-বখোয়াশ বাদ দাও।
-বখোয়শ তুমিই করো, তারপর বলো বাদ দাও। শহিদ, তুমি একে সহ্য করা কী করে?
শহিদ হাসতে হাসতে বলে, ওর বিষটুকু তো তুমিই নিয়ে নাও, মান্টো। আমার জন্য অমৃতই থেকে যায়।
ইসমত গম্ভীর হয়ে বলে, নারী -পুরুষ ছেড়ে এবার মানুষের কথায় এসো তো মান্টোভাই।
-মানুষ? সেটা কী চিজ?
-মানে?
-আমি তো জানি, পুরুষ আর নারী। মানুষ বলে তো কিছু জানি না।
-আবার তুমি বদমায়েসি করছ। ইসমত চোখ বড় বড় করে তাকায়।
-আমি বিমূর্তকে পছন্দ করি না, ইসমত।
-মানে?
-মানুষ শব্দটা আমার কাছে বিমূর্ত। আমার কাছে আছে শহিদ, ইসমত, শফিয়া-তারা কেউ নারী কেউ পুরুষ। মানুষ শব্দটা একটা ফ্রড।
-সব তোমার কাছে ফ্রড, তাই না? ইসমত চিৎকার করে ওঠে।
-তুমি ফুড নও, ইসমত বহিন।
-আবার?
-কী?
-বহিন তোমাকে বলতেই হবে?
শহিদ হা-হা করে হেসে ওঠে। ইসমত, এ-জীবনে, মান্টোর খেলাটা মেনে নাও। পরের জীবনে না-হয় অপেক্ষা করো।
আমি গম্ভীর মুখে বলি, শহিদ, এত সিরিয়াস মেয়ের কিছুতেই গল্প লেখা উচিত নয়।
ইসমত কোনও কথা বলে না। অনেকক্ষণ পর সে আমার চোখে সোজাসুজি তাকায়। -তা হলে কী করব?
-মান্টো, আর রাগিও না ইসমতকে। শহিদ ইসমতের মাথায় হাত বোলাতে-বোলাতে বলে। – তুমি চলে গেলে আমার গোস্ত কিমা করে ছাড়বে।
-পায়ের কথা কী এত বলছিলে, বলো তো ইসমত?
-না।
-এই নাও, পেস্তা খাও।
পেস্তার লোভ ইসমত কখনও ছাড়তে পারে? আমার হাত থেকে একমুঠো নিয়ে চিবোতে শুরু করল। অমনি অন্য এক ইসমত।-আমার কথাই তো তুমি শুনলে না। যাদের পা খুব সুন্দর, তার খুব বুদ্ধিমান আর অনুভূতিপ্রবণ হয়।
-তা-ই? আমার তা হলে বুদ্ধি আর অনুভূতি, দুটোই আছে?
-জানি না। ইসমত ঝাঝিয়ে ওঠে। -আমার দাদার ছিল। আজিম বেগের। কী সুন্দর পা! একেবারে মেয়েদের মতো। মরার সময় দুটো পা এমন ফুলে গেছিল, তাকানো যেত না, মান্টোভাই।
এরপর ইসমতকে আর রাগানো যায় না। আজিম বেগ চুঘতাই যে ঢুকে পড়েছে আমাদের মধ্যে। আমি দেখতে পেতাম ওই নামটা এলেই ইসমত স্থির হয়ে যেত; লোকটা এত বড় বজ্জাত, ইসমতকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে? আজিম বেগের ওপর ওর সব অভিমান লেখা আছে দোজখি গল্পে।
সে বড় সুখের সময় ছিল, মির্জাসাব, লাহোরের সেই দিনগুলো। আমরা প্রায় সারা দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। আনারকলি বাজার, শালিমার বাগ। নূরজাহানের সমাধি। মুশায়েরা, গাপ-বাজি, মাছভাজা, কাবাব, মুরগ কি টিক্কা। কত পুরনো দিনের জলছবি ছড়িয়ে আছে। লাহোরের পথে-পথে। আমার প্রথম যৌবনের হাশ্মতের সব দিন।
আমার বু গল্পটা ছাপা হতেই আবার শোরগোল পড়ে গেল। এর চেয়ে অশ্লীল গল্প নাকি আর হয় না। তার ওপর খ্রীস্টানরা নাকি আমার ওপর খুব চটেছে। এ গল্পের রণধীর একটা খ্রীস্টান মেয়েকে ছেড়ে রাস্তার এক কালো মেয়ের শরীরের গন্ধে জীবনের উত্তাপ খুঁজে পেয়েছিল। আবার লাহোরের পথে ইসমত ও আমি। শহিদ তখন সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত। ওর পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল না। প্রথম শুনানি শুরু হল বু নিয়ে।
আমার উকিল জিজ্ঞেস করলেন, মান্টোসাব এই গল্প নাকি অশ্লীল?
-আলবত। সরকার পক্ষের জবাব।
-কোন শব্দটা অশ্লীল?
-সিনা।
-মহামান্য আদালত, সিনা কি অশ্লীল শব্দ? আমার তো মনে হয় না।
সরকার পক্ষের উত্তর, সিনা অশ্লীল নয়। তবে এক্ষেত্রে মহিলার স্তনের কথা বলা হয়েছে।
আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না, মির্জাসাব। আদালতের উকিল-মুহুরি-সরকারের চাকরবাকরেরা বলে দেবে, কোন শব্দের মানে কী? আর শব্দ নিয়ে যে জাগরণে-স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নে বেঁচে থাকে, তার কিছু বলবার থাকবে না? হ্যাঁ, আমি লাফিয়ে উঠে বললাম, মহামান্য আদালত, আমার গল্পে সিনা শব্দে নারীর স্তনের কথাই বলা হয়েছে। নারীর স্তনকে নিশ্চয়ই কেউ চিনাবাদাম বলে না।
এজলাসে হাসির হল্লা উঠল। আমিও হাসি থামাতে পারছিলাম না, মির্জাসাব। যারা আমার বিচার করছে, তারা কেউ স্তন দেখেনি, স্তন স্পর্শ করেনি, টেপেনি, চোষেনি? তা হলে স্তন শব্দ নিয়ে এদের এত আপত্তি কেন? আমি স্তন ভালবাসি, মির্জাসাব। কী আশ্চর্য গড়ন, যেন সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এল দুটি শঙ্খ, কত অজানা-অনামা প্রণিদের কামনার সৌরভ ছড়িয়ে আছে তাদের শরীরে, আমি তাদের উষ্ণতায় হাত বোলাই, দেখি তাদের সৌন্দর্য, যেন মন্দিরের দুই গোপুরম, কখনও তারা দুটি পাখি হয়ে যায়, আমি তাদের পালকে আদর সঞ্চার করি। আমি ভালবাসি নারীর গ্রীবা, বাহু, নাভিপুস্প, নিতম্ব, উরু। খোদা যাকে এমন সৌন্দর্য দিয়েছেন, আপনি তাকে অশ্লীল বলবেন কোন সাহসে?
বিচারপতিরা তো প্রায়শই বেরসিক। অতএব তিনি ঘোষণা করলেন, অভিযুক্ত দ্বিতীয়বার এমন করলে, আদালত অবমাননার দায়ে তাঁর শাস্তি হবে।
আমি বসে পড়লাম। ইসমত আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, সিনা যদি অশ্লীল হয়, তবে হাঁটু বা কনুই অশ্লীল নয় কেন?
-এ-সব বখোয়শ শুনো না।
-তুমি আর কিছু বলবে না?
-কী বলব?
-ওরা তোমাকে নিয়ে কাটাছেড়া করে যাবে, আর তুমি চুপচাপ বসে শুনবে মান্টোভাই?
ইসমত, এমনটাই তো লেখকদের নিয়তি। যে কেউ তোমাকে ছুরি দিয়ে ফালাফালা করবে। তোমাকে সব শুনে যেতে হবে। এই দুনিয়ায় সত্য কখনও জোর গলায় কিছু বলতে পারে নি।
-আমি বলব।
