মান্টোভাই, আজ আপনাদের কাছে স্বীকার করতে কোনও লজ্জা নেই, আমি সত্যিই একটা উজবুক ছিলুম। জীবনে সবকিছুই তো আমার ভেস্তে গেছে, তবু প্রত্যেকবার ভাবতুম, এবার একটা কিছু হবেই, খোদা কি শুধু আমাকে মার খাওয়ানোর জন্য এই দুনিয়াতে এনেছেন? সারা জীবন আশার ফাঁদেই আটকে রইলুম।
তাব লায়ে-হী বনেগী, গালিব,
বাকেয়া সৎ হৈ অওর জান অজীজ।।
(পেরে উঠতেই হবে, গালিব,
অবস্থা সঙ্গীন এবং প্রাণ প্রিয়।।)
তবু তারই মাঝে কয়েকদিনের জন্য আবার বসন্তের বাতাস এসেছিল, মান্টোভাই। আমি অবশ্য তাকে চোখে কখনও দেখিনি। সে আমার শার্গিদ হয়েছিল। তার শের শুনে মনে হত :
দেখনা তক্রীর কী লজ্জত। কে যো উসনে কহা
ম্যায়নে ইয়ে জানা কে গোয়া য়ে ভি মেরে দিল মে হ্যায়।
(দেখো তার কথার ইন্দ্রজাল, সে যা বলল
আমার মনে হল এও তো আমার হৃদয়ে ছিল।)
আমি তার তখল্পস দিয়েছিলুম তর্ক। শাহজাহানাবাদের অভিজাত বংশের নারী। জাতিতে তুর্কি, তার পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন বুখারা থেকে। খুবই কম বয়েসে শহরকে হারিয়েছিল তর্ক। কবিতার কাছেই আশ্রয় খুঁজেছিল সে। তার মামা ওর লেখা শেরগুলো আমার কাছে। নিয়ে আসতেন। আমি ওর লেখা অক্ষরগুলির শরীরে হাত বোলাতুম; এভাবেই ওকে স্পর্শ করতে পেরেছিলুম। কখনও কখনও ওদের হাভেলিতেও গিয়েছি। ও থাকত সবসময় পর্দার আড়ালে। ওইরকম পরিবারে তো বাইরের পুরুষের সামনে মেয়েরা আসতে পারে না। মান্টোভাই, সত্যি বলতে কী, আমি তর্কের কণ্ঠস্বর শুনতেই যেতুম। যেন সাইপ্রাস গাছের মধ্য দিয়ে মৃদুমন্দ হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। কী স্পষ্ঠ, কাটাকাটা উচ্চারণ। আর ওর গজলে ছিল কল্পনার অন্য এক উদ্ভাস। আপনি বিশ্বাস করেন কিনা জানি না, কিন্তু আমি মনে করি, নারীর কল্পনালোক পুরুষের চেয়ে আলাদা। তর্ক আমাকে এক গোপন আতরের মতো টানত, যার গন্ধ। পাওয়া যায়, কিন্তু কোনদিন ছোঁয়া যায় না।
দুখ অব ফিরাক কা হমসে সহা নহীঁ জাতা
ফির উসসে জুল্ম য়হ হ্যয় কুছ কহা নহীঁ জাতা।
(বিরহের জ্বালা আর তো সইতে পারছি না,
আরও যন্ত্রণা এই যে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছি না।)
.
আতরের খুশবুটা কবে যে হারিয়ে গেল বুঝতেই পারলুম না। একদিন ওদের হাভেলিতে গিয়ে শুনলুম, তর্ক আর দেখা করবে না। ওর মামাকে জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়েছে মিঞাসাব? ওনার কী শরীর খারাপ?
-না মির্জা সাব। ওতো আর গজল লেখে না।
-কেন?
-সারাদিন শুধু কোরান পড়ে। ঘর থেকেও বেরোয় না।
–ইয়া আল্লা! অমন শায়রা গজল লেখা ছেড়ে দিলেন। কত বড় কবি হতে পারতেন।
-মির্জাসাব আমাদের সমাজে মেয়েদের কতটুকু মূল্য বলুন! তার ওপর কবিতা লেখে। তাকে সবাই পাগল ভাবে।
-আপনারাও তাই ভাবেন?
-না। কিন্তু ও যে কেন এভাবে গুটিয়ে গেল, আমরা কেউ বুঝতেই পারলাম না।
-একবার ওনার সঙ্গে দেখা করা যায় না?
-না মির্জাসাব। ও জানিয়ে দিয়েছে, আপনি যেন আর কখনও না আসেন। সবচেয়ে দুঃখের কথা কি জানেন, নিজের লেখা গজলগুলো নিজের হাতে ছিঁড়ে সব পুড়িয়ে দিয়েছে।
সেদিন ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। যমুনার তীরে গিয়ে বসে রইলুম। কখন সন্ধ্যা নেমেছে। বুঝতেই পারিনি। অন্ধকারে যমুনার স্রোত নিজের সঙ্গেই কথা বলে যাচ্ছে। তখন তাকে দেখতে পেলুম। উৎকণ্ঠিতা নায়িকাকে। কুঞ্জবনে ঝরাপাতার আসনে বসে আছে সে প্রেমিকের অপেক্ষায়। ফুলভারানত গাছগুলি তাকে ঘিরে আছে, যেন বলছে, অমন উৎকণ্ঠিত হয়ো না। রাধিকা, সে আসবে, আসবেই তোমার শ্যামরায়। নায়িকার সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝরনা। সে-ও যেন বলে যাচ্ছে, আর একটু অপেক্ষা করো, ওই তো তার বাঁশির সুর শোনা যাচ্ছে। ঝরনার জল খাচ্ছে এক ত্রস্ত হরিণী। আর গাছেদের পিছন থেকে এক হরিণ মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে নায়িকার দিকে। আমি বুঝতে পারলুম, তর্ক কেন গজল লেখা ছেড়ে দিল। গজলের এক একটা শব্দের ভার সে আর সহ্য করতে পারছিল না। পর্দা সরিয়ে সে তো কনও বন্ধুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে পারবে না।
অব ম্যায় হু অওর মাতম্ এক শহর-এ-আরজু
তোড়া যো তুনে আইনা, তিস্সালদার থা।
(এখন আমি আছি আর শোক আছে এক আশান্বিত শহরে,
যে আয়না তোমার হাতে বিচূর্ণ হল তাতে ছবি ছিল অসংখ্য।)
৩৮. আমি যে অশ্লীল লেখক
ঈমাঁ মুঝে রোকে হৈ তো খীঁচে হৈ মুঝে কুফ্র।
কাবহ্ মেরে পীছে হৈ, কলীমা মেরে আগে।
(ধর্মবিশ্বাস আমাকে ধরে রাখে, অবিশ্বাস আমাকে টানে,
আমার পিছনে রয়েছে কাবা, সামনে প্রতিমার বেদি।)
আমি যে অশ্লীল লেখক, তার বড় প্রমাণ হিসেবে আমার চারপাশের সব সচ্চা আদমিরা কী বলেছিল, জানেন মির্জাসাব? তাদের একটাই প্রশ্ন, আমার গল্পে বারবার বেশ্যাপল্লি আর বেশ্যারা ঘুরে ফিরে আসে কেন? বেশ্যা কী করে গল্পের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতে পারে? প্রশ্নগুলো কারা তুলেছে? তারা সব প্রগতিশীল, সমাজের নিচুতলার মানুষদের নিয়ে গল্প লেখে বলে গর্বে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। হ্যাঁ, মির্জাসাব, এইসব লোকের কাছেও বেশ্যারা নর্দমার পোকার চেয়েও খারাপ। অথচ এরা অনেকেই লুকিয়ে-চুরিয়ে লালবাতি এলাকায় গিয়েছে। আমি যে গিয়েছি, তা নিয়ে রাখঢাক করিনি। চারপাশের বর্ণহীন মানুষদের মাঝে ওই পরিত্যাক্ত রংচং-মাখা মেয়েরা, তাদের দালালরা, ও পাড়ার ফুলওয়ালা,কাবাবওয়ালারা-ওদরে অনেক বেশী জীবন্ত মনে হত আমার। ওই মেয়েরা যাকে একবার ভালবাসে, তাঁকে পুরোপুরি পাওয়ার জন্য খুন করেও ফেলতে পারে। আমাদের সমাজের বাইরে লালবাতির দুনিয়াটা যেন এক মহাকাব্য। সৌগন্ধী, সুলতানা, নেস্তি, বিসমিল্লা, মহমুদা, জিনতদের কথা আমি বানিয়ে-বানিয়ে লিখিনি; দিল্লি, লাহোর, বম্বের বেশ্যাপল্লিতেই ওরা বেঁচে ছিল একদিন। মাহমুদাবাদের রাজা সাহেবের সঙ্গে একদিন খুব তর্ক হয়েছিল আমার। তারও একই বক্তব্য, এইসব ননাংরা মেয়েছেলেদের মধ্যে তুমি কী দেখতে পাও, মান্টো? যাও ফুর্তি করতে, তারপর ওদের নিয়ে বড় বড় কথা লেখো।
