সারা রাত জেগেই কেটে যেত। একদিন দেখি, এক ছায়ামূর্তি আমার কুঠুরিতে দাঁড়িয়ে আছে। কে এই মানুষটি? কীভাবে আমার কুঠুরিতে এসে পৌঁছলেন? দীর্ঘকায় এক পুরুষ, তাকে দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি জিজ্ঞেস করলুম, কে আপনি? কোথা থেকে এসেছেন?
-হুজুর, আমি জালালুদ্দিন রুমি।
-মওলা রুমি! আমি তাঁর পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লুম।-আমার কেয়ামতের দিন তবে এসে গিয়েছে?
-না, হুজুর।
-আপনি আমাকে হুজুর বলছেন কেন? এর চেয়ে বড় গুনাহ্ তো আর হয় না মওলা।
-সবাই আমার হুজুর, মির্জা। হুজুর বলেছেন, একমাত্র ঘাস হয়ে বেঁচে থাকাই আনন্দের। ঋতুরা আসবে যাবে, পাতা ঝরবে, আবার গজাবে, শুধু ঘাসই প্রান্তরে প্রান্তরে ঠিক বেঁচে থাকবে। ঘাসই জানে, কীভাবে মাঝখান থেকে ছড়িয়ে পড়তে হয়।
-আপনি বলুন মওলা, আপনার জন্য কী করতে পারি, বলুন?
মওলা রুমি মুখোমুখি বসে আমার পিঠে হাত রাখলেন। -আপনাকে একটা কিস্সা শোনাতে এলাম মির্জা।
-আমার আজ নবজন্ম হল, মওলা। আপনার মুখ থেকে কিস্সা শোনার সৌভাগ্য কজনের হয়?
-আমারও নবজন্ম হল, হুজুর। হিন্দুস্থানের শেরা শায়রকে কিস্সা শোনানোর সুযোগ দিয়েছেন খোদা।
-আপনার পাশে আমি কে?
-আসমানে ছড়িয়ে থাকা এক একটা নক্ষত্র আমরা। কে কত দূর আছি, খোদা ছাড়া কেউ জানেই না। কেউ মরে গেছে, কেউ বেঁচে আছি। তবু খোদার দয়ায় আমাদের সংলাপ চলছে, মির্জা। একদিন সন্ধেবেলা খেজুর গাছের নীচে বসেছিলেন পয়গম্বর মহম্মদ। তাঁর শিষ্যরা, আশপাশের গ্রামের মানুষরা তাঁকে ঘিরে বসেছিল। সূর্যাস্তের আকাশে তখন গোলাপি আর নীলের খেলা চলছে। হঠাৎ জহু উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, মহম্মদ, আপনার পূর্বপুরুষ হাসিমের মতো কুৎসিত আর নোংরা মানুষ দুনিয়াতে দেখা যায় না। তার সন্তানরাও একের পর এক কুৎসিত সন্তান পয়দা করেছেন।
হজরত মহম্মদের সবচেয়ে অনুরক্ত ভক্ত হায়দর তো সঙ্গে সঙ্গে খাপ থেকে তরবারি বের করেছে। মহম্মদ শান্ত স্বরে বললেন, তুমি সত্যি কথাই বলেছ জহু। এ-কথা শুনে হায়দর চুপসে গেল। তার তো ইচ্ছে ছিল, জহের মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে দেবে।
কিছুক্ষণ পর আবু বকর মহম্মদের সামনে নতজানু হয়ে বলল, জহূকে ক্ষমা করুন পয়গম্বর। আপনার পূর্বপুরুষ হাসিমের মতো সাহসী ও সুন্দর মানুষ দেখা যায় না। আপনিই তেমনই।
মহম্মদ তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, তুমি সত্যি কথাই বলেছ, আবু বকর।
অনেকক্ষণ সবাই চুপচাপ। হায়দর হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, হুজুর, পয়গম্বর, দুজনে দুরকম কথা বলছে। আপনার কাছে দুজনের কথাই সত্যি? কী করে হতে পারে?
মহম্মদ হায়দরের দিকে তাকিয়ে আবার হাসলেন। -তুমিও সত্যি কথাই বলেছ, হায়দর।
-আমিও সত্যি বলেছি?
-হ্যাঁ, আমি তো একটা আয়না, হায়দর। খোদা কবে থেকে আমাকে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে যাচ্ছেন। আমার আয়নায় সবাই নিজের ছবি দেখতে পায়। নীল কাচের মধ্য দিয়ে দুনিয়াকে দেখলে তবে তা নীল, আর লাল কাচের মধ্য দিয়ে যদি দ্যাখো, তবে লালই দেখবে। মানুষ যা দেখে, তা তারই প্রতিচ্ছবি।
-দুনিয়ায় তা হলে সত্য বলে কিছু নেই?
-সত্যকে তুমি পেতে চাও?
-জি হুজুর।
-তা হলে সব উত্তেজনা-আবেগ থেকে নিজেকে মুক্ত কর হায়দর। ভিতরের আয়নাটাকে ঘষতে থাকো, যতক্ষণ না সব রং মুছে গিয়ে একেবারে স্বচ্ছ হয়ে যায়। তখন তুমি তাকে দেখতে পাবে, হায়দর।
-কাকে মওলা? আমি জালালুদ্দিন রুমির দুই পা আঁকড়ে ধরে বললুম।
-পা ছাড়ুন মির্জা। আপনি শেষ হয়ে যাচ্ছেন- এই সৃষ্টির গভীরে হারিয়ে যাচ্ছেন-এর চেয়ে বড় আনন্দ ও সত্য আর কিছু নেই। আমি আশীর্বাদ করি, বিড়ালের মতো যেন মৃত্যু হয় আপনার
-কেন? -মৃত্যুর সময় বুঝতে পেরে বিড়ালরা একা হয়ে যায়। কাউকে বিরক্ত করে না, কারুর করুণা চায় না। মৃত্যুর মুখোমুখি সে একা। মির্জা, একাকিত্বই একমাত্র সত্য। আপনি এত উদ্বেল কেন? সবাই তো একদিন কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাবে। এই দুনিয়ায় জন্মেছেন, একে ছেড়ে চলে যাবেন-কী হাল্কা, পালকের মতো উড়ে যাওয়া-এই আনন্দটুকুই তো আপনার একাকিত্বের সঙ্গী।
৪২. আমি তো ঐতিহাসিক নই
জানা হ্যায় জিম্ম জহাঁ, দিল ভি জল গয়া হোগা
কুরেদেত হো যো অপ্ রা জুস্তজু কেয়া হ্যায়?
(শরীর জ্বলে গেছে যখন, তখন হৃদয়ও পুড়ে গেছে
ছাই রইয়ে গেছে শুধু, আর খোঁজো কী।)
আমি তো ঐতিহাসিক নই ভাইজানেরা, তাই দেশটা দুভাগ হয়ে কত লাখ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়েছিল, কত মানুষ হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে, কত মেয়ে ধর্ষিতা হয়েছে, কত মানুষকে হর হর মহাদেব বা আল্লাহ আকবর চিৎকার করতে করতে হত্যা করা হয়েছিল, আমি বলতে পারব না। আমার ঝোলায় আছে শুধু কয়েকটা কিস্সা, আমি সেই কাহিনীগুলোই আপনাদের বলতে পারি। তবে কিনা, ইতিহাস তো শুধু কতগুলো সাল-তারিখ, সংখ্যার হিসেব নয়; মানুষের মুখে মুখে-গল্পে-গানেও তো ইতিহাসের ছবিটা তৈরি হয়ে ওঠে। দিল্লির এক দোস্তের কাছে শুনেছিলাম, ওখানে কুড়ি হাজারের বেশী মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল, পুরোনো। দিল্লিতে চল্লিশ হাজারের বেশী মুসলমানদের বাড়ি-সম্পত্তি অধিকার করে নেওয়া হয়। কিন্তু এসব তথ্য নিয়ে আমি কী করব বলতে পারেন? শরিফান বা বিমলাদের মতো কিশোরির জীবন কীভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল, তার কি কোনওভাবে ক্ষতিপূরণ সম্ভব? সহায়ের মতো মানুষের কি ওভাবে কুকুরের মৃত্যু মরে যাওয়া উচিত ছিল? আর যে বৃদ্ধা তার মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে গিয়ে রাস্তাতেই মারা গেল, তার স্মৃতি আমি কী করে মুছব বলুন তো? রামখিানের মতো ভালো মানুষ কোন হিংসার উন্মাদনায় আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল? আমরা যারা দাঙ্গার বলি হইনি, তারা সারা জীবন তো এরকম ইতিহাসই বহন করেছি, যে ইতিহাস মহাফেজখানায় নয়, রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে পাওয়া যায়। সেই ইতিহাসের ভেতরে ভারত আর পাকিস্থানের মাঝে নামহীন এক ছোট ভূমিখণ্ডে পড়ে থাকে টোবাটেক সিং। এরা-মির্জাসাব-এই মানুষগুলোই-এরাই এখনও আমাদের নির্বাসিত হওয়ার দিনগুলির জীবন্ত ইতিহাস। শরিফানের কথা শুনলে, তাকে কি আর কখনও কেউ ভুলতে পারবে? দিল্লিতে কত মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল, তার হিসেব এক-এক ঐতিহাসিক এক-একরকম দিতে পারেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিসেবটা বাড়তে পারে, কমতেও পারে; কিন্তু মেয়ে সকিনার মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সিরাজুদ্দিন যখন চিৎকার করেছিল, আমার লেড়কি জিন্দা হ্যায় হুজুর, আমার লেড়কি জিন্দা হ্যায়, সেই মুহূর্তটাকে আর তো বদলে ফেলা যাবে না। দুনিয়া যতদিন থাকবে, ওই ক্ষতচিহ্নটা থেকেই যাবে, যেভাবে। নাৎসি ক্যাম্পের, গুলাগের গণহত্যাকে মুছে ফেলা যাবে না।
