দেশভাগ আমাদের জীবনে হত্যার বীভৎস উৎসব হয়ে উঠেছিল, মির্জাসাব। শুধু তো মানুষ মানুষকে হত্যা করেনি, হত্যা করেছে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালবাসা, নির্ভরতাকে। একটা পরিবার কোনও মতে দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বেঁচে ঝোপঝাড়ে লুকিয়েছিল। তবে তাদের কিশোরি মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। ছোট মেয়েটাকে কোলে আঁকড়ে রেখেছিল মা। দাঙ্গাবাজরা ওদের বাড়ির মোষটাকে নিয়ে গিয়েছিল। গরুটা ছিল, কিন্তু তার বাছুর হারিয়ে গিয়েছিল। তো, রাতে ঝোপের মধ্যে গরুটাকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী লুকিয়েছিল। ছোট মেয়েটা ভয়ে। মাঝে মাঝে কেঁদে উঠেছিল। মা আতঙ্কে মেয়টার মুখ চেপে ধরছিল। এমন সময় দূর থেকে একটা বাছুরের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে গরুটাও উন্মত্ত হয়ে ডেকে উঠল; সে চিনতে পেরেছিল, ওটা তার সন্তানেরই আওয়াজ। স্বামী-স্ত্রী কিছুতেই গরুটাকে শান্ত করতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর ওরা দেখতে পেল, দূর থেকে মশালের শিখা এগিয়ে আসছে বউটা তখন রাগে -হতশায় স্বামীকে বলে উঠল, জন্তুটাকে কেন আমাদের সঙ্গে টানতে টানতে নিয়ে এলে? দাঙ্গার আগুন এভাবেই আমাদের সব অনুভূতিকে পুড়িয়ে আঙরা বানিয়ে দিচ্ছিল।
মির্জাসাব, বারে বারে মনে পড়ে, কোথায় কে যেন, উন্মাদের মত বিড়বিড় করে বলে চলেছে :
মানুষ মেরেছি আমি-তার রক্ত আমার শরীর
ভরে গেছে; পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার
ভাই আমি; আমাকে কনিষ্ঠের মতো জেনে তবু
হৃদয়ে কঠিন হয়ে বধ করে গেল, আমি রক্তাক্ত নদীর
কল্লোলের কাছে ভয়ে অগ্রজপ্রতিম বিমূঢ়কে
বধ করে ঘুমাতেছি-তাহার অপরিসর বুকের ভিতরে
মুখ রেখে মনে হয় জীবনের স্নেহশীল ব্রতী
সকলকে আলো দেবে মনে করে অগ্রসর হয়ে
তবুও কোথাও আলো নেই বলে ঘুমাতেছে।
ঘুমাতেছে
যদি ডাকি রক্তের নদীর থেকে কল্লোলিত হয়ে
বলে যাবে কাছে এসে, ইয়াসিন আমি,
হানিফ মহম্মদ মকবুল করিম আজিজ–
আর তুমি?? আমার বুকের পরে হাত রেখে মৃত মুখ থেকে
চোখ তুলে শুধাবে সে- রক্তনদী উদ্বেলিত হয়ে
বলে যাবে, গগন, বিপিন, শশী, পাথুরেঘাটার;
মানিকতলায়, শ্যামবাজারে, গ্যালিফ স্ট্রিটের, এন্টালির—
হ্যাঁ, কেউ নেই, কিছু নেই-সূর্য নিভে গেছে। আর যেন কখনও জ্বলে উঠবে না। সে-রকমই একদিনে কাসিম খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়িতে এসে পৌঁছল। ওর ডান পায়ে গুলি লেগেছিল, রক্তে পা ভিজে গেছে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই কাসিমের চোখের সামনে কালচে রক্তের পর্দা দুলে উঠল। জমাট রক্তের মধ্যে পড়ে আছে তার বিবির মৃতদেহ। কাসিম কিছুক্ষণ। হতবাক হয়ে চেয়ে রইল, তারপর কাঠ কাটার কুড়লটা হাতে তুলে নিল। এবার হত্যার বদলে হত্যা। রাস্তায়, বাজারে এবার সে-ও রক্তের বন্যা বইয়ে দেবে। বেরোতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল, শরিফান-তার লেড়কি শরিফান কোথায়? কাসিম চিৎকার করে উঠল, শরিফান–শরিফান-
কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। শরিফান হয়তো ভয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে। ভেতরের বারান্দায় যাওয়ার দরজায় মুখ রেখে কাসিম ফিসফিস করে ডাকল, শরিফান -বেটি আমি এসে গেছি।
যেন নির্জন কোন গুহায় এসে সে ঢুকেছে, এমনই নীরবতা। দরজা ঠেলে বারান্দায় পা রাখতেই কাসিম স্থির হয়ে গেল। একটু দূরেই পড়ে আছে শরিফানের সম্পূর্ণ নগ্ন মৃতদেহ। যেন এইমাত্র একটা গোলাপকে ছিঁড়ে কুটি-কুটি করে ফেলা হয়েছে। কাসিমের ভেতর থেকে একটা বিস্ফোরণ বেরিয়ে আসতে চাইছিল, কিন্তু ঠোঁট চিপে সে দাঁড়িয়েছিল। তারপর দুহাতে মুখ চেপেসে আর্তনাদ করে ওঠে, শরিফান-বেটি আমার। অন্ধের মতো সে হাতড়ে হাতড়ে সে কিছু কাপড় জোগাড় করে আনে, ছড়িয়ে দেয় শরিফানের ওপর। তারপর আর ফিরে তাকায় নি। স্ত্রীর মৃতদেহের সামনেও আর দাঁড়ায়নি। হয়তো শরিফানের নগ্ন শরীরটাই সে শুধু দেখতে পাচ্ছিল। কুঠার নিয়ে কাসিম বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল।
আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসা লাভার মতো সে দৌড়তে লাগল। চওকের কাছে এসে এক শিখকে দেখতে পেয়েই কাসিম কুঠার চালাল। ঝড়ে শিকড়-উপড়োনো গাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লোকটি। কুঠার ঘোরাতে ঘোরাতে কাসিম এগিয়ে চলল। কাসিমের কুঠারের আঘাতে পর পর আরও তিনটি মৃতদেহ রাস্তায় ছড়িয়ে থাকল। শুধু নগ্ন শরিফানকেই দেখতে পাচ্ছিল; তার ভেতরের বারুদের স্তূপ তখন সশব্দে জ্বলছে। একের পর এক জনশূন্য বাজার পেরিয়ে সে একটা গলিতে এসে ঢুকল। কিন্তু সেখানে শুধুই মুসলমানদের বাড়ি। অন্য পথ ধরল সে। তার মুখে হিন্দুদের উদ্দেশ্যে খিস্তির ফোয়ারা আর হাতে ঝলসাচ্ছে রক্তমাখা কুঠার।
একটা বাড়ির দরজায় হিন্দিতে নাম লেখা দেখে কাসিম দাঁড়িয়ে পড়ল। কুঠার দিয়ে সে দড়জায় আঘাত করতে শুরু করল। দরজা ভেঙে পড়ল। কাসিম ভেতরে ঢুকেই খিস্তি দিতে দিতে বলতে লাগল, ভেতরে যারা আছিস, বেরিয়ে আয় বেজন্মার বাচ্চারা।
ভেতরের দরজা ঠেলে খুলতেই কাসিমের মুখোমুখি একটা মেয়ে, শরিফানেরই বয়সি, নিষ্পাপ, সবুজ। কাসিম দাঁতে দাঁত চেপে বলল, কে তুই?
-বিমলা। মেয়েটার কণ্ঠস্বরে কচি পাতার কাঁপুনি।
-শালি হিন্দুর বাচ্চা—
কাসিম কিছুক্ষণ স্থির চোখে পনেরো-ষোলো বছরের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হাতের কুঠার নামিয়ে রেখে মেয়েটাকে দুহাতে চেপে ধরে বারান্দায় নিয়ে গেল। পাগলের মতো মেয়েটার জামাকাপড় ছিড়তে সুরু করল। সময় তখন স্থির হয়ে গেছে, মির্জাসাব। কাসিম মেয়েটাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে গলা টিপে মারল। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। একেবারে শরিফান-শরিফানই শুইয়ে আছে। কাসিম দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছিল। শরীরের ভেতরে এতক্ষণ আগুন জ্বলছিল, এখন শুধুই বরফ। আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভা ঠাণ্ডা পাথর হয়ে গেছে। নড়বার মতো ক্ষমতা ছিল না কাসিমের।
