-আমার জন্য? তার চেয়ে বললো, তোমার জন্য আমি কী করতে পারি? তুমিই তো আমাকে ডেকে আনলে।
সুলতানা তার কথায় অবাক হয়ে যায়।
শঙ্কর বলে চলে, বুঝতে পেরেছি। এবার আমার কথা শোনো। তুমি যা ভেবেছ, তা ঠিক নয়। আমি সেই বান্দা নই যে, এ-বাড়িতে ঢুকে কিছু টাকা গচ্চা দিয়ে বেরিয়ে যাব। আমারও মজুরি আছে, বুঝলে? ডাক্তার ডাকলে ফি দাও না? আমাকে ডাকলে আমারও মজুরি দিতে হবে।
শঙ্করের কথা শুনে হতচকিত হয়েও সুলতানা হাসি চাপতে পারেনি। সে জিজ্ঞেস করেছিল, তা, তোমার কী করা হয়?
-তোমরা যা করো। শঙ্কর বলে।
-সেটা কী?
-তুমি কী করো?
-আমি…আমি…আমি কিছু করি না।
-আমিও কিছু করি না।
-এ কথার কোনও মানে নেই। কিছু তো একটা করো।
-তা হলে তুমিও তো কিছু করো-
-জানি না শুধু সময় কাটাই।
-আমিও।
মাঝে মাঝেই শঙ্কর আসত, সুলতানা একদিন জিজ্ঞেস করে ফেলল, তুমি আমাকে শাদি করবে?
-শাদি? মাথা খারাপ। তোমার আমার দুজনেরই কখনও বিয়ে হবে না, সুলতানা। ও-সব বস্তাপচা ব্যাপার আমাদের জন্য নয়। আর কখনও এইরকম বাজে কথা বোলো না। তুমি একটা মেয়ে। আমাকে কিছুক্ষণ ভালো রাখার জন্য কিছু বলো। জীবনটা তো শুধু কেনা-বেচার জায়গা নয়।
-সোজা কথা বলো তো। কী চাও আমার কাছে?
-অন্যরা যা চায়। শঙ্কর ভাবলেশহীন গলায় বলল।
-তাহলে অন্যদের থেকে তুমি আলাদা কোথায়?
-শোনো সুলতানা, তোমার আমার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। কিন্তু ওই অন্যদের সঙ্গে আমার আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
হ্যাঁ, মির্জাসাব, আমি মনে-মনে জানতাম, এমনকি জোর গলায় বলেওছি, আমার চারপাশের অন্যদের চেয়ে আমি আলাদা। কিন্তু সুলতানাদের চেয়ে আমি কোথাও আলাদা নই। কোনও না কোনওভাবে এই দুনিয়ার বাজারে আমি নিজেকে বেচতেই এসেছিলাম। যারা আমাকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করেছে, তারাও নিজেদের বেচেছে, কিন্তু বেশ্যাবৃত্তিটা আড়াল করে নিজেদের মহত্ত্বের বেলুন উড়িয়েছে। আমি আপাদমস্তক একটা বেশ্যা, আমার ঠিকানা দুনিয়ার সব লালবাতির এলাকা।
৩৯. অবধ অধিকার করে ব্রিটিশ
আহোঁকে শোলে জিস জা উঠতে থে মীর সে শব্
বাঁ জাকে সুবহ দেখা মুশত্-এ গুবার পায়া।
(যে জায়গাটিতে মীরের হাহাকারের শিখা লেলিহান ছিল কাল রাতে
আজ ভোরবেলায় সেখানে গিয়ে শুধু একমুঠো ছাই দেখতে পেলাম।)
অবধ অধিকার করে ব্রিটিশ যখন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে কলকাতায় নির্বাসনে পাঠাল, রাগে-ঘৃণায় আমি দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিলুম, মান্টোভাই। অবধের কাছে তো আমি বাইরের মানুষ। তবু মনে হয়েছিল, যেন আমাকেই উৎখাত করা হয়েছে। যে-ব্রিটিশকে একদিন নতুন সভ্যতার দূত মনে হয়েছিল, অবধের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আমি তাদের দাঁত-নখ দেখতে পেলুম। শুধু রাগ আর ঘৃণা নয়, হতাশাও আমাকে গ্রাস করেছিল। এক-একটা রাজ্যকে ধ্বংস করে, নবাবদের নির্বাসনে পাঠিয়ে, ব্রিটিশ কি তা হলে এভাবেই আমাদের তজ্জীবকে গোরে পাঠাবে? বিচারবোধ যে-মানুষের আছে, তার পক্ষে কখনও এই ধ্বংস প্রবৃত্তি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, ভাইজানেরা। অবধের একজনকে চিঠি লিখে আমি এ-কথা জানিয়েও ছিলুম। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহর নির্বাসন আমি মেনে নিতে পারি নি। মান্টোভাই, আমার মনে হয়েছিল, ওরা এবার খুব তাড়াতাড়ি আমাদের গ্রাস করবে, গোটা হিন্দুস্থানের মানুষকেই-হিন্দু বা মুসলমান যেই হোক-ওরা নির্বাসনে পাঠাবে; মোহাজির হয়ে এবার পথে পথে ঘুরতে হবে আমাদের।
তখনই আরেকরকম কথাও শোনা যাচ্ছিল। ব্রিটিশরা তো ততদিনে জানিয়েই দিয়েছে, কেল্লা থেকে সরিয়ে মুঘল বংশধরদের কুতুব শাহী-র কাছে কোনও মহলে নিয়ে যাওয়া হবে আর। জাঁহাপনা জাফরের পর বাদশা খেতাব কেউ পাবেন না। ব্রিটিশ যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা-ই সবাইকে মেনে নিতে হবে? শাহজাহানাবাদের অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, পারস্যের শাহেনশা বা রুশের সম্রাট জার এসে এই ফিরিঙ্গিদের তাড়িয়ে দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরব আবার ফিরিয়ে দেবেন। গদর শুরু হওয়ার দুমাস আগে জামা মসজিদের দেওয়ালে কারা যেন একটা কাগজ সেঁটে দিয়ে গিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, পারস্যের শাহ তাঁর নিপীড়িত মুসলমান ভাইদের বাঁচাতে খুব তাড়াতাড়ি এ-দেশে আসবেন। কেল্লার পিরজাদা হাসান আক্সারিও গণনা করে বলেছিলেন, এমন কিছু ঘটতে চলেছে যাতে মুঘল সাম্রাজ্যের ইমান ও নিশান আবার। আকাশে উড়বে। কিন্তু তা যে গদর-সিপাইদের বিদ্রোহ-তা আমরা বুঝতে পারিনি।
তবে হাওয়ায় কত যে গুজব ভাসছিল, ভাইজানেরা। ওইসব গুজব শুনে শুনে মনে হত, আমরা যেন পরিস্থানে বেঁচে আছি। কথাগুলো সবাই এর-ওর কানে ফিসফিস করে বলত। তো একদিন চাঁদনী চকে গুলাম নবির পানের দোকানে পাহাড়গঞ্জের থানেদার মইনুদ্দিন হাসান খানের সঙ্গে দেখা। আমি হেসে জিজ্ঞেস করলুম, চারদিকে কী সব শুনছি, মিঞা?
-আরে মির্জাসাব, আমার তো দিমাক খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
-এসব গাপবাজি তা হলে সত্যি?
-কী করে বলি, বলুন! তবে তলে তলে কিছু একটা চলছেই, মির্জাসাব।
-চাপাটির ব্যাপারটা কী?
-ওসব তো আমিও শুনেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করিনি, মির্জাসাব। কাল ভোরে হঠাৎ ইন্দ্রপুর গাঁওয়ের চৌকিদার এসে আমাকে একটা চাপাটি দেখাল। সরাই ফারুক খানের চৌকিদার নাকি তাকে চাপাটিটা দিয়েছে। ওইরকম পাঁচটা চাপাটি বানিয়ে কাছাকাছি পাঁচটা গাঁওয়ে পাঠিয়ে দিতে বলেছে। সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ গাঁওয়ে চৌকিদারকেও জানিয়ে দিতে হবে, তারো যেন পাঁচটা করে চাপাটি বানিয়ে পরের গাঁওগুলিতে পাঠিয়ে দেয়। এ যে কী ব্যাপার, কিছুই বুঝতে পারছি না, মির্জাসাব।
