-তুম কৌন হো? তিনি হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকলেন।
আমি পায়ে পায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলুম। তিনিও আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন, ফলক আরা কৌন হয়?
তাঁর খুবসুরতির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলব? কোনও কথাই তো খুঁজে পাই না। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ফলক আরা কৌন হ্যায়?
এবার আমি সাহস করে বলে ফেললুম, জানি না, জি।
-এই নাম তুমি কোথায় পেলে?
-আগ্রার আকাশে, জি।
বেগম সাহেবা হেসে উঠলেন।-ইনশাল্লা, আগ্রার আকাশে এই নাম লেখা আছে বুঝি।
-জি।
-তুমি দেখেছ?
-জি।
-কব দেখা?
-হর রোজ।
-মীরসাবের একটা শের জানো?
-বলুন, জি।
-ফির কুছ এক দিল-কো বেকার রী হৈ
সীনহ জুয়া-এ জখমকারী হৈ।
মান্টোভাই, সত্যিই তো, আমার হৃদয় তখন অস্থির হয়ে উঠেছে। আমি তাকেই তো খুঁজতে বেরিয়েছি, যার আঘাতে আবারও কলিজা ফেটে যাবে আমার। কিন্তু তাকে না খুঁজেই বা কোথায় যাব আমি? আমার জীবনে নিজের কোনও মহল নেই, ঘর তো আমাকে খুঁজতেই হবে, কিন্তু ঘর খুঁজতে গিয়ে আমি দোজখের পর দোজখ পার হয়ে গেছি, সে-পথ এক দীর্ঘ শীতের রাত, আর রহমান-আর রহিম, আমি নীরবে চিৎকার করেছি, আমাকে বাঁচাও, আল-বশীর, আমাকে একবার খোশনসিব করো।
তারপর, কী হল জানেন, মান্টোভাই? তিনি আমার হাত ধরে চহরবাগের ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে একটা খাঁচার সামনে এসে দাঁড়ালেন। খাঁচার ভেতরে উড়ছে অনেক ময়নাপাখি। বেগম সাহেবা আমার দিকে তাকালেন। কীরকম তাকানো জানেন, মান্টোভাই? সেই দৃষ্টিতে যেন লেখা ছিল হাফিজসাবের শের:
অলা ঐ আহ্ -এ-বশী কুজাঈ
মরা বা ভূস্ত বিস্তার আশ্নাঈ।
(হে উদভ্রান্ত বাউল হরিণ,
তুমি আছ কোনখানে কোন বনে!
তোমার আমার ভাব-ভালবাসা
সেই কবে থেকে! পড়ে না কি মনে?)
এই শের শোনার পর, মান্টোভাই, কোনও সুন্দরীর দিকে যদি কেউ চোখ তুলে তাকাতে পারে, তা হলে আমি বলব, ইশ্ব কাকে বলে, সে জানে না। এরপর আপনি শুধু সেই বেগমের কদমবুশি করে বলতে পারেন:
হাজারোঁ খাাহিশে ঐসী কেহ্ হর ঋহিশ-পে দম নিক্লে,
বহুৎ নিকলে মেরে আর্মান, ফির-ভী কম নিকলে।।
হ্যাঁ, মান্টোভাই, আমার শত-শত বাসনা এমনই যে প্রত্যেকটার জন্য প্রাণ যায় যায়, অনেক বাসনা আমার পূর্ণ হল, তবুও কম হল। এই যে কম হল, এ-জন্যই তো আমরা বেঁচে থাকি, তাই না? অপেক্ষা করি, তবু পাত্র পূর্ণ হয় না। আমি তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে। গাইলুম,
ভরা থাক, ভরা থাক,স্মৃতিসুধায়
বিদায়ের পাত্রখানি।
কোথা থেকে ভেসে এল এই গান আমি জানি না, মান্টোভাই। আগে তো কখনও শুনিনি। কোথা থেকে যে কী আসে! কোন অতীত থেকে, কত দূরের ভবিষ্যৎ থেকে? অতীত ভবিষ্যতকে ধারণ করে থাকে বলেই কি আশমান এত জ্বলজ্বল করে? আমদের জীবন পোড়া অঙ্গারের মতো ধিকিধিকি জ্বলে। এইভাবে জ্বলতে বড় কষ্ট হয় না মান্টোভাই?
খাঁচার ভেতরে ময়নারা কিচমিচ করতে করতে উড়ছিল। বেগম সাহেবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানেও একজন ফলক আরা আছে। দেখি চিনতে পার কি না।
আমি পাখিদের দেখতে থাকলুম। একসময় কী যে হল, আমি একটা ময়নার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে উঠলুম, ওই তো ফলক আরা।
ময়নাটা দাঁড়ের ওপর বসেছিল।
বেগম সাহেবা আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন, কী করে চিনলে? আগে কখনও দেখেছ?
-না।
-তা হলে?
-ও খুব কাঁপছে।
-কে?
-ফলক আরা।
-কেন? বেগম সাহেবার গলায় নীল রং ফুটে উঠল, আমি বুঝতে পারলুম।
-ও কারও সঙ্গে কথা বলতে চায়।
-কার সঙ্গে?
সত্যিই তো, কার সঙ্গে? আমি কি জানতুম, মান্টোভাই? যেন একটা পানপাত্র, সেভাবেই দুহাতে বেগম সাহেবা আমার মুখ চেপে ধরলেন। ফিসফিস করে বললেন, তুমি কে?
মান্টোভাই, আমি তাঁকে বলতে পারিনি, চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলুম, কিন্তু মনে মনে বলেছি,
হাফিজ ই হালে আজব
বা কে গুফক্ত কি মা
বুলবুলাঁনেম কি দর
মোসমে গুল খামোশেম।
সত্যিই, হাফিজসাব যেন আমার কথাই বলে গেছেন, কাকে বলি এই কথা, বড় শোচনীয় হাল আমার, কুসুমের মাস এসেছে, আর বুলবুলের মুখে কথা ফোটে না।
-আমার নামও যে ফলক আরা, তুমি কী করে জানলে? যেন আতরের শিশি থেকে মৃদু গন্ধের মতো বেগম সাহেবার কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
-জানি না।
-কী করে জানলে, বলো।
-তুমি ফলক আরা-তুমি-তুমিই ফলক আরা। আর কেউ নেই।
আমার খোয়াব ভেঙে গেল, মান্টোভাই। এসব একেবারে সত্যি কথা নয়। আমার খোয়াব। একদিন এইরকম দেখেছিলুম। আমার জীবনের কথা শুনতে চাইলে, এসব খোয়াবের কথাও তো শুনতে হবে। যেমন একদিন খোয়াব দেখেছিলুম, ওস্তাদ তানসেন আমার হাত ধরে ফতেপুর সিক্রির একের পর এক ঘর পেরিয়ে যাচ্ছেন, তারপর একটা ঘরে পৌঁছে আমাকে। বসতে বললেন। সেই ঘরে সেদিন বর্ষা নামল; আর আমি ঘামে ভিজে ঘুম ভেঙে উঠে চিৎকার করে ডাকলুম, কাল্লু-কাহাঁ গিয়া-কালু বেটা-।
কালু সঙ্গে সঙ্গে এসে হাজির।-জি হুজুর।
আমি বিড়বিড় করে বললুম, তার্জুমান আল-আশক্।
-হুজুর।
-হম হ্যায় তাৰ্জুমান আল-আক।
-জি হুজুর।
-বার বার হুজুর বলিস কেন?
-কেয়া চাহতে হ্যায় আপ?
-আজ সকালে একটু খাওয়াবি কাল্লু?
-দারু?
-জি হুজুর। আমি হেসে বলি। কাল্লু আমার পা চেপে ধরে।-মাফ কিজিয়ে হুজুর। সুবহ মে -দে না একটু কাল্লু।
-কেন?
-খোয়াব দেখি।
-কী খোয়ব হুজুর?
