ওই দিনগুলোর কথা ভাবতে গেলে সব কেমন গুলিয়ে যায়। মনে হয়, একটা ভুলভুলাইয়ার মধ্যে হারিয়ে গেছি, আর সেই ভুলভুলাইয়ার পথে পথে জমাট বেঁধে আছে রক্ত, ছড়িয়ে আছে কত চেনা অচেনা মানুষের কাটা মুণ্ডু, তারা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কিছু বলতে চায়, আমি দেখতে পাই তাদের ঠোঁট ঘৃণায়-অপমানে কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই রকম। বেওয়ারিশের মত মৃত্যু তো তাদের প্রাপ্য ছিল না, মান্টোভাই।
বাদশাহের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক ছিল, তাদের ওরা কোতল করতে ছাড়েনি। ওদের চোখে তখন মুসলমান মানেই বিশ্বাসঘাতক। আমিও সন্দেহভাজনদের তালিকায় ছিলুম। একদিন কর্নেল বার্ন গোরা সিপাই পাঠালেন আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পাতিয়ালার মহারাজা নরেন্দ্র সিং প্রথম থেকেই ইংরেজদের পক্ষে ছিলেন। আমার বাড়ির গলিতেই থাকতেন মাহমুদ খান, মুর্তাজা খান, গুলামুল্লা খানের মতো হাকিম। এরা সব পাতিয়ালা দরবারের মানুষ। ব্রিটিশদের সঙ্গে কথা বলে মহারাজা নরেন্দ্র সিং আমাদের গলিতে নিজের সিপাই বসিয়েছিলেন। তাই আমরা খাবারদাবার, জলের যোগাড় করতে একটু বেরুতে পারতাম। তবে চাঁদনি চকের ওপারে যাওয়ার হুকুম ছিল না। না হলেই গর্দান যাবে। তো গোরা সিপাইরা পাচিল ডিঙিয়ে আমাদের গলিতে ঢুকে পড়ল। সোজা এসে আমাদের বাড়িতে হানা দিল। আমার সঙ্গে সঙ্গে বকির, হুসেন, কালু, আশেপাশের বাড়ির দুএকজনকেও কর্নেল বার্নের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। চওকের কাছে কুতুবউদ্দিনের হাভেলিতে ছিলেন কর্নেল। এরা সত্যিই অদ্ভুত মানুষ, যেন সেদিনই দুনিয়াতে পয়দা হয়েছেন। আমাকে ভাঙা ভাঙা উর্দুতে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, আপনি মুসলমান?
মজা করার সুযোগ আমিই বা ছাড়ব কেন? বললুম, আধা মুসলমান হুজুর।
-মতলব?
-মদ খাই, তবে শুয়োর হারাম।
কর্নেল হা-হা করে হেসে উঠলেন।-আপনি তো রসিক দেখছি।
-রসে বসেই তো ষাটটা বছর কেটে গেল হুজুর। বলতে বলতে আমি তার দিকে লন্ডন থেকে পাঠানো চিঠিটা এগিয়ে দিই। মহারানি ভিক্টোরিয়ার জন্য যে কসীদা পাঠিয়েছিলাম তারই প্রাপ্তি স্বীকারের চিঠি।
-এটা কী?
-হুজুর একবার দেখুন।
কর্নেল বার্ন একবার চোখ বুলিয়েই চিঠিটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। -এসব ফালতু জিনিস আমার দেখার দরকার নেই।
-জি হুজুর।
-দিল্লিতে শান্তি ফিরিয়ে আনার পর আমাদের সঙ্গে দেখা করেন নি কেন?
-দেখা করতে চেয়েছিলাম, হুজুর। কিন্তু পথে বেরুলেই তো গুলি করে মারবে।
-নিমকহারামদের তা হলে কী করবে?
-ঠিকই তো হুজুর।
-তা হলে আসেননি কেন?
-হুজুর—
-আমি জানতে চাই আসেননি কেন?
-আমি একজন মির্জা, সাহেব।
-মতলব?
-পাল্কি ছাড়া আমি কোথাও যাই না। শহরে একজনও বেহারা নেই। কী করে আসব বলুন।
-তুমি কোন লাটের বাঁট হে, পাল্কি ছাড়া চলতে পারো না? কর্নেল বার্ন চিৎকার করে ওঠেন, গেট আউট-কেল্লার কাগজপত্রে তোমার নাম ছিল না বলে ছেড়ে দিলাম-গেট আউট
অপমান করাটা ওদের মজ্জায় মজ্জায়। মানুষকে ওরা যত অপমান করতে পারে, ততই ক্ষমতার নেশায় বুদ হয়ে যায়। আমি কি কর্নেল বার্নের মুখে মুতে দিতে পারতুম না? কিন্তু আমাদের তখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। শাহজাহানাবাদ থেকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া, অন্য কোনও পথ তো আমাদের সামনে খোলা ছিল না। শুধু মুসলমান বলেই এত অপমান, অত্যাচার, খুন হয়ে যাওয়া? শুধু মুসলমান বলেই আমি সন্দেহভাজন? ওরা যে বিজ্ঞানের বড়াই করে, তা কাদের থেকে পেয়েছিল, মান্টোভাই? এই মুসলমানদের থেকেই তো। এত সহজে ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে? সত্যিই তো যায়, আমি নিজের চোখে দেখেছি, শাহজাহানাবাদকে কীভাবে মুছে ফেলা হল।
কাউকে মুছে ফেলার জন্য আগে কী করতে হয়, জানেন? তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করো। এরপর কাজটা খুব সহজ। তার বিচারের প্রহসন ও মৃত্যুদণ্ড। জাঁহাপনা বাহাদুর শাহের ক্ষেত্রে ওরা একুশ দিনের প্রহসন চালিয়ে বাদশাকে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। বাদশার অধীন ঝক্কর, বাহাদুরগড়, বল্লভগড়, লোহারু, ফররুকগর, দুজানা, পতৌদির নবাবাদের কী অবস্থা করেছিল শুনুন। দুজানা, পতৌদি ছাড়া সব নবাবাকেই কেল্লায় এনে বন্দি করা হয়েছিল শাহজাহানাবাদ দখলের কয়েকদিনের মধ্যে। চাঁদনি চকের কাছে গাছ থেকে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয় ঝক্কর, বল্লভগড়, ফারুকনগরের নবাবদের।
এখন শস্ত্রধারী ইংরেজ সৈনিক
স্বেচ্ছাচারী ও স্বাধীন।
আতঙ্কহিম নিশ্চল মানুষ,
পথ জনহীন।
নিরানন্দ বাসভূমি আজ কারাগার।
চও পরাজিতের রক্তে রঙিন।
নগর মুসলমানের শোণিত –তৃষিত
প্রতিটি ধূলিকণা তৃপ্তিবিহীন।
আমি বসে বসে শুধু মৃত আর হারিয়ে যাওয়া মানুষদের সংখ্যা গুনি। তারা কেউ আমার আত্মীয় বন্ধু, কেউ পরিচিত। বন্ধু ফজল ই-হককে সারা জীবনের জন্য দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হল। শইফতা সাত বছরের জন্য কারাবন্দি হলেন। অন্যদের হত্যা করা হল বা শাহজাহানাবাদ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। শুধু এক-একটা নাম বেঁচে রইল আমার জীবনে-মুজাফফরাদৌল্লা, মির নাসিরুদ্দিন, মির্জা অসুর বেগ, আহমদ মির্জা, হাকিম রাজিউদ্দিন খান, মুস্তাফা খান, কাজি ফয়জুল্লা, হুসেন মির্জা, মীর মহদী, মীর শরফরাজ হুসেন, মীরন..। আমার শয়তানের কুঠুরিতে বসে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকি। ওই তো মীর মেহদি আসছেন। আরে ইউসুফ মির্জা না? মীরনও তো আসছেন। ইউসুফ আলি খানকেও দেখতে পাচ্ছি। ইয়া আল্লা! এত বন্ধুর মৃত্যু আমাকে বহন করতে হবে? আমি মরলে শোক করার জন্য আর কেউ রইল না, মান্টোভাই।
