ঈশ্বর সিং শুধু মাথা নাড়ছিল। কুলবন্ত তখন রাগে উন্মাদ। মেঝেয় পড়ে থাকা কৃপান তুলে নিয়ে সে ঈশ্বর সিংয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঈশ্বর সিংয়ের গাল থেকে রক্ত ঝড়তে থাকে। কুলবন্ত ঈশ্বর সিংয়ের চুল ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে গালাগালির ফোয়ারা ছোটায়। ঈশ্বর সিং ঠাণ্ডা গলায় বলে, এবার থামো কুলবন্ত।
-কুত্তিটা কে, আগে বলো।
ঈশ্বর সিংয়ের গাল বেয়ে রক্তধারা নামছে জিভ দিয়ে সে নিজের রক্তের স্বাদ নেয়। তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। সে মাতালের মতো বলে, কী বলব আমি কুলবন্ত? এই কৃপাণ দিয়ে আমি ছজনকে খতম করেছি।
-আবার জিজ্ঞেস করছি, কুত্তিটা কে?
-মেয়টাকে কুত্তি বোলো না। ঈশ্বর সিং ধরা গলায় বলে।
-মানে? কে ও?
-বলছি। মুখ মুছে সে তার রক্তমাখা হাতের দিকে তাকায়। তারপর বিড়বিড় করে বলে, শালা সব-আমরা সব মাদারচোদ।
-আসল কথায় এসো ঈশ্বর সিয়াঁ। কুলবন্ত চেঁচিয়ে ওঠে।
-অপেক্ষা করো সব তোমাকে বলব। তবে সময় দিতে হবে, কুলবন্ত। সব কথা কি সহজে বলা যায়? মানুষ-বুঝলে কুলবন্ত-ওই যে বললাম -মাদারচোদ-মানুষ একমাত্র মাদারচোদ। শহর জুড়ে লুঠপাট চলছিল, আমিও ওদের সঙ্গে ভিড়ে মিশে গেলাম। যত টাকা, গয়না পেয়েছিলাম, সব তো তোমার হাতেই দিয়েছি। কিন্তু ওই একটা কথা, কুলবন্ত, আমি তোমাকে বলিনি, বলতে পারিনি।
-কী?
-একটা বাড়ির দরজা ভেঙে আমরা ঢুকেছিলাম..হ্যাঁ, সাত..সাতজন মানুষ ছিল বাড়িটাতে-এই কৃপাণ দিয়ে আমি একা ছজনকে মেরেছি-বাদ দাও-এ সব কথা বাদ দাও কুলবন্ত-একটা মেয়ে ছিল জানো-কী যে সুন্দর-ওকে আমি সবার মতোই কেটে কুচি কুচি করে ফেলতে পারতাম-কিন্তু ভাবলাম-। ঈশ্বর সিং হেসে ওঠে, কী যে সুন্দর মেয়েটা, জানি, কী বলব তোমাকে। ভাবলাম, রোজ তো কুলবন্তকে খাই, আজ না হয় নতুন কিছু খাওয়া যাক।
-আমি জানতাম। কুলবন্তের ধারালো চোখ একই সঙ্গে ঘৃণা ও বিদ্রুপ।
-মেয়েটাকে কাঁধে নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম।
-তারপর?
-যেতে যেতে। ঈশ্বর সিং কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কী যেন বলছিলাম? মেয়েটাকে কাঁধে নিয়ে-সামনে একটা খাল পড়ল, চারপাশে ঝোপঝাড়ে ভরা। মেয়েটাকে ঝোপের ভেতরে শুইয়ে দিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, কিছুক্ষণ তাস ভাঁজা যাক। কিন্তু চারপাশে কে কোথায় ঘাপটি মেরে আছে, জানি না। তাই তুরুপের তাসই
-বলো-বলে যাও!
-তুরুপের তাসই ছুড়লাম।
-তারপর
ঈশ্বর সিং অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে বসে রইল। তারপর যেন দীর্ঘদিনের ঘুম ভেঙে সে চোখ খুলেছে, সেভাবেই কুলবন্তের দিকে তাকাল।মেয়েটা মরে গেছে-কখন যেন মরে গেছে। একতাল ঠাণ্ডা গোস্ত শুধু। জানি-তোমার হাতটা-জানি-
কুলবন্ত ঈশ্বর সিংয়ের গায়ে হাত দিয়ে দেখল বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা।
হ্যাঁ, মির্জাসাব, সে যেন একটা হিমযুগের মধ্য দিয়েই আমরা হেঁটে চলেছি। কত লোক খুন হয়েছিল? কত নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল? কত মানুষ মোহাজির হয়েছিল। এসব হিসেব আমার হাতে নেই, ভাইজানেরা। আর তা দিয়ে আমরা করবই বা কী বলুন? আমি একটা বাচ্চাছেলেকে দেখেছিলাম, সে কথা বলতে ভুলে গেছে। তার চোখের সামনে বাড়ির সবাই কে কুপিয়ে, গুলি করে মারা হয়েছে। সবাই যখন সংখ্যার কথা বলত, আমি ওই বাচ্চাটার মুখ দেখতে পেতাম-শূণ্য দৃষ্টি, নির্বাক-জলন্যাকড়ার এক ঘষায় ওর সব স্মৃতি মুছে গেছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এবার বম্বেকেও আমার জীবন থেকে মুছে ফেলতে হবে। শফিয়া, আমাদের বাচ্চারা অনেক আগেই লাহোর চলে গিয়েছিল। বারবার আমাকে লাহোরে যাওয়ার কথা লিখছিল শফিয়া। বম্বে আমার দ্বিতীয় জন্মস্থান, আমি কি করে তাঁকে ছেড়ে চলে যাব? তখন বম্বে টকিজে কাজ করি। নায়ক অশোককুমার আর সাভাক ওয়াচা বম্বে টকিজের মালিক। মুসলমানরা তখন সেখানে বড়বড় পদে। তাই হিন্দুদের বিদ্বেষ দিনে দিনে বাড়ছিল। ওয়াচা সাবকে হত্যা, বম্বে টকিজ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে কত যে চিঠি আসত। হিংসা আর অবিশ্বাসের পরিবেশটা আর ভাল লাগছিল না, মির্জাসাব। দিনে-দিনে মদের পরিমান বেড়ে যাচ্ছিল। অনেক হিন্দু কর্মচারী মনে করত, আমার জন্যই বম্বে টকিজে মুসলমানদের রমরমা। আমি, শহিদ, ইসমত,কামাল আমরোহি, হসরত লাখুনভি, নাজির আজমিরি, গোলাম হায়দার। আমরা সবাই তখন বম্বে টকিজে।
একদিন অশোককে বললাম, আমাকে এবার বরখাস্ত করো দাদামণি।
-মানে?
-আমি চাই না, আমার জন্য বম্বে টকিজ শেষ হয়ে যাক।
-তুমি পাগল হয়ে গেছে, মান্টো। ধৈর্য ধরো। আস্তে আস্তে সব থেমে যাবে। কিন্তু দিনে দিনে পাগলামি বাড়তে লাগল। ঘরে ঘরে আগুন, লুঠতরাজ, পথে ঘাটে খুনখারাবি। একদিন অশোক আর আমি বম্বে টকিজ থেকে বাসায় ফিরছিলাম। অশোকের বাড়িতে পৌঁছে ভাবছিলাম, কী করে নিজের বাসায় পৌঁছব। অশোক বলল, চলো মান্টো, তোমাকে পৌঁছে দিই। যা হয় হবে।
রাস্তা শর্ট করার জন্য অশোক মুসলমান বস্তির ভিতর দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল। সামনে থেকে একটা বিয়ের বরাত আসছিল। আমি অশোকের হাত ধরে বললাম, এ তুমি কোথায় এলে দাদমণি?
-চুপ করো। কোন চিন্তা নেই।
আমি সত্যিই খুব ভয় ভয়ে ছিলাম। অশোককে কে না চেনে? ওর মতো বিখ্যাত হিন্দুকে হত্যা করতে পারলে ওদের অস্ত্র সার্থক হবে। ওর গাড়ি যখন বরাতের সামনে এসে ঠেকল, তখন চিৎকার উঠল, অশোককুমার, অশোককুমার। আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। অশোক কিন্তু নির্বিকার। আমি গাড়ির জানলা থেকে মুখ বার করে বলতে যাচ্ছিলাম, আমি মুসলমান। অশোককুমার আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছেন। তার আগেই দুজন যুবক জানলার কাছে এসে বলল, অশোকভাই সামনের রাস্তা বন্ধ। বাঁদিকের গলি দিয়ে চলে যান।
