজে কর্মফলে পুত্রহীনা হয়েছি। অতএব কাল ও মৃত্যু প্রস্থান করুন, তুমিও সর্পকে মুক্তি দাও। গৌতমী এইরূপ বললে কাল ও মৃত্যু চলে গেলেন, ব্যাধ সৰ্পকে ছেড়ে দিলে, গৌতমীও শোকশূন্য হলেন।
উপখ্যান শেষ করে ভীষ্ম বললেন, মহারাজ যুদ্ধে যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁরা সকলেই কালের প্রভাবে নিজ কর্মের ফল পেয়েছেন, তোমার বা দুর্যোধনের কর্মের জন্য তাদের মরণ হয়নি। অতএব তুমি শোক ত্যাগ করো।
আজ আমি বুঝতে পারি, আমাদের সব কাজ নিয়তি নির্দিষ্ট পথে প্রভাবিত হচ্ছে। একটি সাপ লেজ থেকে নিজেকেই খেয়ে চলেছে। তার এই আত্মভক্ষণের, নিরাকরণের যেন শেষ নেই। আমি শুধু এক অদৃশ্যের আজ্ঞা পালন করছি। মনের জোর বলে যদি কিছু থাকে, তা কি কোনও কাজে আসে? এক গল্প থেকে আরেক গল্পের দিকে আমরা ঝরা পাতার মতো ভেসে যাই।
এরই মাঝে তবসুমের ফোন আসে।-কী ব্যাপার, জনাব? আপনার খুসবুটুকুও যে আর পাওয়া যায় না।
-এই-। কিছু না বলতে পেরে আমি হাসি।
-মান্টোর উপন্যাস কি এভাবেই পড়ে থাকবে?
-কেন?
-আপনার তো আর অনুবাদ করার গরজই নেই দেখছি।
-না-না-। আবার শুরু করতে হবে।
-কী হয়েছে আপনার?
-কিছু না।
তবসুমের হাসি আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
-এই এক আপনার কিছু না। মাঝে মাঝে কী যে কিছু না-তে পেয়ে বসে আপনাকে। কিছু না-টা কী বলুন তো।
-একটা সাদা পৃষ্ঠার সামনে বসে থাকা।
-মানে? এখনই তবসুমের চোখ দুটো নেচে উঠল, আমি দেখতে পাই। আর এই নেচে ওঠায় সঙ্গত করছে তার দুই চোখে আঁকা সুরমার রেখাবিন্যাস।
-সাদা পৃষ্ঠার সামনে বসে আছেন তো আছেনই। তারপর কখন ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে শুরু করল অক্ষর, ছবি।
-সেই অক্ষর কবে ফুটবে?
-আপনি বাশোর কবিতা পড়েছেন?
-কে বাশো?
-সপ্তদশ শতাব্দীর জাপানি হাইকু কবি। বাশো লিখেছিলেন, বুনো হাঁসের মতো আমরা মেঘের ভেতরে হারিয়ে যাব।
-আপনার সঙ্গে আমি তাল রাখতে পারব না জনাব। এই অনুবাদ শেষ হবে না, আমি বুঝতেই পারছি।
-কেন?
-আপনি এখন সাদা পৃষ্ঠার সামনে বসে আছেন। কবে যে অক্ষর ফুটবে, ছবি দেখা দেবে, কে জানে!
