কথায় কথায় যারা আইন দেখায়, তাদের রাজত্বে আইনের কোনও বালাই রইল না। শুধু, আপনি হিন্দুস্থানের আদমি-বলতে পারবেন না, ওরা আইনকে কবরে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। ওরা বলে দেবে, কারা আইন মানে না, আপনাকে তা মেনে নিতে হবে। একটা ঘটনা বলি। হাফিজ মাম্মু আমাদের কাছের মানুষ ছিলেন। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তাঁর ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ যখন ধোপে টিকল না, তখন তো মাম্মুর বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতেই হবে। কমিশনার মাম্মুকে ডেকে পাঠালেন।
-হাফিজ মুহম্মদ খান কে?
-আমি হুজুর।
হাফিজ মাম্মু কে?
-আমি সাব।
-তার মানে?
-আমার নাম হাফিজ মুহম্মদ খান। তবে সবাই হাফিজ মাম্মু বলেই ডাকে।
-কেন?
-মানুষের মর্জি হুজুর।
-দুজন যে একই লোক আমি কী করে বুঝব?
হুজুর, আমি তো বলছি।
-আমিও তা হলে বলছি, তুমি কিছুই পাবে না।
-কেন হুজুর।
-আগে প্রমাণ করো, তুমি কে?
হাফিজ মাম্মুকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছিল। আইনের রাজত্ব বলে কথা। শুনেছিলুম, লাহোরে নাকি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য দফতর খোলা হয়েছে। বিদ্রোহী সিপাইরা যাদের সম্পত্তি লুঠ করেছে, তারা ১০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ পাবে। হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ আপনি পাবেন একশো টাকা। আর গোরা সিপাইরা যে লুঠপাট চালিয়েছে, তার জন্য কোনও ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে না। এর চেয়ে বড় সুবিধার আর কী হতে পারে? হিন্দুস্থান তো ওদের বাপের সম্পত্তি, লুঠপাট চালিয়ে ক্ষতিপূরণ দেবে কেন?
কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত না, মান্টোভাই। বকির আর হুসেন এসে মাঝে মাঝে জড়িয়ে ধরত। এটা দাও, ওটা দাও। আমার হাতে পয়সা কোথায় বলুন? কিন্তু ওদের তো সে কথা বলা যায় না। একদিন বিরক্ত হয়ে কাল্লুকে মহলসরায় পাঠালুম। উমরাও বেগমের কোনও গয়না যদি বিক্রি করা যায়। কাল্লু ফিরল না, কিছুক্ষণ পর উমরাও এল আমার ঘরে। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
-বেগম, তুমি এলে কেন?
-আর তো আমার কাছে কিছু নেই।
হারামজাদা কাল্লুই তো এসে বলতে পারত। ও গেল কোথায়?
-ওর কোন দোষ নেই মির্জাসাব। আপনাকে আমার কিছু বলার ছিল।
-বসো। এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কথা হয়?
-আমাকে ক্ষমা করুন মির্জাসাব।
-কী হয়েছে বেগম?
-আমি বেওকুফ বুঝতে পারিনি।
-কী হয়েছে বলো তো?চুরি করে কিছু খেয়েছ না কি? আমি হেসে বলি।-তবে খাবেই বা কী? হাওয়া ছাড়া তো কিছু নেই।
-মির্জাসাব-। কথা শেষ না করেই সে কাঁদতে শুরু করে। আরে, এত চোখের জল কোথা থেকে আসে এই জেনানাদের?
-কেঁদো না বেগম। ব্রিটিশরা দেখলে গুলি করবে। দেশটাকে ওরা মরুভূমি বানাতে চায়, আর তুমি চোখের ভেতর এত জল লুকিয়ে রেখেছ? এবার বল তো, কী বেওকুফিটা করেছ? আমার চেয়ে বড় বেওকুফ তো তুমি নও।
-সিপাইরা যখন এল আমি একটা বাক্স ভর্তি কিছু গয়না কালেসাবের বাড়িতে রেখে এসেছিলাম। জাঁহাপনার মুর্শিদ তিনি, সিপাইরা তো আর তার বাড়ি লুঠ করবে না।
-হু। সব খোয়া গেছে, তাই তো?
সিপাইরা কালেসাবের বাড়িতে লুঠপাট করেনি, কিন্তু গোরা সৈনিকরা তো আর জাঁহাপনার
মুর্শিদকে ছেড়ে দেবে না, মান্টোভাই। উমরাওয়ের শেষ সম্বলটুকুও এভাবে লোপাট হয়ে গেল। বলতে বলতে উমরাও কাঁদছিল। আমি তার হাত ধরে বললুম, বেগম, তুমি তো এত বছর দ্বীনের পথেই আছ। খোদা যে এবার পথের ভিখিরি করে ছাড়লেন, তার মানে বোঝ না? এখন গোটা দুনিয়াটাই তোমার। উমরাও ঘোলাটে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
-আনন্দ করো বেগম, আনন্দ করো। জীবন থেকে যত অলঙ্কার ঝরে পড়ে, ততই তো আনন্দের পথ খুলে যাবে।
-আমরা খাব কী মির্জাসাব?
-গু। নিজেদের গু খেয়ে বেঁচে থাকব। ওখানে তো বেজন্মাগুলো হাত দিতে পারবে না।
-কী কথায় কী বলেন আপনি মির্জাসাব, নিজেও জানেন না।
-ঠিক বলছি, বেগম, ওরা আমাদের দুনিয়া থেকে লোপাট করে দেবার জন্য হিন্দুস্থানে এসেছে।
কেল্লায় আর লোহারুর নবাব জিয়াউদ্দিন খানের কিতাবখানায় আমার কত যে গজল ছিল! আমি যা-ই লিখতুম নবাব জিয়াউদ্দিন তার নকল রাখতেন। প্রায় নশো পৃষ্ঠার গদ্য আর দুহাজারের বেশি কবিতা তার কাছে ছিল। দেখবার মতো ছিল সে-সব কিতাব। মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো, ওপরে সোনা-রুপোর সুতোর অলঙ্করণ। জাঁহাপনার সন্তান, আমার শার্গিদ মির্জা ফকরুদ্দিনও আমার গজলের একটা সংগ্রহ তার কিতাবখানায় রেখেছিল। নিজের লেখা তো আমি কখনও গুছিয়ে রাখতে পারিনি। এতগুলো বছর পেটের ধান্দায়, নানারকম ফন্দিফিকির করে কেটে গিয়েছে। ফিরিঙ্গিরা যখন লুঠপাট শুরু করল, কিতাবখানাকেও ওরা রেহাই দেয়নি। কত যে আশ্চর্য কিতাব এই দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেল। একদিন রাস্তার এক ভিখারি আমার গজল গাইছে শুনতে পেলুম। আমি তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করলুম, এই গজল তুমি কোথায় পেলে, মিঞা?
-রাস্তায় হুজুর।
-কাগজটা তোমার কাছে আছে?
সে তার আলখাল্লার পকেট থেকে একটা ছেঁড়া কাগজ বার করে আমার হাতে দিল। হ্যাঁ, আমার লেখা গজল। কেল্লার কিতাবখানায় যে হাতে-লেখা বই ছিল, তারই একটা পৃষ্ঠা। আমি কান্না সামলাতে পারিনি, ভাইজানেরা।
-কী হল, হুজুর?
-কাগজটা আমাকে দেবে?
-নিন না। ও দিয়ে আমার কী হবে?
-তুমি গাইবে কী করে?
ভিখিরি হেসে বলল, দিলকেতাবে সব লিখে নিয়েছি, হুজুর।
একেকটা দিন পার হয়ে যায়, মান্টোভাই, আমার দিলকেতাবের পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে উড়ে যায়। মন খুলে কথা বলার একজন লোকও নেই। অনেক মানুষের সঙ্গে খোশগল্প করা যায়, ঠাট্টা ইয়ার্কি মারা যায়, কিন্তু সবাই তো তার নিজের মতো করে হাম জুবান, হাম শুখ লোগ চায়। সেইরকম দুয়েকজনকে তো আমার পেতে ইচ্ছে করত, যাঁদের সঙ্গে আমি কবিতা নিয়ে, আমার কল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারি। তাঁরা পাশে না থাকলে তো গুলবাগও শুকিয়ে যায়। দিল্লিতে তখন তো শুধু সৈনিক, ইংরেজ, পাঞ্জাবি আর হিন্দু লোকজন। আমার তজ্জীব-এর মানুষ। কোথায়? জওক নেই, মোমিন খান নেই, কোথায় গেলেন নিজামুদ্দিন মামনুন? কবিদের মধ্যে শুধু আমি আর আজুদা বেঁচে ছিলুম। আজুদা একেবারে নীরব হয়ে গিয়েছে, আর আমার হতবুদ্ধি অবস্থা। কেউ আর গজল লেখে না, কেউ আর কবিতার কথা বলে না। দুনিয়ায় কখনও কখনও এমন দুর্ভাগ্যের সময় আসে, মান্টোভাই, যখন কবিতার মৃত্যু হয়। আমি যেন গজলের কবরের পাশে বসেই প্রহরের পর প্রহর গুণে যাচ্ছিলুম। মৃত্যু এসে কবে আমাকে এই দুনিয়াদারিরি বাইরে নিয়ে যাবে, তার জন্য অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই ভাবতুম না।
