আমরা নিরাপদে সেই রাস্তা পেরিয়ে এলাম। অশোক হেসে বলল, তুমি অযথা ঘাবড়াচ্ছিলে, মান্টো। আর্টিস্টদের ওরা ভালবাসে।
তাই? কে জানে! যারা দাঙ্গা করে, রাস্তাঘাট রক্তে ভাসিয়ে দেয়, তাদের কাছে শিল্পের কোন মূল্য আছে? কবিরজি একদিন লাহোরের পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখলেন, এক দোকানি কবি সুরদাসের বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ঠোঙা তৈরি করছে। তিনি কান্না সামলাতে পারলেন না। তিনি গিয়ে দোকানিকে বললেন, এ কী করেছ তুমি?
-কেন?
-দেখতে পাচ্ছ না, এই বইতে কবি সুরদাসের কবিতা রয়েছে। এর পাতা ছিঁড়ে তুমি ঠোঙা করছ?
-সুরদাস? দোকানি হেসে ওঠে।-সুরদাস যার নাম, সে কখনও ভগত হতে পারে না।
-কেন?
-সুর মানে কী।
-যেমন গানের সুর। ঈশ্বরের নামও তো—
-সুর মানে যে শুয়োর, জানো না? দোকানি হাসতে থাকে।
-তুমি ওই মানেটাই ধরে বসে আছো?
আরেকদিন কবিরজি দেখলেন, কারা যেন দেবীলক্ষ্মীর মূর্তিকে খড়ে ঢেকে দিয়ে গেছে।
কবিরজি দেবীর মূর্তি থেকে নোংরা পরিস্কার করে দিতে লাগলেন। একদল লোক এসে বলল, এ কী করছেন আপনি?
-কেন?
-আমাদের ধর্মে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ জানেন না?
-সুন্দর প্রতিমাকে নোংরার করার কথা তো কোনও ধর্মে বলা নেই।
কবিরজির কথা শুনে লোকগুলো হাসতে শুরু করল, কাঁদতে কাঁদতে কবিরজি লাহোরের পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। অবাক হচ্ছেন ভাইজানরা? কবিরজি কবে আর লাহোরে আসবেন? আমি তাঁকে নিয়েই একটা কিস্সা লিখেছিলাম-দেখ কবিরা রোয়ে। কবিরজি যেখানে খুশিই যেতে পারেন, মির্জাসাবের সাথে মণিকর্ণিকার ঘাটে যদি তার দেখা হতে পারে, তবে লাহোরের পথে পথেই বা তিনি হাটবেন না কেন?
শেষ পর্যন্ত লাহোরেই ফিরে যেতে হল আমাকে। ১৯৪৮-এর জানুয়ারি মাসে সব কিছু গুছিয়ে বম্বে থেকে করাচির জাহাজে উঠে বসলাম। হয়তো ভয় পেয়েছিলাম। আমি তো ভীতু মানুষ। ইসমতকেও বলেছিলাম, লাহোর চলো,ওখানকার হিন্দুরা এপারে চলে এসেছে, কারও না কারও বাড়ি পেয়ে যাব। চলো ইসমত, লাহোরে আবার সব নতুন করে শুরু করা যাক।
ইসমত রাজি হয়নি। শুধু বলেছিল, নিজের চামড়া বাঁচাতে এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?
-আমি এ-দেশে বহিরাগত, ইসমত।
-কে বলল?
-আমি জানি।
-না জানো না। ইউ আর আ কাওয়ার্ড। তাই পালাচ্ছ।
আমি তার চোখ দেখে বুঝেছিলাম, মির্জাসাব, সেদিন থেকে ইসমত আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করল। তাই বলে একটা চিঠি লিখবে না? আমার চিঠির উত্তর দেবে না? ঘৃণা কি সব স্মৃতি মুছে দেয়? হয়তো। না হলে দাঙ্গার দিনগুলোর ঘৃণা কত কত শতাব্দীর স্মৃতি মুছে দিয়েছিল কীভাবে?
৪১. বিস্মৃতির কুয়াশার ভিতরে
বহ্ দিল নহীঁ রহা হ্যয় নহ্ বহ্ অব দিমাগ হ্যয়
জী তনমেঁ অপনে বুঝতাসা কোই চিরাগ হ্যয়।
(সে হৃদয়ও নেই, সে মাথাও নেই এখন,
শরীরে প্রাণ আছে, যেন একটা নিভু নিভু প্রদীপ।)
হ্যাঁ, মান্টোভাই, এরপর শুধু বিস্মৃতির কুয়াশার ভিতরে জেগে থাকার সময়। চোখ আর কিছু দেখতে পায় না। মন আর কোনও কথা বলে না। হৃদয়ে কোনও ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে না। শাহজাহানাবাদ দখল করে ব্রিটিশ আমাদের উপহার দিল একটা মৃত শহর। সেখানে সব সময় হিম বাতাস বয়, ঝরা পাতা উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়, রাস্তাগুলো নিহত মানুষের শুকিয়ে যাওয়া রক্তে কালো হয়ে গেছে। প্রত্যেকটা দিন অভিশপ্ত, আমি জানতুম, এর কোনও শেষ নেই, সব ধ্বংস হয়ে গেছে।
মহল্লার পর মহল্লা ফাঁকা হয়ে গেল। মুসলমানদের তো ওরা কচুকাটা করেছে, যারা বাঁচতে পেরেছিল, তারা পালিয়ে গেছে। রাতে তাদের ঘরে বাতি দেখা যায় না, সকালে উঠোনে দেখা যায় না উনুনের ধোঁয়া। কথা বলবার মতো কেউ ছিল না। আমি তো কথা না বলে থাকতে পারতুম না। বন্ধুরা ছাড়াও প্রত্যেকটা বাড়ির লোকজনের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক ছিল আমার। হাসি ঠাট্টা, খোসগল্প না করতে পারলে হাঁফিয়ে উঠতুম। এত নীরবতা আমি কী করে সহ্য করব বলুন। শেষ পর্যন্ত নিজের কলমের সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করলুম, আর নিজের ছায়াই হল আমার বন্ধু। চিঠি লিখে যে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলব, তারও তো উপায় ছিল না। ডাক-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। খবরের কাগজ আর আসে না। ফরাসি মদও পাওয়া যায় না। রাত্তিরে ওটুকু না পেলে আমি ঘুমোতে পারতুম না। এক বন্ধু মাঝে মাঝে রম পাঠাতেন, তাই কোনও মতে বেঁচে ছিলুম। পেনশন বন্ধ, কিন্তু অতগুলো লোকের পেটের ভাত তো জোগাড় করতে হবে। উমরাও বেগমের গয়নাগাটি বিক্রি করা শুরু হল। বিছানা, জামাকাপড়ও বিক্রি করতে হয়েছে। হেসে নিজেকে বলতুম, মির্জা, অন্য লোকেরা রুটি খায় আর তুমি খাচ্ছ কাপড়। কিন্তু সব কাপড় খাওয়া হয়ে গেলে কী করবে? আঙুল চুষব। বাকি পেনশন যদি পাই তবুও আয়না থেকে রং মুছে যাবে না, আর না-পেলে তো আয়নাটাই চুরমার হয়ে যাবে। হেঁয়ালি করছি না, ভাইজানেরা। এই হৃদয় তো আয়নার মতোই। রোজ ভাবতুম, দিল্লি ছেড়ে এবারে পালাতেই হবে, এখানে আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। জল পর্যন্ত পাওয়া যায় না।হিসেব মেপে খেতে হয়। ভাবতে পারেন, মান্টোভাই, দুদিন আমাদের ঘরে এক ফোঁটা জল ছিল না। তবু এরই মধ্যে বেঁচে থাকতে পেরেছি, তা দুচারজন মানুষের সাহায্যে। খোদা আমাকে এই অমূল্য রত্ন দিয়েছিলেন মানুষ দুঃসময়ে তারা কেউ না কেউ আমার পাশে এসে দাড়িয়েছে। হীরা সিং, শিবাজিরাম ব্রাহ্মণ-ওরা আমার ছেলের মতো, শার্গিদ, আমাকে কতভাবেই না সাহায্য করেছে। শিবাজিরামের ছেলে বালমুকুন্দও পাশে-পাশে থেকেছে। আর হরগোপাল তক্তা তো সেকান্দ্রাবাদ থেকে যখন যেমন পেরেছে টাকা পাঠিয়েছে।
