একদিন হঠাৎ বললেন, কাল সকালে সালিমগড়ে চলে আসুন উস্তাদজি।
-জি হুজুর, কিন্তু কেন?
-পতঙ্গ বাজি হবে। যমুনার তীরে পতঙ্গবাজীর মজাই আলাদা।
-আপনি ঘুড়ি ওড়াবেন?
-অনেক দিন ওড়াই না তাই সাধ হল। পরদিন সকালে সালিমগড়ে হাজিরা দিতে হল। দুপুর পর্যন্ত বাদসার পতঙ্গবাজি দেখে বাড়িতে ফিরে খাওয়াদাওয়া করে আবার যেতে হল। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাদশার ঘুড়ি ওড়ানো দেখে যেতে হবে। ঘুড়ি ওড়ানো শেষ করে বাদশার এবার অন্য আবদার। পতঙ্গবাজি নিয়ে একটা শের তার জন্য লিখে দিতে হবে। তক্ষুনি মুখে মুখে বলে দিলুম। বাদশা খুশ আর আমি একটা গাধার মতো ধুকতে ধুকতে খোঁয়াড়ে ফিরে এলুম। মান্টোভাই, আমি দিনে দিনে বুঝেছি, কবির জীবন বলে আসলে কিছু হয় না, আমরা সবাই চাকরবাকরদের মতোই বেঁচে থাকি। কবি কুর্তা -পায়জামা পরে চুলে টেরি কাটে, দাড়িতে মেহেন্দি লাগায়, আতরের খুশবু জড়িয়ে নেয় শরীরে, তবু সব কিছু পেরিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ঘামের গন্ধ-ক্রীতদাসের নিঃশ্বাস। সবাই অবশ্য তা বুঝতে পারে না। ক্ষমতার সঙ্গে একটু গা ঘষাঘষি করে নিজেকেও ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করে। আমি বলি, ওহে কবি, ক্ষমতার সতরঞ্চে তুমি একটা বোড়ে মাত্র।
তাই মজা করো, হ্যাঁ, মান্টোভাই, আপনি একমাত্র যা পারেন তা ক্ষমতাকে নিয়ে মজা করা। সব ক্ষমতাকে শুধু মজা দিয়ে হাস্যকর করে তুলতে হবে। আপনি যদি ভাবেন, এক ক্ষমতার থেকে অন্য ক্ষমতার কাছে গিয়ে আপনি সম্মান পাবেন, তা শুধুই মরিচিকা দেখা। ক্ষমতা শুধু আপনাকে ব্যবহার করবে, প্রয়োজন ফুরোলে লাথি মেরে নর্দমায় ফেলে দেবে। তাই কবিকে তার প্রতিভার কাছে বিশেস্ত থাকতে হবে, হয়তো কোনও একদিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতার সঙ্গে তার কবিতাবৃত্ত প্রয়োজন হবে সমস্ত চরাচরের সমস্ত জীবের হৃদয় মৃত্যুহীন স্বর্ণগর্ভ ফসলের ক্ষেতে বুননের জন্য। তিনি প্রকৃতির সান্তনার ভিতরে চলে যাবেন-শহরে বন্দরে ঘুরবেন—জনতার স্রোতের ভিতর ফিরবেন-নিরালম্ব অসঙ্গতিকে যেখানে কল্পনা-মনীষার প্রতিক্রিয়া নিয়ে আঘাত করা দরকার, নতুন করে সৃষ্টি করবার জন্য সেই চেষ্টা করবেন; আবার চলে যাবেন, হয়তো উন্মুখ পঙ্গুদের সঙ্গে করে নিয়ে, প্রকৃতির সান্তনার ভিতর; সেই কোন আদিম জননীর কাছে যেন, নির্জন রৌদ্রে ও গাঢ় নীলিমার নিস্তব্ধ কোনও অদিতির কাছে।
একজন শাশক যখন পঙ্গু হয়ে যায় বা রাজ্যশাসনের যোগ্যতা যখন তার থাকে না, তখন সে কী করে জানেন, মান্টোভাই? সে তখন বিরক্তিকর কবিতা লেখে, মুশায়েরার আয়োজন করে, ঘুড়ি ওড়ায়, হাতির পিঠে চেপে শোভাযাত্রা বার করে। আমাদের বাদশাহেরও এছাড়া আর কিছু করার ছিল না। মোসায়েবের দল তাঁকে ঘিরে থাকত। বাদশাহের মুখ থেকে কোন কথা বেরোলেই তারা গদগদ হয়ে হায়! হায়! করে উঠত। আমি চুপচাপ বসে দেখতুম, ইতিহাসের কিতাবটাকে উইপোকারা কিভাবে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। ইতিহাস বলতে কি সত্যিই কিছু আর থাকে? পথের ধুলায় ছড়িয়ে থাকে কিছু কিস্সা।
কাল্লু একদিন কোথা থেকে ধরে নিয়ে এল এক দস্তানগোকে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তার হাত চেপে ধরে বললুম, মিঞা, আজ আমার সঙ্গে দরবারে চলো। -দরবার? কোন দরবার?
-বাদশার দরবার।
-মাফ করুন হুজুর। আমি কি দরবারে যাওয়ার লোক?
-আমি তো তোমাকে নিয়ে যাব।
-দরবারে আমার কী কাজ, হুজুর?
-বাদশাকে দস্তান শোনাবে।
-জাঁহাপনা দস্তান শোনেন?
-কেন শুনবেন না? বাদশার জীবনটাই তো আজিব দস্তান।
জাঁহাপনা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এ আবার কাকে ধরে নিয়ে এলেন উস্তাদজি?
-দস্তান শুনতে ভালবাসেন তো জাঁহাপনা?
-জরুর। কার বলা দস্তান আপনি শোনাবেন, মিঞা?
-মওলা রুমির হুজুর।
-বহুৎ খুব।
বাদশা গড়গড়ায় মৌজ করে টান দিতে শুরু করলেন।
হুজুর, কিস্সাটা এক ইঁদুর আর উটের।
-মানুষ নেই?
-না, হুজুর। তবে ইঁদুর আর উটও তো একরকম মানুষ হুজুর।
-মতলব?
-হুজুর, কোনও মানুষের মধ্যে ইঁদুর লুকিয়ে থাকে, আবার কারও মধ্যে উট।
-শাবাস। আপনি কিস্সা শুরু করুন।
-হুজুর, এমন ইঁদুর খুব একটা দেখা যায় না। নিজেকে মনে করত একেবারে শাহেনশা।
-শাহেনশা? জাঁহাপনা হাসতে লাগলেন। ইঁদুরও নিজেকে শাহেনশা মনে করে?
-কেন করবে না বলুন? অন্য ইঁদুররা যে-কাজ করার কথা ভাবতেও পারত না, এই ইঁদুরটা তা বুক ফুলিয়ে করত।
জাঁহাপনা হা-হা করে হেসে উঠলেন। ইঁদুরেরও বুক ফোলে, মিঞা?
হুজুর, আশমান থেকে যদি দেখেন, আমরাও তো এক একটা ইঁদুর। আমাদের সিনা ফোলে না?
-বাজে কথা বাদ দাও। কিস্সাটা বলো শুনি।
-ওইটুকুন ইঁদুর হলে কী হবে, মনে মনে সে নিজেকে সিংহ ভাবত, হুজুর। বড় বড় বিপদের মুখে সে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তারপর বুদ্ধির জোরে ঠিক বেরিয়ে আসত। অন্য ইঁদুরেরা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। একদিন রাতে মরুভূমির পথে বাড়িতে ফিরছিল ইঁদুরটা। মরুভূমিতে একটা উট ঘুমিয়ে ছিল হুজুর। উটের গলায় বাঁধা দড়িতে জড়িয়ে আটকে গেল সে। তবে ইঁদুরটা তো খুব বুদ্ধিমান। নানা কসরত করে দড়ির ফাঁস থেকে বেরিয়ে এল।
-তারপর?
-অতি বুদ্ধিমানের মাথায় বদ বুদ্ধি খেলে হুজুর। দড়ির শেষ প্রান্ত ধরে ইঁদুরটা টানতে লাগল। উটের গেল ঘুম ভেঙে। ইঁদুরের পিছন পিছন সে এগিয়ে চলল। ইঁদুর তখন মনে মনে ভাবছে, একটা উট আমার পিছনে পিছনে আসছে। সবাই দেখে তাজ্জব হয়ে যাবে। যেতে যেতে পথে পড়ল একটা নদী। তার স্রোত সবসময় ফুসছে। ইঁদুর নদীর সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছে, কীভাবে পার হব এই অকূলবারিধি?
