-ওদের নিয়ে আমি লিখে কী গুনাহ্ করেছি বলতে পারেন?
-সাহিত্য তো নোংরা জগৎ তুলে আনার জন্য নয়।
-তাহলে সাহিত্য লেখা হয় কেন রাজাসাহেব?
-আমাদের স্বপ্নের কথা তুলে ধরার জন্য।
আমি হেসে ফেলি।-এই আমাদের মধ্যে ওরা নেই। ওদের স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই? ওদের স্বপ্নের কথা বলার কেউ থাকবে না? আমরা, ওরা-র খেলাটা খুব মজার রাজাসাহেব। কমিউনিস্টরা এই খেলায় খুব ওস্তাদ।
-তুমি কমিউনিজম কে ঘেন্না করো?
-জানি না। শুধু এটুকু জানি, আমার কমিউনিস্ট বন্ধুরাই সবচেয়ে আগে আমাকে অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
-তুমি একের পর এক গল্পে বেশ্যাদের কথা লিখবে আর অশ্লীল বলবে না তোমাকে?
-বেশ্যাদের কথা বলা যদি অশ্লীল হয়, তবে তাদের অস্তিত্বও অশ্লীল। তা হলে সেই অশ্লীলতা টিকে আছে কেন? বেশ্যাদের কথা বলা যদি নিষিদ্ধ হয়, তবে এই পেশাকেও নিষিদ্ধ করতে হবে, রাজাসাহেব। বেশ্যাবৃত্তি বন্ধ করুন, তা হলে বেশ্যাদের কথা লেখার জন্য কোনও মান্টোর জন্ম হবে না। আমরা চাষি, মজুর, নাপিত, ধোপা, চোর, ডাকাতদের কথা বলতে পারি। জিন পরীদের নিয়ে গল্প ফাঁদতে পারি। তাহলে বেশ্যাদের কথা কেন বলতে পারব না?
-বলো বলো যতখুশি বলো। তোমার লেখাও কিচর ছাড়া আর কিছু হবে না।
-আমি তো তা-ই চাই রাজাসাহেব।
-মানে?
-এই সমাজের সব ননাংরা যেন আমার লেখায় জমে ওঠে। আপনারা যেন দেখতে পান, সাফসুরতির আড়ালে আসলে কী রয়ে গেছে।
-তুমি কি নিজেকে পয়গম্বর মনে করো?
-না। এই দুনিয়ায় লেখক-কবি সবচেয়ে দুর্বল প্রাণী। তাঁকে যে কেউ লাথি মেরে যেতে পারে, রাজাসাহেব। তার হাতে তো কোন ক্ষমতা নেই। সে শুধু যা দেখছে, অনুভব করছে, সে – কথাই সত্তাবে লিখে গেছে না, এ-সব কথা আপনাকে আমি বলতে চাইছি না। কেননা, আপনি বুঝবেন না।
-যা বুঝব, তা-ই বলো তা হলে।
-বেশ্যাপল্লি আসলে কী জানেন?
-কী? বেশ্যাপল্লি তো বেশ্যাপল্লিই। তবে মান্টোর নতুন ভাষ্য শোনা যাক।
-একটা পচা-গলা মৃতদেহ। এই সমাজ মুর্দাটাকে কাঁধে করে নিয়ে চলেছে। যদদিন না মরাটাকে কবর দেওয়া হবে, ততদিন মুর্দাটাকে নিয়ে কথাও চলবে, রাজাসাহেব। তবে কী জানেন মরাটা যতই পচা গলা হোক, যতই বীভৎস হোক, তার মুখের দিকে তো কেউ-না-কেউ তাকাবেই। তাকালে দোষই বা কী বলুন? মুর্দাটার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই? রাজাসাহেব, একবার ভাবুন তো, আমারাই কী ওকে মেরে ফেলিনি? শুধু তার মুখের দিকে তাকালেই দোষ? তা হলেই মান্টোকে অশ্লীল বলে দেওয়া যায়?
-মান্টো গল্পলেখক হিসেবে তুমি সেরা, আমি স্বীকার করি। ওই জগৎটাকে বাদ দিতে পারো না?
-না রাজাসাহেব। তাহলে নেস্তির গল্পটা আজ আপনাকে শোনাই।
-নেস্তি কে?
-একটা বেশ্যা। ও কীভাবে বেশ্যা হয়েছিল সেই কিস্সাটা শুনুন।
-বলো। রাজাসাহেব হাসলেন।
-কিস্সা ফাঁদায় তোমার জুড়ি নেই।
-এ কিস্সার শুরুতে নেস্তি কোথাও ছিল না, রাজাসাহেব। কোচোয়ান আবুকে নিয়েই এই গল্পের শুরুয়াত। আবু খুবই ভাল মানুষ, রাজাসাহেব।ভাল শব্দে বাগানের খুশবু আছে, মনে রাখবেন। সে ছিল খুবই সৌখিন, আর তার ঘোড়ার গাড়ি শহরে এক নম্বর। গাড়িটাকে সে মনের। মতন করে সাজিয়েছিল। যে-কোনও লোককে সে গাড়িতে তুলতই না। সব যাত্রীই ছিল নিয়মিত খদ্দের। অন্য কোচোয়ানদের মত মদে আসক্তি ছিল না আবুর; ওর নেশা ছিল ভাল জামাকাপড়ের প্রতি। আবুর ঘোড়ার গাড়ি যখন রাস্তা দিয়ে চলত, সবাই মুখ বেঁকিয়ে বলত, নবাবজাদা চলেছে। সেকথা শুনে আবুর যেমন বুক ফুলত, আবুর ঘোড়া চিন্নিরও গতি বেড়ে যেত। ঘোড়ার জিন আবুর হাতে থাকত ঠিকই, তবে চিন্নি আবুর মেজাজমর্জি এতটাই বুঝত যে ওকে কখনও চাবুক মারতে হত না। যেন আবু আর চিন্নি আলাদা কেউ নয়, রাজাসাহেব। অন্য কোচোয়ানরা কেউ কেউ আবুকে নকল করার চেষ্টা করত, কিন্তু ওর মতো রুচি তো তাদের ছিল না।
তো আবু একদিন দুপুরবেলা গাছের ছায়ার নীচে ওর গাড়িতে শুয়েছিল। ঘুমে চোখ বুজে এসেছে। এমন সময় একটা কণ্ঠস্বর শুনে আবু চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, একটা মেয়ে। দাঁড়িয়ে আছে। আবু ধড়মড় করে উঠে বসল। মেয়েটির রূপ তিরের মতো তার বুকে গিয়ে বিধেছে যে। ষোলো-সতেরো বছরের কালো মেয়েটি যৌবনের উদ্ভাসে ঝলমল করছে।
কী চাই? আবু আমতা-আমতা করে বলে। যেন স্বপ্ন রাজাসাহেব, কোনও পরি জন্নত থেকে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
-টেশন যেতে কত নেবে?
আবু হেসে বলল, এক পয়সাও না।
মেয়েটা আবারও জিজ্ঞেস করল, টেশন যেতে কত নেবে, বলো না।
-তোমার কাছ থেকে পয়সা নেব? উঠে বসো।
-তার মানে? মেয়েটা জড়োসড়ো হয়ে যায়।
-আরে ওঠোই না। তোমার যা ইচ্ছে হবে দিও।
মেয়েটা আবুর গাড়ির পিছনে উঠে বসে।-তাড়াতাড়ি চলো।
-এত তাড়া কিসের?
-তুমি-সে তুমি। মেয়েটা কথা শেষ না করেই থেমে যায়।
আবুর গাড়ি চলতে থাকে। চিন্নির খুরের ছন্দে যেন আজ অন্য রহস্য। পিছনেই বসে আছে মেয়েটা। আবু বারবার ফিরে তাকাতে গিয়েও পারে না। মেয়েটা একসময় বলে, টেশন এখনও এল না?
-আসবে গো। আবু হেসে বলে।-তোমার আমার টেশন তো একই জায়গায়।
-মতলব?
-তুমি তো অত বোকা নও, জানেমন। তোমার আমার টেশন একই জায়গায়। তোমাকে দেখেই বুঝেছি। জান কসম,আমি তোমার বান্দা হয়ে গেছি।
