-খুন করল?
-দরবেশকে খুন করা হবে জেনে কন্যের মনে মায়া হল। সে একদিন লুকিয়ে লুকিয়ে বাইরে এসে দরবেশকে বলল, আচ্ছা মানুষ তো তুমি। আমি নবাবের মেয়ে, আমাকে নিকে করার কথা তুমি ভাব কী করে? দ্যাখো, এখান থেকে চলে যাও, আর কখনও এসো না। কাল এখানে থাকলে তুমি মারা পড়বে।
-দরবেশ বলল, তোমাকে যেদিন থেকে দেখেছি, আমার কাছে জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে গেছে। কেউ আমাকে মারতে এলেও আর ভয় পাব না। দুনিয়ার কোনও ক্ষমতা আমাকে তোমার হাভেলির দরজা থেকে সরাতে পারবে না। তোমার পাহারাদাররা তো আমাকে মারতে চায়, তাই না? তাই হবে। কিন্তু তার আগে ধাঁধাটার উত্তর দেবে আমাকে?
-কোন ধাঁধা?
-তুমি আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলে কেন?
-তুমি সত্যিই একটা উজবুক। তোমাকে দেখে দয়া হয়েছিল, রুটিটা পর্যন্ত হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল, হাসব না তো কী?
-তারপর? বুলবুল চোখ ছলছল করে তাকায়।
হোদহোদ বলে, তোমার গোলাপ হচ্ছে ওই কন্যের মতো। শুধু বাইরের খুবসুরতি। এইভাবে নানারকম কিস্সা শুনিয়ে পাখিদের না যাওয়ার অজুহাত উড়িয়ে দিল হোদহোদ। তখন পাখিরা জিজ্ঞেস করল, আমাদের জাঁহাপনার জন্যে তো তা নিয়ে যাওয়া উচিত। আপনিই বলুন মুর্শিদ, জাঁহাপনা সিমুর্গের জন্য আমরা কী নিয়ে যাব?
-জিকির। আত্মার জিকির। জাঁহাপনার দরবারে সব আছে। কিন্তু তিনি চান সেই আত্মা, যা আগুনে পুড়ে পুড়ে, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করে শুদ্ধ হয়েছে।
কত বছর ধরে যে পাখিরা উড়ে চলল হোদযোদের পেছনে। সাত-সাতটা উপত্যকা পেরিয়ে যেতে হল তাদের। পথে কত পাখি মারা পড়ল, কত পাখির আর ওড়বার ক্ষমতাই রইল না। শেষ পর্যন্ত কাফ পাহাড়ে জাঁহাপনা সিমুর্গের প্রাসাদের সামনে এসে পৌঁছল তিরিশটি পাখি। দারোয়ানরা তো কিছুতেই পাখিদের ঢুকতে দেবে না। কিন্তু এত পথ পেরিয়ে এসে তারা। এতটাই শান্ত হয়েছে, দারোয়ানের গালাগালিতেও তারা কিছু মনে করল না। শুধু অপেক্ষা করতে লাগল। শেষে জাঁহাপনার নিজের নোকর এসে তাদের দরবারে নিয়ে গেল। সে এক আশ্চর্য ঘটান। যেদিকে তারা তাকায়, দেখতে পায় নিজেদেরই, তিরিশটা পাখি, একে অপরের দিকে তাকিয়ে হতবাক। জাঁহাপনা সিমুর্গ তা হলে কোথায়? ভাইসব, ফারসিতে সিমুর্গ মানে তিরিশটি পাখি। তারা এবার তাদের আত্মার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের জাঁহাপনা সিমুর্গ। পাখিরা তখন গেয়ে উঠল, তেরে নাম সে জি লু, তেরে নাম সে মর যাউঁ…।
০৭. কালে মহলের জীবন
কহতে হ্যাঁয় আগে থা বুতোঁ মে রহম্
হায় খুদা জানীয়ে অহ্ কবকী বাত।।
(লোকে বলে আগের দিনে প্রতিমাদের বুকে দয়ামায়া ছিল,
হায়, ঈশ্বরই জানেন ওঁরা কবেকার কথা বলছেন।।)
মান্টোভাই, কালে মহলের জীবন যতই নিঃসঙ্গতা থাক না কেন, তেরো বছর বয়স পর্যন্ত আগ্রা আমাকে যা দিয়েছে, তা আমি সারা জীবনেও ভুলিনি। আগ্রার হাওয়া আর জল ছিল আমার আত্মার অংশ। আগ্রার প্রতিটি পথে এখনও আমার স্মৃতির মণিমুক্তো ছড়িয়ে আছে। যে ইক আমার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে, তাঁর খেলাঘর তো ছিল আগ্রাই। প্রতিটি বাগানের ফুল থেকে ঝরে পড়ত অনাস্বাদিত ভালবাসা, প্রতিটি গাছের পাতা যেন আমাকে আদর করতে চাইত। সত্যি বলতে কী, মান্টোভাই, আগ্রা আমার ভেতরে নীল ঝকঝকে আশমান ঢুকিয়ে দিয়েছিল। সেই আশমানে মাঝে মাঝেই ফুটে উঠত এক ফলক আরা। সে এক অনিঃশেষ হাসির ঝরনা। আমি তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতুম, সেই নক্ষত্রের হার আমার দিকে তাকিয়ে ক্ষণে ক্ষণে তাঁর রং দেখা যেত। কে সে? পুরা জিন্দেগি গুজর গিয়া মান্টোভাই, আমি তবু তাকে চিনতে পারলুম না, কখনও হাত দিয়ে ছুঁতে পারলুম না। একদিন বেশ মজা হয়েছিল। আমি চহরবাগের সামনের রাস্তা দিয়ে একা একা হাঁটছিলুম। হটাৎ দেখি, এক বেগম সাহেবা বসে আছেন বাগানে, আমার চেয়ে বয়েসে অনেকটাই বড়। হাফিজসাব বোধ হয় তার জন্যই লিখেছিলেন,
অগর অঁ তুর্ক-এ-শিরাযী
বদস্ত আরদ দিল-এ-মারা
বখাল-এ হিন্দবশ বখশম
সমরখন্দ ব বুখারারা
(গালে কালো-তিল সেই সুন্দরী
স্বহস্তে ছুঁলে হৃদয় আমার,
বোখারা তো ছার, সমরখন্দও
খুশি হয়ে তাকে দেব উপহার।
তাঁকে দেখে আমার ঘোর লেগে গেল, আমি বাগানে ঢুকে, তার পিছনে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে ডাকলুম, ফলক আরা।
বেগম সাহেবা ফিরেও তাকালেন না। শুধু মাথা থেকে ওড়না সরিয়ে ছড়িয়ে দিলেন তাঁর কোঁকড়ানো চুল, যেন পানপাত্র ভেঙে ছড়িয়ে গেল সুরা, মান্টোভাই।
আহা হা, মীরসাবের সেই শের মনে পড়ে গেল বেগম সাহেবার কেশবাহার দেখে,
উসকে কাকুলকী পহেলী কহো তুম বুঝে মীর,
কেয়া হ্যয় জঞ্জীর নহী, দম নহী, মার নহী।
(তাঁর কোঁকড়ানো চুলের ধাঁধা কিছু বুঝতে পারলে, মীর?
কী এটা? এ তো শিকল নয়, সাপ নয়, ফাঁদ নয়।)
আমি আবার ডাকলুম, ফলক আরা।
এবার বেগম সাহেবা ফিরে তাকালেন। তাঁর হাসির কথা বলব, এমন সাধ্য আমার নেই। সেই হাসি দেখে আমার আবার হাফিজসাবের শের মনে পড়ল:
বাদা-এ-গুলরংগ ব তল্খ ব
অজব খশ্খ্বরে সুবুক
নুক্লে অয লালে নিগার ব
নুক্লে অয য়াকুতে জাম।
(পেয়ালায় দাও হালকা মধুর
নেশায় মাতানো রসাস্বাদন।
ধারালো তীব্র সেই শরাবের,
যার রং ঠিক ফুলেরই মতন।)।
