মেয়েটা কোন উত্তর দেয় না। গায়ের চাদর আরও ভালো করে জড়িয়ে নেয়।
আবু জিজ্ঞেস করে, কী ভাবছ জানেমন?
মেয়েটা তবু কোনও কথা বলে না।আবু হঠাৎ গাড়ি থামায়। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পিছনে মেয়েটির পাশে এসে বসে। তার হাত চেপে ধরে বলে, জানেমন, তোমার লাগাম আমার হাতে দাও।
-খুব হয়েছে। মেয়েটা মাথা নীচু করে বলে।
আবু মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটা প্রথমে বাধা দিলেও শান্ত হয়ে আসে। আবু বলতে থাকে, এই গাড়ি আর ঘোড়াকে আমি আমার জানের চেয়েও ভালবাসি। খোদা কসম, তোমার জন্য ওদেরও আমি বেঁচে দিতে পারি। অনেক সোনার গয়না বানিয়ে দেব জানেমন। বলো বলো-আমার সঙ্গে থাকবে? না হলে এখনই-তোমার সামনে-গলার নলি কেটে ফেলব।
মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবু একসময় বিড়বিড় করে বলে, আজ যে কী হয়েছে। আমার! চলো, তোমাকে টেনে নামিয়ে দিয়ে আসি।
-না। তুমি আমাকে ছুঁয়েছ।
-মাফ করো। আমি ভুল করেছি।
-ভুলের কোন ইমান নেই? মেয়েটা ফুঁসে ওঠে।
আবু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের বুকে হাত রেখে বলে, তোমার জন্য জান। দিতে পারি।
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, তা হলে আমার হাত ধরো।
আবু তার হাত চেপে ধরে বলে, আজ থেকে আমি তোমার বান্দা।
ওই মেয়েটির নাম নেস্তি, রাজাসাহেব। নেস্তি এসেছিল গুজরাত থেকে; এক মুচির মেয়ে। বাড়ির লোকদের ছেড়ে নেস্তি আবুর কাছেই থেকে গেল। পরদিন ওদের শাদি হল। না, ঘোড়া বা গাড়ি, কিছুই আবু বিক্রি করে নি, জমানো টাকা দিয়ে নেস্তিকে সিল্কের কুর্তা-পায়জামা, কানের দুল কিনে দিয়েছিল। আবু নেস্তিকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাঝে-মাঝেই বলত, তুম মেরি নবাবজাদি হো।
মাসখানেক পরে পুলিশ হঠাৎ অপহরণের অভিযোগে আবুকে গ্রেফতার করল। নেস্তি সবসময় ওর পাশে ছিল। আদালতের রায়ে দুবছরের জেল হল আবুর। নেস্তি আবুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, বাবা-মার কাছে আমি আর যাব না। তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করব, মিঞা।
-ভাল থেকো। গাড়ি আমি দিনোকে চালাতে দিয়েছি। ওর কাছ থেকে রোজকার টাকা গুনে নিও, বিবিজান।
বাবা-মা অনেক বোঝানো সত্ত্বেও নেস্তি তাদের কাছে ফিরে গেল না, রাজাসাহেব। অচেনা শহরে আবুর ফিরে আসার অপেক্ষায় সে একাই রয়ে গেল। দিনো তাঁকে রোজ সন্ধ্যায় পাঁচ টাকা করে দিয়ে যেত। নেস্তির তাতে ভাল ভাবেই চলে যেত। সপ্তাহে একদিন জেলে কিছুক্ষণের জন্য আবুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হত। আবুর জন্য সে ভাল খাবার, ফল নিয়ে যেত।
আবু একদিন দেখল, নেস্তির কানে দুল নেই।-তোমার কানের দুল কোথায় গেল?
নেস্তি চোখ বড় বড় করে দুই কানে হাত দিয়ে বলল,তাই তো। খেয়ালই করিনি। কোথায় যে পড়ে গেছে।
-আমার জন্য খাবারদাবার আনতে হবে না বিবিজান। আমি ঠিক আছি।
নেস্তি দেখতে পাচ্ছিল, আবুর শরীর দিনে দিনে ভেঙে যাচ্ছে। শেষবার জেলে গিয়ে নেস্তি শক্তসমর্থ আবুর বদলে একটা কঙ্কালকে দেখতে পেল। নেস্তি ভাবল, ওর সঙ্গে বিচ্ছেদের দুঃখে আবু ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আসলে রাজাসাহেব, আবুর ছিল টিবি রোগ। আবুর বাবা, দাদাও টিবিতেই মারা গিয়েছিল। জেলের হাসপাতেলে শুয়ে নেস্তিকে আবু বলেছিল, এভাবে মারা যাব জানলে আমি তোমাকে শাদি করতাম না বিবিজান। আমাকে ক্ষমা করো। চিন্নি আর গাড়িটাকে যত্ন করো। ওরাই তোমাকে দেখবে। চিন্নিকে বলল, আমি ওর কথা কখনও ভুলব না।
নেস্তিকে শূণ্য প্রান্তরে ফেলে রেখে আবু এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু নেস্তি ছিল অন্য ধাতের মেয়ে, রাজাসাহেব। এত বড় বেদনা নিয়েও সে সোজা দাঁড়িয়ে থাকল। সারাদিন একা -একা ঘরে কেটে যায় আবুর কথা ভাবতে ভাবতে। সন্ধেয় দিনো আসে বরাদ্দের টাকা দিতে।
-ভয় পেয়ো না ভাবিজি। আৰু আমার ভাইয়ের মতো ছিল। তোমার জন্য আমি যথাসাধ্য করব। একদিন দিননা বলল।
-খোদা যা করবেন।
-খোদা তো মানুষকে দিয়েই করান ভাবিজি। তুমি এভাবে মুখ কালো করে থেকো না। আমার ভালো লাগে না।
-কী করব দিনোভাই?
-ফির শাদি করো। আৰু ভাইয়ার কথা ভাবতে ভাবতে সারা জীবন কাটিয়ে দেবে নাকি?
-শাদি!
-তুমি যেদিন বলবে, আমি রাজি।
-দিনোভাই!
-কী হল?
নেস্তির ইচ্ছে হয়েছিল, লাথি মেরে দিনোকে ঘর থেকে বার করে দেয়। তা তো পারেনি, শুধু বলেছিল, আমি আর শাদি করব না, দিনোভাই।
সেদিন থেকে দিনোর ব্যবহারও বদলে গেল। পাঁচ টাকার বদলে কোনওদিন চার, কোনওদিন তিন টাকা দিতে শুরু করল। নেস্তি জিজ্ঞেস করলে বলত, সওয়ারি পাওয়া যাচ্ছে না, আগের মতো আর রোজগার নেই। এরপর দুতিনদিন পর পর এসে টাকা দিয়ে যেত। একদিন নেস্তি বলেই ফেলল, তোমাকে আর গাড়ি চালাতে হবে না দিনোভাই। যা করবার আমিই করব।
নেস্তি এরপর দিনোর আর এক বন্দুকে গাড়ি চালাতে দিল। কয়েকদিনের মধ্যে সেও নেস্তিকে শাদি করার কথা বলল। নেস্তি তাকেও না বলল। এবার অচেনা এক কোচোয়ানকে সে গাড়ি চালাতে দিল। একরাতে লোকটা মাতাল হয়ে এসে নেস্তির হাত ধরে টানাটানি শুরু করল, রাজাসাহেব।
আট-দশদিন গাড়ি আর ঘোড়া পড়ে রইল। নেস্তি কী করবে ভেবে পায় না। নিজের দিন গুজরানের খরচ, চিন্নির খাবার, গাড়ি রাখার জায়গার ভাড়া-এ সব কোথা থেকে আসবে? সবাই তো এসে তাকে শুধু বিয়ে করতে চায়। নেস্তি বোঝে উদ্দেশ্য তার সঙ্গে শোওয়া। বাইরে বেরোলে সবাই তার দিকে লোলুপ চোখে তাকিয়ে থাকে। একরাতে পাশের বাড়ির লোকটা পর্যন্ত এসে দরজায় ধাক্কা মারতে শুরু করেছিল, আর বলছিল, কত টাকা চাস, মাগী? কত টাকা পেলে দরজা খুলবি?
