-তা ছাড়া কী? গল্প লেখার জন্য রানি তোমাকে-আমাকে কোর্টে হাজিরা দেওয়ার ফরমান পাঠিয়েছেন, এর চেয়ে বড় সম্মান আর হয় না কি?
-ওই সম্মান তুমি ধুয়ে জল খাও, মান্টোভাই। সব কিছুতেই নিজেকে সবার চেয়ে আলাদা দেখতে, তুমি ভালবাস।
-ঝগড়া করো না ইসমত। শহিদ, আইসক্রিম আনাও তো। ইসমত, কী একখানা গপ্পো লিখেছ, ভাবতে পারছ। হাজারবার নিজের পিঠ চাপড়াও। লাহোরের ট্রিপটা ভারি মজার হবে, ইসমত। শহিদ, তুমিও আমাদের সঙ্গে যাবে।
-ও কী করবে গিয়ে? ইসমত ধমক দেয়।
-আরে বাবা, শীতের লাহোরের সৌন্দর্য তোমরা জানো না। কথায় বলে না, যো লাহোর নেহি দেখা, উও জন্মাই নাই। মাছ ভাজা আর হুইস্কি -ওঃ শহিদ, সে এক জন্নত -আশিকের চুমুর মতো গরম রেড ওয়াইন, ভাবা যায়?
-আপনি থামবেন মান্টোসাব?
-কেন শফিয়া? থামব কেন? আমি চোর, না জালিয়াত? আসলে বিচারের নামে রানি চান আমরা একটু লাহোর ঘুরে আসি।
কোর্টে হাজিরা দেওয়ার জন্য আমাদের লাহোর যাওয়ার সব ব্যবস্থা পাক্কা হয়ে গেল। হীরালালজিই আমাদের দুজনের কেস লড়বেন।
আঃ লাহোর! মির্জাসাব, পুরো শহরটাই যেন একটা শিশমহল। না, লাহোর যেন সেই নারী, যার কটাক্ষে রামধনু খেলে, সে জুয়া খেলে তার ভাগ্য নিয়ে, আর দুহাত বাড়িয়ে তার বুকের খুশবুর ভেতরে টেনে নেয়। আমরা লাহোরে পৌঁছতেই কত যে নেমন্তন্ন আসতে লাগল। সবাই তো আমার চেনা। কিন্তু ওরা দেখতে চায় ইসমতকে। এ কেমন আজিব অওরৎ, যে একটা গল্প লিখে শোর মাচিয়ে দিয়েছে।
স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট রায়সাহেব সন্ত রামের এজলাসে আমাদের হাজিরা দিতে হল। আমরা আবেদন জানিয়েছিলাম, বম্বে থেকে লাহোর তো দীর্ঘপথ, তাই প্রতিবার যেন আমাদের হাজিরা মুকুব করা হয়। আমাদের আবেদন গ্রাহ্যই হল না। তাই উচ্চ আদালতে আবেদন জানাতে হল। এরপর বিচারপতি অচ্ছুরামের এজলাশে হাজির হতে হল আমাদের। সে এক অবাক কাণ্ড! বিচারপতি অনেকক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি আপনাদের দুজনের গল্পই আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। আমার তো খুবই ভালো লেগেছে। এ যেন হাতে চাঁদ পাওয়া। এ যাত্রা তাহলে বাঁচা গেল। কিন্তু অচ্ছুরাম ঠেলে দিলেন দীন মহম্মদের এজলাসে। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলেন, সাহিত্যের নামে আপনারা নোংরামো করেছেন। তিনি আমাদের আবেদন নাকচ করে দিলেন। আমি তখন সত্যিই অসুস্থ ছিলাম, মির্জাসাব। তাই ডাক্তারের চিঠি নিয়ে গিয়েছিলাম। অগত্যা দীন মহম্মদসাব আমার হাজিরা মুকুব করে দিয়েছিলেন।
মির্জাসাব, অশ্লীলতার অভিযোগ সম্পর্কে আমি আমার বক্তব্য স্পষ্ট ভাষায় রায় সাহেব সন্ত রামের এজলাসে পেশ করেছিলাম। হুজুর, মহামান্য, আপনার অনুমতি চেয়ে নিজের দুএকটি কথা বলতে চাই। নারী ও পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে এমন কিছুই নেই, যাকে আমরা অশ্লীল বলতে পারি। এই সম্পর্ক নিয়ে কোনও কথাই নোংরা হতে পারে না। কিন্তু যখন দুজনের সম্পর্ককে শুধু চুরাশিরকম যৌনমুদ্রায় দেখানো হয়, তখনই তা একমাত্র নোংরা হয়ে যায়। গল্প, কবিতা, ভাস্কর্যকে দেখতে হবে সেই সৃষ্টির ভেতরের প্রণোদনাকে বুঝে। তার পিছনে কোনও অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে, তাকেই আমরা অশ্লীল বলতে পারি। যৌনতা মানেই অশ্লীল নয়। তা হলে কোনারক, খাজুরাহোর মন্দির ভেঙে ফেলা উচিত। কোনও মানুষ নোংরা মন নিয়ে জন্মায় না, হুজুর। ভাল বা মন্দ, যাই বলুন, সবই তার ভেতরে বাইরে থেকে এসে ঢোকে। ধুয়া গল্পে আমি একটা বিশেষ অবস্থাকে বর্ণনা করতে চেয়েছি। গল্পের বাবা ও মা, নিজেরা একটু আলাদা থাকার ভান করে যৌন উত্তেজনা উপভোগ করে। সেই উত্তেজনাই চারিয়ে যায় তাদের ছেলে মাসুদের মধ্যে, যেহেতু সে ঘটনাটা আচমকা দেখে ফেলেছিল। আমি জানি না, কেন এই গল্পকে অশ্লীল বলা হয়। কোন অসুস্থ মন এই গল্পের মধ্যে অশ্লীলতা খুঁজে পাবে। আমি গল্প লিখেছি সুস্থ মনের মানুষদের জন্যই। হুজুর, আমি সামান্য গল্প লেখক; আমাকে পর্নোগ্রাফার বানিয়ে দেবেন না।
রায়সাহেব সন্ত রাম সম্ভবত কিছুই শোনেননি, বা শুনলেও। তিনি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন। আমার দুশো টাকা জরিমানা হল। আমি সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে দুশো টাকা বার করে দিলাম। সন্ত রামজি মুচকি হেসে বললেন, আপনি তাহলে তৈরি হয়েই এসেছিলেন?
-তা ছাড়া উপায় কি বলুন?
তবে জরিমানাটা আবেদন করে মুকুব হয়ে গিয়েছিল।
এ-সব আদালত-জরিমানা-অপমানের কথা না-হয় একটু মুলতুবি থাক, ভাইজানেরা। লাহোরে ওই শানশওকতের দিনগুলো কখনও ভুলতে পারব না। এজলাসে হাজিরার সময়টুকু ছাড়া আমি, ইসমত আর শহিদ টাঙ্গায় চেপে ঘুরে বেড়াতাম আর কেনাকাটা করতাম। ইসমত কত যে কাশ্মীরি শাল আর জুতো কিনেছিল। আমারও জুতো কেনার লোভ ছিল খুব। জুতো কিনতে গিয়ে প্রতিবারই ইসমত আমার ছোট-ছোট পায়ের দিকে তাকিয়ে বলত, তোমার পা দেখলে বড় লোভ হয়, মান্টোভাই।
-ফালতু কথা বোলো না। এই পা দুটোকেই আমি সবচেয়ে ঘেন্না করি।
-কেন?
-এক্কেবারে মেয়েদের মতো। কোনও মানে হয়! খোদা যে তখন কী করছিলেন! ভুলে কোনও অওরতের পা লাগিয়ে দিয়েছেন।
-মেয়েদের পা তুমি এত ঘেন্না করো? এদিকে মেয়েদের প্রতি আগ্রহের তো কমতি নেই।
-তুমি সব কিছু উল্টো বোঝ ইসমত। মেয়েদের পা ঘেন্না করব কেন? পুরুষ হিসেবে আমি মেয়েদের পছন্দ করি। তার মানে তো এই নয় যে আমি মেয়ে হতে চাইব।
