শামস চিল্কার করে উঠলেন, আপনি কখনও আমার মুনাসিব হতে পারবেন না। আল্লার দরবারে পৌঁছনোর ক্ষমতাই আপনার নেই। আমি তাঁকে খুজছি যে আলওয়াজিদের কাছে পৌঁছতে পারবে।
জালালউদ্দিন রুমির মধ্যেই সেই মানুষকে খুঁজে পেয়েছিলেন শামস। আমি মাঝে মাঝে দেখতে পাই, জামা মসজিদের সামনে বসে শামসের সঙ্গে মির্জাসাব দারু পান করে চলেছেন। তাঁদের মুখোমুখি বসে আছেন মওলা রুমি। নতুন একটা মসনবি লিখছেন তিনি, তাঁর প্রেমিক শামস আর মির্জাসাবকে নিয়ে। এইসব যদি সত্যিই হত, ভাবুন একবার, দুনিয়াটা যেন তা হলে জামেয়ার হয়ে যেত।
না, না, ওইরকম অবিশ্বাসী চোখে তাকাবেন না আমার দিকে ভাইজানেরা। আমি কিছু ভুলি নি। আমার স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। দেখুন, যে-দুনিয়ায় আমি বড় হয়েছি, দুই দেশের মোহাজিরদের যে-স্রোত আমি দেখেছি, সেখানে স্মৃতির নূরই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এত মোহাজির-এত উদ্বাস্তু-আমার কি মনে হয় জানেন, বিংশ শতাব্দীর নাম দেওয়া উচিৎ উদ্বাস্তুদের শতাব্দী। নাম হারিয়ে যাওয়া, নাম বদলে যাওয়ার শতাব্দী। আমার ঠাণ্ডা গোস্ত গল্পটা। আপনারা কি কেউ পড়েছেন? গল্পটা লেখার জন্য অশ্লীলতার দায়ে আমার বিচার হয়েছিল। লাহোরের কোর্টে। কী বলছেন? ঠাণ্ডা গোস্ত গল্পটা শুনতে চান? কিন্তু আজ তো আমরা অন্য একটা কিস্সা শুরু করেছি ভাইসব। ঠাণ্ডা গোস্তে-এর কথা নয় পরে একদিন বলা যাবে। আরে, এই দুনিয়াটা হারিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত কত কত শতাব্দী তো কবরেই থাকতে হবে। আমাদের, ঠাণ্ডা গোস্ত-এর কিস্সা বলার ফুরসত একদিন পাওয়া যাবেই।
হ্যাঁ, সে দরবেশ এসে আসাদের হাতে একটা আয়না তুলে দিয়েছিলেন, মনে আছে তো? আয়নায় আসাদের আম্মাজানের পশমিনার মত নীল আকাশ ফুটে উঠেছিল পাখিদের উরালের নকশা। পাখিরা চলেছে তাদের রাজা সিমুর্গের খোঁজে। এ এক গভীর কিস্সা ভাইসব। আসাদকে দেওয়া দরবেশের আয়নায় কেন যে এই কিস্সার ছবি দেখা গিয়েছিল, তা একমাত্র খোদাই জানেন। আল-খালিক কখন কী পাঠাবেন, তা আমরা কতটুকু জানতে পারি? আমার কী মনে হয় জানেন, এই যে জানাতে পারি না, তাই এত এত শব্দ লিখে যেতে পারি। দস্তানের এই এক মজা, তুমি লেখো, লিখে যাও, কোন চুতিয়া সমালোচক কী বলল, তাতে তোমার কী এসে যায়? দস্তান তো দস্তানই; তারা একা একা বাঁচে, একা একা মরে যায়।
মাফ করবেন ভাইসব, কথা বলতে বলতে আমি আসলে একটা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ি। সারা জীবন আমি কত যে জীবিত আর মৃতদের সঙ্গে কথা বলেছি। কথা না বলতে পারলে মনে হত, আমাকে কেউ পাথরচাপা দিয়ে রেখে দিয়েছে। ইসমত আমার কথা শুনে খুব হাসত, ইসমতকে চেনেন তো, ইসমত চুঘতাই, ওকে কাছে পেলেই কথার নেশায় পেয়ে বসত আমাকে, ইসমতও খুব সুন্দর কথা বলতে পারত, চশমার আড়ালে ওর চোখ দুটো ছিল যেন হ্রদের মত। আমি সেই হ্রদের ভিতরে ডুবে কথা বলে যেতাম শুধু, ইসমত বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকত, আর আমার ইচ্ছে হত, ওর চোখ দুটো আমি একদিন গিলে খাব। ইসমতকে অবশ্য একথা বলা হয়নি কখনও। তা হলে আমার মাথার চুলগুলো খাবলে তুলে ফেলত ও।
দরবেশ বাবার দেওয়া আয়নার ভেতরে পাখিরা উড়ে যাচ্ছিল মনে আছে তো? ফরিদউদ্দিন আতরের লেখা কিস্সা ফুটে উঠল দরবেশের আয়নায়। কী আশ্চর্য ভাবুন! আয়নার ভিতরে কিস্সা। আর সব কিস্সাই তো একটা আয়না, তাই না? আয়না আর কিস্স কখন যে একাকার হয়ে যায়, আমি তো কোনওদিন বুঝতে পারিনি। যাঙ্গে। কিন্তু ওই পাখিদের কিস্সাটা বলার আগে বাবা আতরসাবের কথা একটু বলে নিতেই হবে। আল্লার দূত তিনি, সুফি সাধক, আবার কিস্সা লেখাতেও তাঁর জুড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না। একমাত্র আবদুল-রহমান জামির সঙ্গেই হয়তো কিছুটা তুলনা করা যায়। আতরসাবের জন্ম হয়েছিল পারস্যের নিশাপুরে, সে প্রায় আটশো বছর আগের কথা। দারুখানার মালিক ছিলেন তিনি; সেখানে ওষুধ তৈরি হত, আবার নানা রকমের আতরও। বেশ জমিয়েই ব্যবসা করছিলেন ফরিদউদ্দিন। একদিন একজন দরবেশ এসে হাজির তাঁর দারুখানায়। কত বড় দোকান, তিনি তো হাঁ করে দেখতে লাগলেন সব কিছু, তারপর আতরসাবের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এভাবে কেউ যদি এক নাগাড়ে কারুর দিকে তাকিয়ে থাকে, তবে অস্বস্তি হওয়ারই কথা। আতরসাব জিজ্ঞেস করলেন,
আমাকে এভাবে দেখছেন কেন হুজুর?
দরবেশ হাসলেন। -আমি ভাবছিলাম, এত ধনসম্পদ ফেলে তুমি কীভাবে গোরে যাবে?
আতরসাব একটু রেগে গিয়েই বললেন, আপনার মতই আমারও এন্তেকাল আসবে। আলাদা আর কী হবে?
-কিন্তু আমার এই ছেড়া আলখাল্লা আর ভিক্ষাপাত্র ছাড়া কিছু নেই ভাইজান। তোমার সম্পত্তি তো অনেক। তা হলে আমার মত করে কী করে মরবে তুমি?
-আপনার মতই মরব আমি।
তারপর কী হল জানেন ভাইসাব? ভিক্ষাপাত্রটি মাথার বালিশ করে শুয়ে পড়লেন দরবেশ। চোখ বুজে বললেন, বিসমিল্লাহ আর-রহমান আর – রহিম। তাঁর জিকির শেষ হতেই জিব্রাইল এসে তাঁকে নিয়ে গেলেন। আতরসাব পাথরের মতো দাঁড়িয়ে এই আশ্চর্য মৃত্যু দেখলেন। তারপর চিরদিনের জন্য কারখানা বন্ধ করে বেরিয়ে পড়লেন তাঁর দীন-এর পথে। দরবেশ বাবার দেওয়া আয়নায় আসাদ যে পাখিদের দেখেছিল, তাদের জন্ম হয়েছিল আতরসাবের কিস্সায়অনেক বাখোয়শ আপনারা এতক্ষণ ধরে সহ্য করলেন, এবার তা হলে কিস্সাটাই হোক। তবে কী জানেন, এক কিস্সা থেকে আর এক কিস্সায় ঢুকে পড়তে আমার
