ন কিসি কি আঁখ কা নূর হু, ন কিসি কে দিল কা করার হুঁ
যো কিসি কে কাম ন আ সকে, ম্যায় উয়ো এক মুশ্ত-এ-গুবার-হুঁ।
কারো চোখের আলো নই, কারও হৃদয়ের শান্তিও না, যে কোনও কাজেই এলনা, আমি সেই একমুঠো ধুলো।
মেরা রঙ্গরূপ বিগড় গয়া, মেরা য়ার মুক্সে বিছর গয়া
যো চম খিজা সে উগড় গয়া, ম্যায় উসিকি ফসল-এ-বহার-হুঁ।
ঝরে গেছে আমার রং রূপ, ছেড়ে গেছে বন্ধু, যা হেমন্তে শুকিয়ে গেছে, আমি সেই বাগানের ফসল।
ম্যয় নহীঁ হু নগ্মা-এ-জাঁফজা, মুঝে শুনকে কোই কারগা কেয়া
ম্যায় বড়ে বরোগ কি হুঁ সদা, ম্যায় বড়ে দুখী কি পুকার হুঁ।
আমি তো প্রাণের সঙ্গিত নই, আমাকে শুনে আর কি হবে, আমি তো বিচ্ছিন্ন এক বিলাপ, বড় দুঃখের এক আর্তনাদ।
মান্টোভাই, ইংরেজরা অধিকারের পর শাহজাহানাবাদকে একটা মৃতপ্রায় পশুর আর্তনাদের মতোই মনে হয়েছিল আমার। যেদিন ওরা শহর দখল করল সেদিনই ব্রিটিশ বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল উইলসন দেওয়ান-ই-খাসে নৈশভোজের ব্যবস্থা করল। এক রাতেই দেওয়ান-ই খাসের ইজ্জত ধুলোয় লুটিয়ে গেল। এখনও ভাবলে, জালে আটকা পড়া এক জন্তুর মতো। আমার ভেতরে রাগ ফুঁসে উঠতে থাকে। সব বলব ভাইজানেরা, সব- কীভাবে শাহজাহানাবাদ উজাড় হয়ে গেল। দিল্লিতে পরে থাকা আমরা কিছু মানুষ দোজখের আগুনের ভেতর দিয়ে দিন গুজরান করতে লাগলুম। এই দিনগুলোতেই মির্জা ইউসুফ আমাদের ছেড়ে চলে গেল। মান্টোভাই। আমার এক ভাইয়ের কথা তো আগেই বলেছি; প্রায় তিরিশ বছর ইউসুফ উন্মাদের জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু কারও কোন অসুবিধে কখনও করে নি; নিজের মনে চুপচাপ বসে বিড়বিড় করত, কখনও কখনও কয়েদিনের জন্য হারিয়ে যেত, আবার ফিরে আসত। ব্রিটিশরা। দিল্লি দখলের পর অত্যাচার আর মৃত্যুর ভয়ে অনেকেই তো পালাচ্ছিল, ইউসুফের বিবি মেয়েরাও ওকে একা ফেলে চলে গেল। মান্টোভাই, দস্তম্ভ-তে ইউসুফ মিঞার মৃত্যুর যে কারণ আমি লিখেছিলাম, তা মিথ্যে। আসলে দস্তম্ভ তো আমি লিখেছিলাম ইংরেজদের কাছে পেশ করার জন্য, যাতে এই কিতাব পড়ে ওরা আমাকে খেতাব ও খিলাত দেন, আমার। পেনশনের সুরাহা করেন। সচেতনভাবে দস্তম্ভ-তে আমি এমন কিছু লিখতে চাইনি, যাতে ইংরেজরা আমাকে বিদ্রোহীদের পক্ষের লোক হিসাবে সন্দেহ করতে পারে। তবু কী জানেন, লেখা একসময় লেখকের হাতের বাইরে চলে যায়; লেখা নিজের জীবনের ধর্মেই সত্যের অনেক হালহদিশ তার ভিতর লুকিয়ে রাখে; তাই ব্রিটিশ আমাদের কোন নরকে নিয়ে গেছে, তার ছবিও আপনি দস্তম্ভ-র মধ্যে পাবেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যই হিন্দুস্থানের মুক্তির দূত, হ্যাঁ কথা আমি বারবার দস্তষু-তে লিখেছি, কিন্তু বিদ্রোহ শুরুর পর থেকে পনেরো মাসে শাহজাহানাবাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া, আমাদের পোকামাকড়ের মতো বেঁচে থাকার ছবিটাও সেখানে আঁকা আছে।
দস্তম্বু-তে আমি লিখেছিলুম, পাঁচদিন প্রবল জ্বরে ভুগে মির্জা ইউসুফ মারা গেছে। তার বাড়ির চৌকিদার এসে আমাকে খবরটা দিয়েছিল। কিন্তু ইউসুফ মারা গিয়েছিল ব্রিটিশের গুলিতেই। তখন চারদিকে সবসময় গোলাগুলি চলছে। তারই আওয়াজে উত্তেজিত হয়ে ইউসুফ রাস্তায় বেরিয়ে গিয়েছিল; তারপর ব্রিটিশের গুলিতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছিল। মান্টোভাই, আমি জানি, খোদা কখনও আমার এই গুনাহ্ ক্ষমা করবেন না। নিজের গায়ের চামড়া বাঁচাতে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর মিথ্যে খতিয়ান আমি রেখে গেছি আমার লেখায়। দোজখ থেকে আমার কখনও মুক্তি নেই। এবার আমি তার মৃতদেহ নিয়ে কি করি? শাহজাহানাবাদের তখন যা অবস্থা, কফনের একটুকরো কাপড় কোথায় পাব জানি না। শবদেহ পরিস্কার করবে কে, কোথায় পাব কবর খননকারী, ইট-চুনও বা কোথা থেকে আসবে? কোন কবস্থানে শুইয়ে দিয়ে আসব? হিন্দুরা অন্তত যমুনার তীরে গিয়ে মৃতদেহ পুড়িয়ে দিয়ে আসতে পারত। কিন্তু আমরা মুসলমানরা কী করব? রাস্তায় সবময় গুলিগোলা চলছে, ইউসুফকে কবরস্থানে নিয়ে যাবই বা কীভাবে? কয়েকজন প্রতিবেশী পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। ছিল কাল্লু আর আমার বাড়ির আরেক নোকর। ওরাই শবদেহ গোসল করাল, কয়েকটুকরো কাপড় দিয়ে জড়িয়ে ইউসুফদের বাড়ির কাছেই মসজিদের জমিতে গর্ত খুঁড়ে ওকে কবর দিল। রক্তের শেষ সম্পর্কটুকুও হারিয়ে গেল, মান্টোভাই।
সে তো হারিয়ে যাওয়ারই সময়। কত লোক পালিয়ে গেছে, কত লোককে শহর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আমরা যারা রয়ে গিয়েছিলুম, তারা ভয় আর আশার কারাগারে বন্দি। যারা চলে গেছে আর যারা রয়ে গেছে, কারও মনের শান্তির জন্যই কোনও মলম তখন ছিলএম। চারিদিকে তাকিয়ে মনে হত, সবার মুখেই বিবর্ণ মুখোশ পরিয়ে দিয়ে গিয়েছে মৃত্যু। চাঁদনী চক যেন মৃত্যুর এক উপত্যকা। ব্রিটিশরা যাকে হাতের কাছে পাচ্ছে, গাছের ডাল থেকে ঝুলিয়ে দিচ্ছে। চারদিকে গুপ্তচররা ঘুরে বেড়াচ্ছে। হয়তো আপনার সঙ্গে আমার কোনও কারনে শত্রুতা ছিল, এই সুযোগে আমি আপনাকে বিদ্রোহীদের দলের লোক বলে ব্রিটিশের হাতে তুলে দিচ্ছি।
মাঝে মাঝে ভাবি আমিও কি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি? করেছি ভাইজানেরা, আজ সে-কথা কবুল করতেই হবে। দস্তম্ভ ফারসি গদ্যের যত উজ্জ্বল নিদর্শনই হোক না কেন, তা একই সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতারও দলিল। একটা দুঃসময়ের ছবি আমি এঁকেছিলুম, কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে বিদেশী সাম্রাজ্যের কাছে ছবিটাকে বেচেও দিয়েছি।
