তাই ঘরের কোন বেছে নিয়ে আমি লিখতে বসে গেলুম, মান্টোভাই। এইরকম সময়ে একজন কবি কী আর করতে পারে? কয়েক শতাব্দীর সাম্রাজ্য যখন একটা পচাগলা মৃতদেহ, আর। সভ্যতার দূত হিসাবে যারা এসেছে, তাদের কোমরবন্ধে লুকনো ছুরিও যখন দেখতে পাচ্ছি, তখন অক্ষরের সামনে বসে শবসাধনা ছাড়া আমি আর কী করতে পারতাম? আমি দস্তম্বু লিখতে বসে গেলুম। চারপাশে যা দেখছি, যা শুনছি, যেভাবে জীবন কাটছে, সেই কথাগুলোই ফারসি গদ্যে লিখে ফেলতে হবে। সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের নাম আমি দিয়েছিলুম দস্তম্বু-ফুলের তোড়া-ভেবেছিলুম, ও যে রক্তাক্ত ফুলের তোড়া, তা কেউ না কেউ বুঝতে পারবে, কিন্তু পরে বুঝেছিলুম, ইঙ্গিতটুকু কারও মাথাতেই ঢোকেনি। সেজন্য নিজের তারিফও করেছিলুম। মিঞা, এত দিনে এসে তা হলে তুমি ঠারেঠোরে কথা বলার আদবকায়দা শিখেছ। ওটুকু তো শিখতেই হবে, মান্টোভাই। নইলে বিদ্রোহীদের বা গোরাদের গুলি আমার বুকে এসে বিধত।
বাদশাহের দরবারে আমাকে যেতেই হত। কবিতা সংশোধনের কাজ ছাড়াও আমাকে তো বোঝাতে হবে, আমি তাঁদের সঙ্গেই আছি। বিদ্রোহীদের সহায়তায় তার চারমাসের রাজত্বে জাঁহাপনা যে মুদ্রা বাজারে ছাড়লেন, তার গায়ে লেখা শেরটিও আমি লিখে দিয়েছিলুম :
বর জরি আফতাব ও নুকরা-এ-মাহ্
সিক্কা জদ দর জাঁহা বাহাদুর শাহ্
বিদ্রোহীরা জাঁহাপনাকে হিন্দুস্থানের সম্রাট ঘোষণার পর আমি তার উদ্দেশ্যে একটা কসীদাও লিখেছিলুম। জাঁহাপনা একদিন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, উস্তাদজি, কী দেখছেন বলুন তো?
-জাঁহাপনা, আবার আপনার দিন ফিরে এসেছে।
-না। প্রদীপ নেভার আগের শিখা আপনি দেখেননি?
-জি জাঁহাপনা।
-আমিই প্রদিপের সেই শিখা। বাদশাহ না বললেও আমি তা জানতুম। আমি তাঁকে সেদিন একটা সের শুনিয়েছিলুম :
হম-নে বহশৎকদহ্-এ বজম্-এ জহাঁ -মেঁ জুঁ শমা
শোলহ্-এ ই-কো অপনা সর ও সামাঁ সমঝাঁ।
(দুনিয়ার এই ভয়ানক উজাড় মজলিশে প্রদীপের মতো আমি
প্রেমের শিখাকেই আমার সর্বস্ব জ্ঞান করলাম।)
-কেয়া বাৎ, কেয়া বাৎ, উস্তাদজি।
মাঝে মাঝে দরবারে গিয়ে নিজের আনুগত্য প্রমাণ করা ছাড়া নিজের কুঠুরিতে বসে আমি দস্তম্ভ লেখার কাজই চালিয়ে যাচ্ছিলুম। আমার মনে হয়েছিল, আমি কার পক্ষে বা বিপক্ষে, এটা জানানোর চেয়েও, এই বয়ানটা রেখে যাওয়া জরুরি। যথাসম্ভব নিরপেক্ষ ভাবে আমাকে দুর্দশার দিনলিপি লিখে যেতে হবে। আমি জানি, নিরপেক্ষ ভাবে কিছুই করা সম্ভব হয় না। তবু ঘটনার বিবরণ আমি লিখে রাখতে চেয়েছিলুম।
মান্টোভাই, আপনি ক্ষুব্ধ হবেন জানি, তবু ওই ছোটোলোক সিপাহিদের রাজত্ব আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার তজ্জীব তো আলাদা। আমি না খেয়ে মরে গেলেও কারও তসবিরমহল পুড়িয়ে দিয়ে আসতে পারব না। তসবির তো আমার চোখের-মনের খিদে মিটিয়েছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি, কেল্লার এক একটি সৌন্দর্য সিপাইরা কীভাবে ধ্বংস করেছে। বিদ্রোহ জিইয়ে রাখার জন্য ওদের তখন দরকার রুটি আর পয়সা। ওরা কত অমূল্য সম্পদ বেঁচে দিয়েছিল। বিদ্রোহের নাম যদি এই বর্বরতা হয়, আমি তাঁকে সমর্থণ করি না। তাই আমি। মনে-প্রাণে চেয়েছিলুম ব্রিটিশ যেন শাহজাহানাবাদ অধিকার করতে পারে। তাতে অন্তত শান্তি ফিরে আসবে।
ধীরে বন্ধু, আপনি অবধ অধিকারের কথা তুলতে চাইছেন তো, মান্টোভাই? আমি মনে-প্রাণে তাঁকে ঘৃণা করি। তবু একফোঁটা আমার বিশ্বাস ছিল, ব্রিটিশ হয়তো এভাবে সব সৌন্দর্যকে শেষ করে দেবে না। ভাবুন মান্টোভাই, সিপাহিরা সব ব্যারাকে থাকে-সে তো জেলখানার মতোই জায়গা-খাওয়া-ঘুম-যৌনখিদের বাইরে আর কিছুই শেষ পর্যন্ত তাদের থাকে না। যে – তজ্জীব নিয়ে ওরা ব্যারাকে আসে, যুদ্ধের প্রস্তুতির নিষ্ঠুরতায় তা-ও একদিন হারিয়ে যায়। সিপাইরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে পারে-নগরের পর নগর ধ্বংস করতে পারে-স্বাধীনতা কখনও আনতে পারে না, মান্টোভাই। স্বাধীনতা আনতে পারে একমাত্র পথের মানুষ-তাদের হাতের অস্ত্র বলতে পাথর, গাছের ডাল, বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া দীর্ঘ-দীর্ঘ শতাব্দীর লড়াইয়ের স্মৃতি-নিজের ঘর, নিজের নদী, নিজের জঙ্গল বাঁচানোর লড়াই-স্বাধীনতা তো শুধু মানুষের জন্য নয় মান্টোভাই-ঝরনার স্বাধীনতা, গাছের স্বাধীনতা, পাখির স্বাধীনতা, মাছের স্বাধীনতা-ব্যারাকের সৈনিক কি সেই স্বাধীনতার কথা ভাবতে পারে? ওদের তো শুধু যুদ্ধই শেখানো হয়েছে স্বাধীনতার লড়াই তো বন্দুক-কামান নিয়ে যুদ্ধের চেয়ে বেশী কিছু।
আমি আজ আপনাদের এতসব কথা বলতে পারছি, কিন্তু তখন তো মুখে কুলুপ এঁটে রাখার সময়। তাই সস্তম্ভ লিখে যাওয়া ছাড়া আর কোনও কাজ ছিল না আমার। এদিকে বিদ্রোহী শহর দখল করার পর সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পেনশনও বন্ধ হয়ে গেছে। কী করব, বাড়ির এতগুলো লোকের পেটের খাবার কোথা থেকে জোটাব জানি না। ভাবতে ভাবতে আমার শুধু হাসি পেত।
জুজ নাম নহীঁ সুরৎ আলম্ মুঝে মনজুর
জুজ ওয়াহম্ নহী, হস্তী-এ আশীয়া মেরে আগে।
(পৃথিবী রয়েছে শুধু নামেই,
সবই কল্পনা, সবই অস্তিত্বহীন এখানে।)
দিনগুলি মলিন থেকে মলিনতর হচ্ছিল। আর আমি ভাবছিলুম, কবে ইংরেজরা শাহজাহানাবাদের দখল নেবে, কবে আমার অবস্থা স্বাভাবিক হবে। বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয় নি, সে তো জানেনই মান্টোভাই। মে মাসের এক সোমবার সিপাইরা শাহজাহানাবাদ তাদের হাতের মুঠোয় নিয়েছিল, আর ওই বছরই ১৪ সেপ্টেম্বর, আরেক সোমবার, ইংরেজরা শহর দখল করল। লড়াই চলেছিল ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সেদিনই কেল্লা দখল করল ব্রিটিশ। জাঁহাপনা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলেন সম্রাট হুমায়ুনের কবরে। মান্টোভাই, এ যেন গজলের একটা শের। মরণোন্মুখ সম্রাট শেষ পর্যন্ত আশ্রয় খুঁজে পেলেন কবরে। তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে, এই আশ্বাস পেয়ে ক্যাপ্টেন হত্সনের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। তাঁর দুই সন্তান মির্জা মোগল আর মির্জা খিজর সুলতানকে খুনি দরওয়াজার কাছে নিজে হাতে গুলি করে মারলেন। ক্যাপ্টেন হন। জাঁহাপনা তাদের দিকে ফিরেও তাকাননি, তখন শুধু নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত। শুনেছিলাম, মির্জা মোগল নাকি মরার আগে বলেছিল, হিন্দু-মুসলমান ভাইয়েরা, মনে রেখো, তোমরা এক হলে অনেক কিছু পেতে পারো। মান্টোভাই সেসব দিনে কী ভয়ানক দৃশ্য দেখেছি। একুশজন শাহজাদাকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে মেরে চাঁদনি চকে ফেলে রাখা হয়েছে, তাদের নগ্ন শরীরে সামান্য এক টুকরো কাপড়। এই কি মুঘল বংশধরদের প্রাপ্য ছিল? কেল্লার একটা ছোট্ট, অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে জাঁহাপনা আর বেগম জিনত মহলকে। তিনি যেন চিড়িয়াখানার এক জন্তু, গোরারা তখন জাঁহাপনাকে এভাবেই দেখতে যেত। একটা চারপাইয়ের ওপর ময়লা পোশাকে শুয়ে থাকতেন আর বারবার বলতেন বা খুশ হু, বরা খুশ হু। কারও কারও কাছে শুনেছি, দিন-রাত চুপচাপ মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতেন তিনি, মাঝে মাঝে ঘুমঘোর থেকে জেগে উঠে নিজের লেখা গজল আবৃত্তি করতেন। তারপর একুশ দিন ধরে চলল তাঁর বিচার। শুনেছি, বিচারপর্ব চলার সময়ও তিনি প্রায়শই ঘুমিয়ে থাকতেন। যে কুঠুরিতে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল তারই দেওয়ালে খড়ি দিয়ে তিনি লিখে রেখেছিলেন জীবনের শেষ গজল :
