-কী বলবে?
-লিহাফ-এর পক্ষে। আমি ভুল করিনি।
-বোলো। তোমার কথা প্রতিধ্বনি হয়ে ঘুরবে এই এজলাসে। তবু তুমি কখনও ক্ষমা চেয়ো না ইসমত।
-কী ভাব আমাকে, মান্টোভাই?
-মার খেতে খেতে একসময় শিরদাঁড়া নুয়ে যায় তো। আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। ইসমত, আমি ঠিক করেছি, এখন থেকে আমি চুপ করে থাকব। নীরবতা ছাড়া আমার আর কোনও অস্ত্র নেই।
সেদিন রাতে ইসমত হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল, মান্টোভাই তোমার আগের মত দম নেই কেন বলো তো?
কী বলব ইসমতকে? ও কি জানে, আমি আসলে এক দুর্বল, নিরীহ মানুষ? শুধু বেঁচে থাকার জন্য আমি নিজেকে সবার সামনে এমনভাবে হাজির করেছি, যেন আমার মতো কালাপাহাড় আর কেউ নেই।
-ইসমত, জেলখানাকে আমি খুব ভয় পাই।
-তুমি জেলখানাকে ভয় পাও?
-আমার ভয়ের কথা কাউকে কখনও বলিনি, ইসমত। কাকে বলব, বলো? শফিয়াকে বলা যায় না। ও এত শান্ত আর ভাল মেয়ে। এমনিতেই আমাকে নিয়ে জেরবার হয়ে আছে। ইসমত, আমার দৈনন্দিন জীবনটাই তো একটা জেলের জীবন। তার মধ্যে যদি আরও একটা জেলখানায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, আমি এক মিনিটও বাঁচব না।
-কী হয়েছে তোমার মান্টোভাই?
-খুব ভয় করে ইসমত। এই জীবনটাকে চুষে-চিবিয়ে খাওয়ার খুব লোভ আমার। ধরো, রাস্তায় হাঁটছি, কেউ হঠাৎ এসে আমাকে বুকে গুলি করল, আমি মরে গেলাম, তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু জেলখানায় একটা ছারপোকার মতো আমি মরতে চাই না।
-এ-সব কেনো ভাবো?
-আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে ইসমত।
-মান্টোভাই। ইসমত চিৎকার করে ওঠে।-কী মনে করো নিজেকে? শুধু নিজের জন্য সহানুভূতি চাও, তাই না?
-গাড়িতে যে পাঁচ নম্বর চাকাটা লাগানো থাকে, দেখেছ ইসমত? আমি ওই পাঁচ নম্বর চাকাটা।
-আমাদের কথাগুলো হিন্দি সিনেমার ডায়লগের মতো হয়ে যাচ্ছে, মান্টোভাই। আমি আর কিছু বলিনি। তর্ক করার ইচ্ছে ছিল না। মনে-মনে বলেছিলাম, কেউ তো আমাদের নিয়ে একটা সিনেমাই তৈরি করছে ইসমত। হয়তো কেয়ামতের দিনে সিনেমাটা তিনি আমাদের দেখাবেন।
৩৭. রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ
টুক্ মীর-র জিগর-সোখতহ্ কী জ খবর লে।
কেয়া আর ভরোসা হ্যায় চিরাগ-এ সহরীকা।
(পোড়া হৃদয় মীরের একটু তাড়াতাড়ি খবর নিও,
হে বন্ধু, রাত্রী শেষের প্রদীপ আর কতক্ষণ।)
আপনি তো জানেন, মান্টোভাই, আমি যখন রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলুম, তখন নাটকের শেষ দৃশ্যের অভিনয় চলছে। শুধু খোদা কখন যবনিকা ফেলবেন, তারই অপেক্ষা। কিলা মুবারকে দেওয়ান-ই-খাসের দেওয়ালে জাঁহাপনা শাহজাহান আমির খসরুর কবিতার দুটো পংক্তি লিপিবদ্ধ করেছিলেন, অগর ফিরদৌসে বররুইয়ে জমিন অস্ত, হামিন অস্ত এ হামিন অস্ত এ হামিন অস্ত। প্রথিবীতে স্বর্গ যদি থাকে, তা হলে তা এখানে। আমি যখন জাঁহাপনা বাহাদুর শাহের দরবারে গিয়ে পৌঁছলুম তখন সেই স্বর্গ নরক হয়ে গেছে। ১৮৩৭-এ বাহাদুর শাহ সিংহাসনে বসলেন, তখন তার বয়স বাষট্টি। সাম্রাজ্য বলতে তো আর কিছুই নেই। ইংরেজরা একে একে সব গ্রাস করেছে। কেল্লার ভিতরে আর কাছাকাছি দু-একটা জায়গায় যেটুকু নবাবি দেখানো। আয় বলতে ইংরেজের দেওয়া ভাতা আর যমুনার তীরের কয়েকটা অঞ্চল থেকে পাওয়া রাজস্ব। আর কেল্লায় কত লোক থাকত, জানেন? দুহাজারের ওপর। এদের বেশির ভাগই অবৈধ সন্তান। ভাবতে পারবেন না মান্টোভাই, এই সব সুলাতিন পোকামাকড়ের মতো বেঁচে ছিল। বাহাদুর শাহ আসলে পোকামাকড়দের বাদশা হয়েছিলেন।
বাদশা হয়ে তিনি আবুল মুজফফর সিরাজুদ্দিন মহম্মদ বাহাদুর শাহ বাদশা গাজী নাম নিলেন। আমার হাসি পেত। গাজি? গাজি মানে জানেন তো? পবিত্র যোদ্ধা। আরে যুদ্ধটা তিনি করলেন কোথায়? আর যুদ্ধ করার মতো ক্ষমতাও তো তার ছিল না। সে জন্য যে সাহস, যে আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন বাদশার তা ছিল না। সিপাহি বিদ্রোহের সময় তো তাঁকে পুতুল হিসেবে নাচানো হয়েছিল। বেগম জিনত মহল আর খোজা মেহবুব আলি খানের হাতের পুতুল হয়েই বেঁচেছিলেন তিনি। মেহবুব আলি যা বলত, বাদশা তা-ই করতেন। আর মেহবুব আলিকে চালনা করতেন বেগম জিনত মহল। অবাক হবেন না, ভাইজানেরা। মুঘল সম্রাটদের হারেমের নজরদারি করত খোজারা। সাম্রাজ্য যখন ধ্বংসের পথে, হারেমের খোজারা এতটাই শক্তিশালী। হয়ে উঠেছিল যে বাদশা খোজা মেহবুবের কথা শুনেই চলতেন। ভেবে দেখুন মান্টোভাই, খোজারা যখন প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠে, সাম্রাজ্যের ধ্বংস তখন অনিবার্য।
আর আমাদের বাদশা? তিনিও তো খোজাই ছিলেন, হ্যাঁ, মান্টোভাই, মানসিক ভাবে খোজা। কোনও যুদ্ধ বিগ্রহ করতে হয় নি তাঁকে। পূর্বপুরুষদের পয়সায় বসে বসে খেয়েছেন, নবাবি চাল দেখিয়েছেন, আর ফালতু কিছু কবিতা লিখে গেছেন। তার আইনি বিবি চারজন; বেগম আশরাফ মহল, বেগম আখতার মহল, বেগম জিনত মহল, বেগম তাজমহল। এছাড়াও কত যে ক্রীতদাসী আর রক্ষিতা। চুয়ান্নজন সন্তান হয়েছিল তাঁর, ভাবতে পারেন? বাইশটি ছেলে আর বত্রিশজন মেয়ে। এর নাম বাদশাহী জীবন, মান্টোভাই।
বাদশা নিজেও জানতেন, তৈমুরের সাম্রাজ্য অস্তাচলের পথে চলেছে। তাই কী করবেন, ভেবে উঠতে পারতেন না। রোজ দরবারে এসে বসতেন। কেন? তিনি নিজেই জানতেন না। কী হবে দরবার বসিয়ে? কিছুই তো তার হাতে নেই। অন্য সকলের সঙ্গে আমাকেও রোজ হাজিরা দিতে হত। জাঁহাপনা কোন গজল লিখলে সংশোধন করে দেওয়াই আমার কাজ। দরবারে যে যার মতো গুলতানি করত। বাদশা হয়ত হঠাৎ একটা শের বললেন। সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে কেয়া বাৎ, কেয়া বাৎ, মারহাব্বা, মারহাব্বা। একেক সময় বাদশা ঘুমিয়ে পড়তেন। আমরা সবাই অপেক্ষা করে থাকতুম, কখন তার ঘুম ভাঙবে, কখন তিনি আমাদের ছুটি দেবেন।
