-চাপাটির ভেতরে কেউ কোনও খবর পাঠাচ্ছে নাকি?
-না। চাপাটির ভেতরে তো কিছু নেই। আবার শুনলাম কোথাও কোথাও নাকি খাসির গোস্ত বিলি করা হচ্ছে।
-এ তো জাদুকরের খেলা, মিঞা।
দিনে দিনে সবকিছু কেমন রহস্যময় হয়ে উঠতে লাগল, মান্টোভাই। ফিসফিস করে কথা বেড়ে যেতে লাগল। সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হত, কেউ যেন কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নানা জায়গা থেকে সিপাইদের বিদ্রোহের খবর আসতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশ সিপাইরা নাকি নানারকম সুযোগসুবিধা পায় আর এ-দেশের সিপাইদের সঙ্গে ক্রিতদাসের মতো ব্যবহার করা হয়। এদিকে পলাশির যুদ্ধের একশো বছর হতে আর কয়েক মাস বাকি। শুনলুম, ওয়াহাবিরা নাকি ঘোষণা করেছে ২৩ জুন হিন্দুস্থানের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতেই হবে। শাহজাহানাবাদ এমনিতে শান্ত ছিল, কিন্তু চারদিক থেকে ভেসে আসছিল যুদ্ধ পরিস্থিতির হাওয়া।
১১ মে। দিনটা যেন ওঁৎ পেতে আমাদেরে জন্য অপেক্ষা করছিল ভাইজানেরা। একেবারে চিতা বাঘের মতো এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুপুরে কেল্লার দরজা ও দেওয়াল কেঁপে উঠল আর তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল শহরের চার কোণে। সে ছিল ভূমিকম্পের চেয়েও ভারী, ভাইজানেরা। মেরঠ থেকে বিদ্রোহী সিপাইরা এসে অধিকার করল শাহজাহানাবাদ। দরিয়াগঞ্জের কাছে রাজঘাট দরজা দিয়ে ওরা শহরে ঢুকেছিল। শহরের রক্ষী –সৈনিকরাও ওদের সঙ্গে হাত মেলাল। শুরু হল হত্যার বীভৎস উৎসব। রক্তে-রক্তে মুছে গেল শাহজাহানাবাদের চেনা মানচিত্র। ব্রিটিশ আর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান দেখলেই হত্যা করো, তাদের বাড়িঘর লুঠপাট করে জ্বালিয়ে দাও; কিন্তু যে কোনও হত্যাকাণ্ডে শুধু তো শত্রুপক্ষই মরে না, ভাইজানেরা, উলুখাগড়ারাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, শাহজাহানাবাদের কত সাধারণ মানুষও যে হারিয়ে গেল, তার কোনও হিসাব নেই।
বিদ্রোহী সিপাইদের নেতা মহম্মদ বখত খান ছিল বেরিলি-র পদাতিক বাহিনীর এক সুবেদার। তার নেতৃত্বে জাঁহাপনা বাহাদুর শাহকে একরকম বন্দিই করে ফেলা হয়েছিল। শুধু সিপাইরা যা করবে সে-ব্যাপারে তাঁকে সম্মতি দিতে হবে। বখত খানের একটাই কথা, আপনিই আবার। হিন্দুস্থানের সম্রাট হবেন জাঁহাপনা। শুধু আমাদের কথা শুনে চলতে হবে। শাহজাদা মির্জা মোগলকেও ওরা তখন পাশে পেয়ে গিয়েছে। সব কিছুতে হ্যাঁ বলা ছাড়া জাঁহাপনার আর কিছুই তখন করার ছিল না। হয়তো তাঁরও লোভ হয়েছিল, এই হাঙ্গাম-হুজ্জোতের মধ্য দিয়ে যদি আবার পুরনো তক্ত ফিরে পাওয়া যায়। নিজের তো কোনও মুরোদ ছিল না। কীই বা করতে পারতেন তিনি? তখন তাঁর বিরাশি বছর বয়স, সারাক্ষণ তো শুয়ে-বসে শুধু ঝিমোন।
জাঁহাপনাকে সামনে রেখে বড় ছেলে মির্জা মোগলই হয়ে উঠল সর্বেসর্বা। শাহজাদা জওয়ান বখত্ হল উজির। কোতোয়ালকে আবার কাজে বহাল করা হল। আর মহম্মদ বখত্ খানের খেতাব কী হল জানেন? সাহের-ই-আলম বাহাদুর। মুঘল দরবারে আগে এমন কোনও পদই ছিল না। জাঁহাপনা যাঁকে সবথেকে বিশ্বাস করতেন, সেই হাকিম আসানুল্লা খানকে ব্রিটিশের গুপ্তচর হিসাবে চিহ্নিত করা হল। একদিন তাঁকে হত্যা করার জন্য তাঁর হাভেলিতে লোকজন চড়াও হল, কিন্তু তখন তিনি কেল্লায় বাদশাহর সঙ্গে; হাভেলিতে না পেয়ে উন্মত্তরা কেল্লায় এসে হাজির হল, বাদশাহ তাঁকে নিজে জড়িয়ে ধরে বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু হাকিমসাবের বাড়িতে লুঠপাট করা হল, চিনা ছবির মতো অমন সুন্দর মহল জ্বালিয়ে দেওয়া হল।
মান্টোভাই, জাঁহাপনা জাফর যেমনই হোন, তার তো তজ্জীব ছিল-জাঁহাপনা বাবর থেকে সেই তজ্জীব রচনা শুরু হয়েছিল আর তা ফুলে ফুলে ভরে উঠেছিল জাঁহাপনা আকবরের সময়-শুধু ফতেপুর সিক্রির কথা ভাবলে ওই তজ্জীবের সৌন্দর্য আপনি বুঝতে পারবেন-মিঞা তানসেনের গান তো সেই সংস্কৃতির শিখর-জাঁহাপনা জাহাঙ্গীরের তসবিরখানায় এই তৰ্জীবের কত আশ্চর্য ছবিই যে দেখা যেত-মান্টোভাই, এই অসভ্য, বর্বর, সিপাইদের মেনে নেওয়া জাঁহাপনার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেল্লা যেন ওদের কাছে একটা আস্তাবল মাত্র। মির্জা মোগলকে তিনি একবার বলেছিলেন, এদের নিয়ে তুমি এই সাম্রাজ্য রক্ষা করবে মির্জা? ঘোড়ায় চড়ে ওরা যেখানে – সেখানে ঢুকে পড়ে; ব্রিটিশ অফিসাররা কখনও এমন করতেন না, দিওয়ান-ই-আমের দরজার সামনে ঘোড়া থেকে নেমে খালি পায়ে ঢুকতেন।
-সাম্রাজ্য রাখতে হলে ওদের দরকার জাঁহাপনা।
-এই বেত্তমিজদের? আমি কিছু খবর রাখি না ভাব? বাজারের পর বাজার ওরা লুঠ করছে। ইংরেজরা লুকিয়ে আছে ধুয়ো তুলে যে-কোনও শরিফ আদমির বাড়িতে ঢুকে পড়ছে, আর লুঠতরাজ চালাচ্ছে।
-তাতে আপনার কী জাঁহাপনা? আপনি সম্রাট থাকতে চান না? ওরা তো আপনাকেই সম্রাট বানিয়েছে।
-ছোটলোকদের সম্রাট।
-তবু সম্রাট তো।
হ্যাঁ, মান্টোভাই, আসলে সে এক ওলোটপালটের সময় এসেছিল। আমিও কিছু বুঝতে পারছিলুম না। এ এমন এক অন্ধকার সময়, যখন আপনাকে কোনও একটা পক্ষ বেছে নিতে হবে : হয় আপনি জাঁহাপনার দিকে, না হলে ব্রিটিশের পক্ষে থাকবেন। আমার মতো মানুষ কি অত সহজে পক্ষ বেছে নিতে পারে? আমি জানতুম, কবি হিসেবে আমার কারুর কাছেই মূল্য নেই; ওরা শুধু প্রয়োজন মতো আমাকে ব্যবহার করবে। আমি তো উলুখাগড়া ছাড়া আর কিছু নই। আমাকে দুদিকই সামলে চলতে হবে। বাদশার কোপ যেন আমার ওপর না-পড়ে; আবার গোরারাও যাতে আমাকে সন্দেহ করতে না-পারে।
