জিন্দগী অপনী যব ইস্ শকল্ সে গুজরী গালিব
হম্ ভি কেয়া ইয়াদ করেঁ কে খুদা রখতে থে।
(জীবন যখন এভাবেই কাঁটল গালিব,
ঈশ্বরের কৃপার কথা কীই-বা স্মরণ করব।)
৪০. একটা কিস্সা শুনুন ভাইজানেরা
কিস তরত্ কাটে কোঈ শবহা-এ তার-এ বর্ষগাল
হৈ নজর খুক্রদহ্-এ অন্তর-শুমারী, হায় হায়।।
(কেমন করে কাটবে বর্ষার অন্ধকার রাত্রিগুলি,
আমার চোখ যে তারা গুনতেই অভ্যস্ত হয়ে আছে, হায়।)
একটা কিস্সা শুনুন ভাইজানেরা মহাভারত-এ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে এই বৃত্তান্তটা বলেছিলেন। বনের ভিতরে এক শিকারির বিষাক্ত তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এসে লেগেছিল বিরাট, প্রাচীন এক গাছের শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে গাছটা পুড়তে শুরু করল। সেই গাছের ডালে বাসা বেঁধে থাকত নানারকম পাখি। গাছের মৃত্যু অবধারিত জেনে পাখিরাও পালাতে শুরু করল।শুধু একটা শুকপাখি তার বাসাতেই রয়ে গেল। এদিকে গাছকে জড়িয়ে আগুন ছড়াচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আগুন শুক পাখিকেও গ্রাস করবে। নিজের মৃত্যু সামনে দেখেও শুকপাখিটা তার বাসা ছেড়ে নড়ল না। আকাশপথ থেকে দেবরাজ ইন্দ্র এই ঘটনা দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি শুকপাখিকে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই উড়ে চলে গেল, তুমি এখনও বসে আছ কেন? তুমি কি আগুনে পুড়ে মরতে চাও?
-দেবরাজ, এই গাছেই আমার জন্ম, এর ডালে-পল্লবে ঘুরে ঘুরে আমি বড় হয়েছি, এই প্রাচীন। বৃক্ষের কাছেই শিখেছি, কীভাবে ধৈর্য ধরে বেঁচে থাকতে হয়, কত ঝড় ঝঞ্ঝায় এই গাছই আমাদের বাঁচিয়েছে।
-কিন্তু গাছের সঙ্গে সঙ্গে তো তুমিও মরবে।
-তাই হোক, দেবরাজ।
-মৃত্যুকে ভয় পাওনা তুমি?
-কে না পায়? শুকপাখি ম্লান হেসে বলে, কিন্তু দেবরাজ, মৃত্যুভয়ের জন্য কি কেউ ধর্মকে ত্যাগ করতে পারে?
-কী তোমার ধর্ম?
-এই গাছের জন্য আমি এখনও বেঁচে আছি। দুর্দৈবের দিনে তো আমি তাঁকে ছেড়ে যেতে পারি না।
-সাধু, সাধু। এমন ধার্মিক উত্তর আমি তোমার কাছে আশা করেছিলাম, হে শুকশ্রেস্ট। তুমি কী বর চাও, বলো?
-আমার প্রার্থণা আপনি পূরণ করবেন?
-অবশ্যই।
-তাহলে এই প্রাচীন বৃক্ষের জীবন ফিরিয়ে দিন।
ইন্দ্রের বরে বৃক্ষ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু যে প্রাচীন গাছটিতে আমি জন্মেছিলাম, বড় হয়েছিলাম, তাঁকে বাচানোর মতো কেউ ছিল না মির্জাসাব। দেশভাগের বিষাক্ত তির তাঁকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছিল। একটা দেশ ভেঙে পরপর দুদিনে দুটো দেশের জন্ম হল সারা হিন্দুস্থান জুড়ে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। কে ভুল, কে ঠিক, তা আমি আজ বিচার করতে চাই না-তার জন্য তো রাজনৈতিক নেতা, ঐতিহাসিকরা আছেন-এই কবরেও দুঃস্বপ্নগুলো ফিরে ফিরে আসে। কেউ বলেছে, এক লাখ হিন্দু মারা গেছে, কেউ বলেছে, এক লাখ মুসলমান মারা। গেছে। আমি তাদের বলছি, বলো, দুলাখ মানুষ মারা গেছে, হিন্দুদের মেরে মুসলমানরা ভেবেছে, হিন্দু নিকেশ হয়ে গেছে, হিন্দুরা মুসলমানদের মেরে ভেবেছে ইসলামকে কবরে পাঠানো গেছে। মির্জাসাব কাকে বোঝাবেন বলুন, ধর্ম তো এভাবে মরে না, ধর্ম বেঁচে থাকে আমাদের হৃদয়ে, বিশ্বাসে। শুধু ধর্মের নামে ভাই ভাইকে হত্যা করেছে, ভাই বোনকে ধর্ষণ করেছে, আর এক দেশ থেকে অন্য দেশে উদ্বাস্তুর স্রোত বয়ে গেছে। ওই নেহেরু-জিন্না পটেলদের হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। কী ঘৃণা, কী অবিশ্বাস চারদিকে। এই। নেতারা সব ছারপোকা, ভাইজানেরা, গরম জল ঢেলে তাদের নিকেশ করতে হয়। আমাদের মতো মানুষের রক্ত খাওয়া ছাড়া এদের আর কোনও কাজ নেই। না, মির্জাসাব, এদের কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
এমন এক গনগনে আগুনের মধ্য দিয়ে দিনগুলো পেরিয়ে যাচ্ছিল, যখন বন্ধুও বন্ধুকে হত্যা করতে পিছপা হয় না। হত্যালিপ্সা কী চেহারা নিতে পারে, তা আমি একদিন বুঝতে পেরেছিলাম। প্রতিদিন হাজার হাজার হিন্দু-মুসলমান মরছে। একদিন শ্যাম আর আমি রাওয়ালপিন্ডি থেকে আসা এক শিখ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। শ্যাম তো রাওয়ালপিন্ডিরই ছেলে। কিভাবে ওই পরিবারের আত্মীয়-পরিজনকে হত্যা করা হয়েছে, শুনতে শুনতে আমার হাড় হিম হয়ে যাচ্ছিল। শ্যামও খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। বুঝতে পারছিলাম, ওর মনের ভিতরে কী চলছে। বেরিয়ে আসার পর দেখলাম, শ্যাম তখনও কেঁপে – কেঁপে উঠছে। আমি ওর পিঠে হাত রাখলাম। শ্যাম আমার দিকে শূণ্য চোখে তাকিয়ে রইল, যেন আমাকে চেনেই না।
-শ্যাম
ও চুপচাপ হাঁটছিল।
-কী হয়েছে শ্যাম?
ম্লান হেসে বলল,কিছু না।
-তোমার কষ্ট হচ্ছে, না?
-না। শ্যামের দাঁত ঘষটানির আওয়াজ পেলাম।
-শ্যাম, আমি তো মুসলমান। আমাকে তুমি মারতে চাও না? আমি তার কাঁধ চেপে ধরি।
শ্যাম ঠাণ্ডা চোখে আমার দিকে তাকায়।
-বলো শ্যাম, সত্যি বলো, আমাকে মারতে চাও না?
শ্যাম কেটে কেটে বলল, না, এখন আর চাই না।
-তার মানে?
-যখন ওদের কথাগুলো শুনছিলাম-মুসলিমরা কীভাবে আমাদের হত্যা করেছে-হ্যা, তখন-তখন আমি তোমাকে সত্যিই খুন করতে পারতাম, মান্টো।
শ্যাম আমার হাত চেপে ধরে কেঁদে ফেলেছিল, আমাকে ক্ষমা করো মান্টো।
মির্জাসাব, এ তো শুধু হিন্দুস্থান কা তক্সী নয়, এ যে বন্ধুত্বেরও তক্সী। এত খুন-খারাবি, লুঠপাট-রক্তের স্রোতে ভাসছে মুণ্ডহীন শরীর-শিশুদেরও দুঠ্যাং ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে-উপর্যুপরি ধর্ষিতা মেয়েটির মুখের উপর ভনভন করে মাছি উড়ছে-আমি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, চারদিকে এত ঠাণ্ডা গোস্ত, ইয়া আল্লা আমি বেঁচে আছি তো?
