খুব ভালো লাগে; কিস্সাগুলোর ভিতরে আমি কখনও দরবেশ হয়ে যাই, কখনও আতরসাব, কখনও কাল্লু। আর মির্জাসাব? তিনি তো আমার ভেতরেই ঢুকে বসে আছেন। মির্জাসাবের সেই শেরটা আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন:
হুয়ী মুদ্দৎ কেহ্ গালিব মর গয়া, পর য়াদ আতা হৈ
বোহ হরেক বাত-পর কহনা কেহ্ য়ু হোতা তো কেয়া হোতা।
(কত কাল হল গালিব মারা গেছে, তবু মনে পড়ে
কথায় কথায় তার বলা-এমন যদি হত তা হলে কী হত?)
সাদাত হাসান মান্টো যদি মির্জা আসাদুল্লা খান গালিব হয়ে যায়, তা হলে কী হত? শাফিয়া বেগমকে একবার কথাটা বলেছিলাম; বেগম কী বলেছিল জানেন, ভাইসব? সারা জীবন আপনি অন্যের চরিত্র হয়ে বেঁচে থাকলেন মান্টোসাব, কবে আপনি নিজেকে দেখাবেন? শাফিয়া বেগম তো বুঝত না, মান্টো অনেক চরিত্রের মধ্যেই বেঁচে থাকে। সেই চরিত্ররা ছাড়া মান্টো বলে আসলে কেউ নেই। শাফিয়া বেগম একবার আমাকে বলেছিল, মান্টোসাব, এইসব কিস্সা লিখে কী পেলেন আপনী? কেউ কিছু দেবে না। তার চেয়ে একটা দোকান খুলুন।
–আর আমার মাথার ভেতরের দোকানটা নিয়ে কী করব বেগম?
–মাথার ভেতরে দোকান?
–কত কিস্সার দোকান। বেগম, ওই দোকানটা বন্ধ হয়ে গেলে মান্টো মরে যাবে।
গোস্তাকি মাফ করবেন ভাইজানেরা, কথায় কথায় আমি অনেক দূর চলে এসেছি। আপনাদের চোখ জ্বলজ্বল করছে, আমি জানি, কিস্সাটা শোনার জন্যই আপনারা অপেক্ষা করে আছেন। কিন্তু আপনাদের মান্টোভাইকে একটু ক্ষমাঘেন্না করে দেখবেন। স্মৃতি, বুঝলেন ভাইসব, কত যে স্মৃতি, কথা বলতে বলতে আমাকে শুধু পিছনের দিকে টানতে থাকে, আমি সেই টান এড়াতে পারি না; যদি পারতাম, পাকিস্থানে অমন বেওয়ারিশ কুকুরের মত মরতে হত না আমাকে। কিন্তু এবার পাখিদের কথা হোক। এই দুনিয়ায় সবচেয়ে কোমল প্রাণের কথা। কী জানেন,
আমাদের হৃদয় এক একটা পাখি, কখনও খাঁচায় বন্দি থাকে, কখনও উড়ে যায় আশমানে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল, একটা চড়ুই পাখিকে বুকে জড়িয়ে সারা রাত ঘুমিয়ে থাকব, কিন্তু ওদের তো ধরা যায় না, বড় ছটফটে, এই বসে আছে তো, এই উড়ে যাচ্ছে, এই কিচমিচ করে ঝগড়া করছে তো, পরক্ষণেই উদাস হয়ে কোথায় তাকিয়ে আছে। পাখিরা এইরকম, ওরা শুধু জানে, দুনিয়াটা আসলে বেড়ানোর জায়গা, ঘোরো, ফেরো, ওড়ো, তারপর অজান্তেই একদিন মরে যাও না।
একদিন পাখিরা সব একসঙ্গে এসে মজলিশে বসেছে। কেন? তাদের কোনও জাঁহাপনা নেই, তাঁকে খুঁজে বার করতে হবে। সব খোঁজের জন্যই তো একজন মুর্শিদ লাগে। কে হবে মুর্শিদ? সবাই মিলে ঠিক করল, হোদহোদই হতে পারে তাদের মুর্শিদ। হোদাহোদ ছিল সলোমনের প্রিয় পাখি। শেবা নগরী থেকে রানী বিলকিসের খবর সে নিয়ে আসত। তোদহোদই তো তাই একমাত্র মুর্শিদ হতে পারে; সে-ই তো তাদের রাজার কাছে পাখিদের পৌঁছে দিতে পারে।
হোদহোদের মাথায় পালকের কুঞ্জবন, তার ঠোঁটে বিসমিল্লা। তোদহোদ পাখিদের বলল, দেখো, রাজার খোঁজে তোমরা যেতেই পারো, কিন্তু সে-পথ বড় দীর্ঘ আর কঠিন। সেই পথে যেতে হলে এতদিনের জীবন ঝেড়েমুছে ফেলতে হবে; যদি পারো, সবাইকে ছেড়ে যদি ভালোবাসতে পারো, তবেই আমি তোমাদের নিয়ে যেতে পারি।
শুনে তো পাখিদের মাথায় হাত; এক এক পাখির, এক এক অজুহাত, না, না, এত দীর্ঘ যাত্রায় তারা যেতে পারবে না। বুলবুল তো প্রথমেই বলল, আমি কোথাও যেতে পারব না। আমার ভালবাসার গোপন কথা একমাত্র গোলাপই বোঝে। তাকে ছেড়ে কোথায় যাব? গোলাপের ভালবাসাতেই আমার এই জীবনটা কেটে যাবে। হোদহেদ তাকে বলল, তুমি বাইরের খুবসুরতির দিকে তাকিয়ে আছো বুলবুল। গোলাপ যে হাসে, তা তোমার জন্য নয়। মনে হয়, তোমার দিকে তাকিয়ে হাসে, তারপর ঝরে যায়। তোমার দিকে তাকিয়ে কেন হাসে জানো? ও যে একটু পরেই ঝরে যাবে, তুমি তা বোঝ না বলে।
-কিন্তু গুলবাহার ছেড়ে আমি কোথাও যাব না মুর্শিদ।
-তাহলে একটা কিস্স বলি শোনো। হোদাহোদ কয়েকবার ডানা ঝাপটে স্থির হয়ে বসে। বিড়বিড় করে বলে, বিসমিল্লা, আর-রহমান, আর রহিম। খোদা, আমাকে ভাষা দাও। কিস্সাটা যেন বুলবুলকে ঠিকঠিক বলতে পারি। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে চিৎকার করে বলে, শোন, বুলবুল, কিস্সাটা শুনে রাখ। তারপর তোর যা মনে হয় করিস।
-গোলাপ যখন ফোটে, তাঁর কাছে কোনও কিস্সার দাম নেই পীরসাব।
-তা তো বটেই। তবু শোনই না। কিস্যা শুনলে তো আর পেট গরম হবে না।
-বলো, তবে শুনি। বুলবুল কিচকিচ করে ওঠে।
-এক নবাবের ছিল এক কন্যে। কী যে তাঁর রূপ, বলে বোঝানো যাবে না। তারা না-ফোঁটা রাতের আকাশের মতো কালো চুল, সারা শরীরে যেন মৃগনাভির গন্ধ, আর সে কী চাউনি, যখন কথা বলত, মনে হত চিনির চেয়েও মিষ্টি। আর তাঁর গায়ের রং? পদ্মরাগমণিকেও হার মানাত। সত্যি বলতে কী, কন্যেকে যে দেখত, সে-ই প্রেমে পড়ে যেত। খোদার মর্জি তো বোঝা দায়, একদিন এক দরবেশ কন্যেকে দেখে প্রেমে পড়ে গেল। দরবেশ তখন রুটি খাচ্ছিল, কন্যের। খুবসুরতি দেখে তার হাত থেকে রুটি পড়ে গেল। তাই দেখে কন্যে মুচকি হাসল। ওই হাসিই হল কাল, দরবেশ একেবারে দিবানা হয়ে গেল।
-তারপর?
-সে নবাবের হাভেলির সামনে পড়ে রইল সাত বছর। রাস্তার কুকুর বেড়ালদের সঙ্গে দিন কাটাত। সাত বছর ধরে দরবেশ কেঁদেই চলল তার আশিককে পাওয়ার জন্য। তখন কন্যের পাহারাদাররা ঠিক করল, দরবেশকে খুন করতে হবে।
