-ফলক আরা।
-ময়না দেখবেন? কত ময়না দেখতে চান, আমার সঙ্গে চলুন।
-আমি আমার ফলক আরাকে দেখব কাল্লু, ও তুই বুঝবি না।
কে ফলক আরা, মান্টোভাই? আমার জীবনের একটা খোয়াব। আগ্রার আকাশে তাকে দেখা যেত। আমি জানতুম, কোনদিন তাকে আমি পাব না। আমার ফলক ময়নাকে। সে কোনও না কোনও খাঁচায় বন্দি থেকে যাবে। মীরসাব একবার লিখেছিলেন, জিজ্ঞেস করলুম, কতদিন ফুটবে এই গোলাপ; গোলাপকুড়ি আমার প্রশ্ন শুনে এক চিলতে হেসেছিল, কিছুই বলেনি। তো, সে দাঁড়ের ময়না, ফলক আরাকে দেখে আমি চিনব না? আগ্রা রাতের আকাশে রোজ তার হাসি দেখতে দেখতে মনে হত, কত জন্ম থেকে আমি ওকে চিনি। আর কাল্লু আমাকে দেখাবে ময়না? ছছাঃ! সব ময়নাই কি ফলক আরা হয়, মান্টোভাই, বলুন?
আমি আজও ভাবি, কোথা থেকে আমার খোয়াবে বেগম সাহেবা এসেছিলেন, যাঁর নাম ফলক আরা? এমন বেগমকে তো আমি কখনও দেখিনি। বেগমরা যে পর্দার আড়ালেই ঢাকা থাকতেন, সে তো আর নতুন করে বলবার কথা নয়। তা হলে কে এই বেগম সাহেবা?
এরপর মোতি মহলে একদিন তাঁকে দেখতে পেলুম। সেদিন তাঁকে আর আমি ডাকিনি। দূর থেকে বসে দেখছিলুম। তিনি একবার কানের দুল খুলছেন, আবার পরছেন; নাকছাবিটা খুলে রুপোলি ঔজ্জ্বল্যের দিকে তাকিয়ে আছেন, তারপর পরে নিলেন, আবার খুললেন, আবার দেখলেন; মান্টোভাই, নাকছাবিতে কি কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে, না হলে তিনি অতবার ধরে নাকছাবিটা খুলছিলেন কেন; আমার খুব কৌতূহল হল, কী আছে ওই নাকছাবিতে? আমি তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম।
তিনি চমকে উঠে বললেন, ফির তুম?
-বেগম সাহেবা-
-তুম কিউ মেরে পিছে পড় রহি হু?
-নাকছাবিটা
-কেয়া হ্যায় ইসমে?
-আপনি তাহলে বার বার দেখছেন কেন?
বেগম সাহেবা হা-হা করে হেসে উঠলেন।-খোয়াব কতবার দেখতে ইচ্ছে করে জানো?
-কতবার?
-জন্নত অউর জাহান্নম তক।
-উও তো একই হ্যায় বেগমসাহেবা।
-বোলো ফলক আরা।
তাঁর কণ্ঠস্বরে আমি কুয়াশায় ঢেকে যাই, মান্টোভাই।
-জি?
-আমার নাম ফলক আরা। তুমি জানো না?
বেগম সাহেবা আমার হাত ধরে তাঁর পাশে বসালেন। আমার দুই হাতের আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন। তারপর বললেন তুমি কি করো?
-কিছু না।
-মানে?
-কালে মহলে ঘুরে বেড়াই। আগ্রার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি।
-আর কী করো? তিনি হাসলেন।
-পতঙ্গবাজি, সতরঞ্জ, শরাব
-অউর জেনানা?
আমি হেসে ফেললুম। মান্টোভাই, জেনানার শরীর কী, ততদিনে আমি ছানবিন করে দেখে নিয়েছি। এক এক শরীর যেন এক এক নকশার পশমিনা। আগ্রার এক তবায়েফের সঙ্গে বেশ আশনাইও হয়েছিল আমার। সে যেন হুসন-এ ল-বাম, একেবারে ভোরের মত তাজা। পাকা আতাফল দেখেছেন? আমি ছিলুম সেইরকম। একা একা ফল যেভাবে পেকে যায়, আমি সেভাবেই পেকে গিয়েছিলুম। সারা শরীরে ভোমরার গুনগুন শুনতে পেতুম।
-জি। আমি মাথা নীচু করে বললুম।
-কেয়া, জি?
-জি ইস্তেমাল কিয়া।
সে এক গুলফাম দস্তান, মান্টোভাই। তিনি আমাকে বুকের কাছে টেনে নিলেন। যে-সব কবুতর আমি মহলের ছাদে ছাদে দেখেছি, তাদের চেয়েও আজিব দুই কবুতর তিনি আমাকে দেখালেন। আমি সেই কবুতরদের ঠোঁটে মুখ ঘষতে লাগলুম, তাদের পালকে হাত বুলিয়ে দিতে কী আরাম, কী আরাম। মান্টোভাই, আমার কী মনে হয়েছিল জানেন? এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর…।
-একবার বোলো-। তিনি আমার কানে জিভ বুলোতে বুলোতে বলছিলেন, ফির একবার বোলো। মিঞা-
মান্টোভাই, তার ঘাড়ে, কোঁকড়ানো চুলের গভীরে লুকিয়ে ছিল একটা তিল। তিল মানে বিন্দু, আপনি তো জানেনই। নোক্তা থেকেই তো সৃষ্টির শুরুয়াৎ। আমি সেদিন শুধু সেই। বিন্দুমাত্রকেই খাচ্ছিলুম; সেই বিন্দু আমার ভেতরে এমন এক খিদে জিইয়ে রেখে গেল, এ-জীবনে আর মিটল না। মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি ছিলেন এক আশ্চর্য নিগার-ছবি-যার মধ্যে দিয়ে আমি হেঁটে গিয়েছিলুম।
এ সব সত্যি, একবারও ভাববেন না, মান্টোভাই, আল্লা রহিম, আমি কবুল করছি, আমার জীবনে কোনও সত্যি নেই, সব কিস্সা, খোয়াব, দস্তান। আমি তো তখন অনেক ছোট, বেগম সাহেবার বুকে মুখ চেপে বলেছিলাম, মুঝে ছোড়কে মৎ যাইয়ে।
-কিউ?
-আপ মেরি জান-
-মুঝে জান না কহো মেরি জান।
-কেয়া বলু?
-ফলক আরা।
মান্টোভাই, আগ্রা ছাড়ার সময় সেই নক্ষত্রের হার আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল। ফলক আরা শুধু একটা নাম হয়ে বেঁচে রইল। বিন্দু,নোক্তা, শুরুয়াৎ। এমন এক শুরুয়াৎ, মান্টোভাই, তার ভেতরে শেষও লুকিয়ে আছে।
০৮. দুসপ্তাহ তবসুমের বাড়ি যাওয়া হয়নি
দুসপ্তাহ তবসুমের বাড়ি যাওয়া হয়নি। আমার এইরকম হয়, একটা কাজ শুরু করার পর হঠাৎই উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। আমার স্ত্রী অতসী বলে, কোনও কাজে লেগে থাকার মতো মনের জোর আমার নেই। হবেও বা। কিন্তু কাকে বলে মনের জোর? একটা কাজ শেষ করার জন্য জরুরি প্রত্যয়? কিন্তু এই প্রত্যয় কি শেষ পর্যন্ত মানুষের কোনও কাজে লাগে? ভাবতে গেলে, আমার তো মহাভারতের যুদ্ধের পরবর্তী মৃতদেহ-শিবা-শকুনে ভরা শ্মশানের কথাই মনে পড়ে। অনুশাসন পর্বের সেই কাহিনী ফিরে ফিরে আসে। চক্রাকার এই গতিপথ। রাজশেখর বসুর বই খুলে আমি আবারও গল্পটি পড়ি।
যুধিষ্টির বললেন, পিতামহ, আপনি বহুপ্রকার শান্তিবিষয়ক কথা বলেছেন, কিন্তু জ্ঞাতিবধজনিত পাপের ফলে আমার মন শান্ত হচ্ছে না। আপনাকে শরে আবৃত ক্ষতবিক্ষত ও রুধিরাক্ত দেখে আমি অবসন্ন হচ্ছি। আমরা যে নিন্দিত কর্ম করেছি তার ফলে আমাদের গতি কী প্রকার হবে? দুর্যোধনকে ভাগ্যবান মনে করি, তিনি আপনাকে এই অবস্থায় দেখছেন না। বিধাতা পাপকর্মের জন্যই নিশ্চয় আমাদের সৃষ্টি করেছেন। যদি আমাদের প্রিয়কামনা করেন তবে এমন উপদেশ দিন যাতে পরলোক পাপমুক্ত হতে পারি। ভীষ্ম বললেন, মানুষের আত্মা বিধাতার অধীন, তাকে পাপপূণ্যের কারণ মনে করছ কেন? আমরা যে কর্ম করি তাঁর হেতু সূক্ষ্ম এবং ইন্দ্রিয়ের অগোচর।আমি একটা প্রাচীন ইতিহাস বলছি শোন।-
