একদিন হঠাৎই নেস্তির মনে হল, আচ্ছা, আমিই তো গাড়ি চালাতে পারি। আবুর সঙ্গে যখন সে বেড়াতে যেত, তখন মাঝে মাঝে সেও গাড়ি চালিয়েছে। পথ ঘাটও সে ভালই চেনে। তাহলে অসুবিধা কোথায়? মেয়েরা যদি মাটি কাটতে পারে, ভাড়া বইতে পারে, ঘোড়ার গাড়িই বা চালাতে পারবে না কেন? বেশ কয়েকদিন ভাবার পর নেস্তি ঠিক করল, সে নিজেই গাড়ি চালাবে।
নেস্তিকে গাড়ি নিয়ে আসতে দেখে কোচোয়ানদের চোখ তো কপালে উঠল। অনেকে মজা পেয়ে হাসতে শুরু করল। সবচেয়ে বয়স্ক কোচোয়ান এসে নেস্তিকে বোঝাল, ঘোড়ার গাড়ি চালানো মেয়েদের কাজ নয়। নেস্তি তার কথায় কান দিল না। চিন্নিকে আদর করে, আবুর সঙ্গে মনে – মনে কথা বলে সে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
সারা শহরে হইহই পড়ে গেল। এক খুবসুরত জেনানা ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছে। লোকজন। অপেক্ষা করে থাকে, কখন নেস্তির গাড়ি আসবে। প্রথম দিকে পুরুষ যাত্রীদের গাড়িতে তুলত না সে; তারপর সেই লজ্জাটুকুও চলে গেল। গাড়ি চালিয়ে নেস্তি বেশ ভালই রোজগার করতে লাগল। ওর গাড়ি কখনই দাঁড়িয়ে থাকত না, রাজাসাহেব। পুরুষরা তো ওর গাড়িতে চড়ার জন্য মুখিয়ে আছে। একটা মেয়ের কাঁধ, কোমর, বাহু, স্তন, নিতম্ব কিছু সময়ের জন্য চেখে দেখার পুরুষালি লোভ আপনি নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না রাজাসাহেব। নেস্তি তা বুঝতও। কিন্তু কী করবে সে? সম্মানজনক ভাবে খেয়েপরে থাকতে হবে তো তাকে। গাড়ি চালানোর সময় ও ঠিক করেই নিয়েছিল। সকালে সাতটা থেকে বারোটা, আর দুপুর দুটো থেকে সন্ধে ছটা। নেস্তি এভাবে নিজের মতো করে বেঁচেছিল, রাজাসাহেব।
একদিন মিউনিসিপ্যাল কমিটি থেকে নেস্তিকে ডেকে পাঠিয়ে জানানো হল, ওর গাড়ির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। কেন? মেয়েদের ঘোড়ার গাড়ি চালানোর নিয়ম নেই। নেস্তিও বলল, আমি তো চালাতে পারি, হুজুর। তা হলে অসুবিধা কোথায়?
-আর চালাতে পারবে না।
-কেন হুজুর? মেয়েরা যদি সব কাজ করতে পারে, ঘোড়ার গাড়ি চালাতে পারবে না? এই ঘোড়া আর গাড়ি আমার শহরের। আমি কেন চালাতে পারব না? গাড়ি না-চালালে আমি খাবার কোথা থেকে পাব হুজুর?
মিউনিসিপ্যাল অফিসার কী বললেন জানেন?-বাজারে গিয়ে জায়গা খুঁজে নাও। তাতে অনেক রোজগার হবে।
নেস্তির মতো একটা মেয়ে এর কী উত্তর দেবে বলুন তো? ঘোড়া আর গাড়ি বেঁচে দিতে হল ওকে। আবুর কবরের সামনে গিয়ে ও বসেছিল। রাজাসাহেব, আমি হলফ করে বলছি, ওর চোখে তখন জল ছিল না, মরুভূমির মতোই ধূ-ধূ করছিল দুই চোখ। আবুর কবরে মাথা রেখে নেস্তি বলেছিল, ওরা আমাকে বাঁচতে দিল না। আমাকে ক্ষমা করো।
পরদিন নেস্তি মাংসের বাজারে দরখাস্ত করল। হ্যাঁ, এখন থেকে প্রতিরাতে ও নিজের মাংস বিক্রি করবে। রাজাসাহেব, নেস্তির এই গল্পটাকে আমরা ইতিহাস থেকে মুছে দেব? তা হলে সব সাফসুরত থাকবে তো?
না, মির্জাসাব, আমার এই প্রশ্নের উত্তর রাজাসাহেব দেননি। কিই বা উত্তর দিতে পারতেন? তিনি কি কখনও সুলতানার মতো মেয়েকে দেখেছেন? কালি শালোয়ার গল্পে আমি সুলতানার কথা লিখেছিলাম, ভাইজানেরা। একটা বেশ্যা, মহরমে পরবে বলে শুধু একটা কালো শালোয়ার পেতে চায়, এই সামান্য আকাঙ্খায় অশ্লীলতা কোথায় আমাকে বলতে পারেন? কিন্তু ওরা সমাজের মাতব্বররা-খুঁজে খুঁজে ঠিক বার করে; ওরা তো সম্পূর্ণ মানুষকে দেখতে পায় না; কয়েকটা শব্দ, কিছু মুহূর্তকে কাটাছেড়া করে; এরা কারা জানেন, মির্জাসাব? পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের পর বসে থাকে সিংহাসনে-কবি নয়-অজর, অক্ষর অধ্যাপক, দাঁত নেই-চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি; বেতন হাজার টাকা মাসে-আর হাজার দেড়েক পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি।
এরা কী করে সুলতানাকে বুঝবে বলুন? বেশ্যাপল্লির সেই ভাঙাচোরা বাড়িটার ব্যালকনিতে ও বিকেল শেষে এসে দাঁড়াত। সুলতানার ব্যালকনি থেকে দেখা যেত রেলইয়ার্ড। রেললাইনের দিকে তাকিয়ে ও নিজের হাতের দিকে তাকাত। ফুলে ওঠা নীল শিরাগুলো একেবারে রেললাইনের মতো মনে হত ওর। রেল ইয়ার্ডের মধ্যে ট্রেনের বগি আর ইঞ্জিনগুলো সবসময় আসছে আর যাচ্ছে; ইঞ্জিনগুলো ধোয়া উগরে সুলতানার সামনের আকাশটাকে কালো করে। দিচ্ছে। অনেক সময় কোনও গাড়িকে একটা লাইনে ঢুকিয়ে দেওয়া হত, গাড়িটা নির্দিষ্ট লাইন ধরে চলতে শুরু করত আর সুলতানার মনে হত, তাকেও ওই গাড়িটার মতো একটা নির্দিষ্ট লাইনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর সে চলছে তো চলছেই। এই চলায় তার কোনও হাত নেই। অন্য কয়েকজন মানুষ সুইচ টিপে টিপে তাকে চালাবে। সে কোনও দিন জানতেও পারবে না। কোথায় সে চলেছে। তারপর একদিন গতি হারিয়ে যেখানে সে থেমে যাবে, সেই। জায়গাটাও তার কাছে অচেনা।
এক অদ্ভুত লকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সুলতানার। তার নাম শঙ্কর। মাঝে মাঝেই তাঁকে দেখা যেত, রাস্তার ও-পারে সুলতানাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। সুলতানার ব্যবসা জমছিল না, সারাদিন একা-একা কাটত। একদিন সে শঙ্করকে হাত নেড়ে ডেকেই ফেলল। শঙ্কর এমনভাবে এসে ঘরে বসল, যেন সে নয়, আসলে সুলতানাই খদ্দের। বেশ মজা লাগছিল সুলতানার। সে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনার জন্য কী করব, বলুন?
