-ভয়ের কিছু নেই মিঞা। এই সাতশো দিনার রাখুন। নিজের ইচ্ছে মতন খরচা করবেন। তবে রবাবের জন্য অবশ্যই তার কিনে নেবেন।
তসলিম হাত বাড়িয়ে দিনারগুলো নিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন। তারপর ওমরের হাতে সেগুলো তুলে দিয়ে লজ্জায়, নিজের প্রতি ঘৃণায় কবরে আঘাত করে রবাব ভেঙে ফেললেন, ছিড়তে শুরু করলেন নিজের পোশাক।
-এ কী করছেন আপনি? আপনি খোদার প্রিয় মানুষ। খোদাই তো আমাকে পাঠিয়েছেন।
-আমি এর যোগ্য নই খলিফা সাব। এই রবাবের জন্যই আমি তাঁর থেকে দূরে সরে গেছি। আমার কণ্ঠস্বরের জন্যই তাঁর সৌন্দর্যকে দেখতে পাইনি। আমার উচ্চাশা তার কাছে আমাকে। পৌঁছতে দেয়নি। বিখ্যাত হওয়ার জন্য যখন আমি ব্যস্ত ছিলাম, তখন তার কাফেলা আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। এই পাপ, এই অহং কিছুতেই মোছবার নয় খলিফা সাব।
-এত যে কথা বলছেন, তাও আপনার অহং-এরই পরিচয়, মিঞা। অনুতাপে পাপ আরও বাড়বে।
-কিন্তু ওই রবাব আমাকে তার কাছে পৌঁছতে দেয়নি।
-রবাব তো তিনিই আপনার হাতে তুলে দিয়েছেন। না হলে কী পেতেন? রবাবের তার কেনার। জন্য তিনিই তো আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনার কণ্ঠস্বরের মধ্য দিয়েই আল্লাই তো গান করেন।
তসলিম খলিফার কাছে দিনার নিয়ে তাঁকে সালাম জানালেন। তারপর বাজারের পথে রওনা দিলেন নতুন রবাব কেনার জন্য। এরপর থেকে তসলিমকে আর কেউ দেখতে পায়নি। নতুন রবাব বাজাতে বাজাতে তিনি সেই নীরবতার দিকে চলে গেলেন, কোনও কিস্সার শব্দ যাকে ছুঁতে পারে না।
৩৬. আমি তো একজন গল্পলেখক
থী খবর গর্ম্ কেহ্ গালিব-কে উড়েঁগে পূর্জে;
দেখনে হম-ভী গয়ে থে পেহ্ তমাশা নহ্ হুয়া।
(চারদিকে খবর রটে গেল-গালিবকে টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা হবে;
দেখতে আমিও গিয়েছিলাম, কিন্তু তামাশাটা হলই না।)
মির্জাসাব আমি তো একজন গল্পলেখক, অথচ দুনিয়ার আদালত আমাকে সবসময় অশ্লীল লেখক হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। পাকিস্থান সরকার কখনও বলেছে, আমি কমিউনিস্ট, সন্দেহভাজন, কখনও আবার আমাকে মহান লেখকের শিরোপা দিয়েছে। বেঁচে থাকার সামান্য সুযোগটুকু অবধি কখনও কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কখনও দয়া করে কিছু ভিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একেক সময় ওরা বলেছে, আমি আসলে কেউ নই, একজন বহিরাগত; আবার নিজেদের মর্জি হলে আমাকে কাছে ডেকে নিয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি বুঝেছি, মির্জাসাব ওদের চোখে আমি বহিরাগতই; শুধু পাকিস্তান সরকার কেন, যে কোনও সরকার, যে-কোনও ক্ষমতার কাছে। বাইরের লোক, মোহাজির। আপনার জীবনটাও তেমনভাবেই কেটে গেছে, নিজেকে বারবার প্রশ্ন করেছি, আমি তাহলে কে? আমার অবস্থান কোথায়? পাকিস্থানে আমার নিজের কোনও জায়গা হয় নি মির্জাসাব, তবু সেই জায়গাটা খোঁজবার চেষ্টা চালিয়ে গেছি পাগলের মতো। আর সেজন্যই কখনও হাসপাতালে, কখনও পাগলাগারদে দিন কেটে গেছে আমার। সবাই মুখে থুতু ছিটিয়েছে। মান্টো! আরে ও তো একটা অশ্লীল লেখক, পর্ণোগ্রাফার। সারাদিন শরাব খায়, শরাবের জন্য টাকা ধার করে, ভিক্ষে চায়, আর তারপর ওর দোজখে ঢুকে নোংরা-নোংরা গল্প লেখে।
এ-সব অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, ভাইজানেরা। তখনও দেশটা দু-টুকরো হয়ে যায় নি। কালি শালোয়ার গল্পটা বেরোনোর পরেই হইচই শুরু হয়েছিল। সেবারের মতো লাহোরের সেশন কোর্ট আমাকে মুক্তি দেয়। তারপর ধুয়া-র বিরুদ্ধে উঠল অশ্লীলতার অভিযোগ। আর তখন কালি শালোয়ার-কে আবার পুঁয়া-র সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল চার্জশিটে। ১৯৪৪-এর ডিসেম্বর মাস। লাহোর থেকে এক গোয়েন্দা পুলিশ এসে আমাকে গোরেগাঁও থানায় হাজিরা দিতে বলল। থানায় যেতেই আমাকে গ্রেফতার করা হল। গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখতে চাইলে একজন অফিসার বললেন, তা তো আপনাকে দেখানো যাবে না।
-কেন?
-হুকুম নেই।
-ওয়ারেন্ট না দেখিয়ে তো আপনি অ্যারেস্ট করতে পারেন না।
-মিস্টার মান্টো, আপনার কোনও কথারই আমি উত্তর দিতে পারব না। এখান থেকে আপনাকে সোজা লাহোর কোর্টে পাঠানোর নির্দেশ আছে।
আমি তখন থানা থেকে উকিল হীরালালকে ফোন করলাম। হীরালালজি অফিসারের সঙ্গে কথা বলার পর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হল। জানুয়ারি মাসের ৮ তারিখ রাতে আমাকে আবার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হল। জামিনে মুক্তি পেলাম ঠিকই, কিন্তু লাহোর স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে আমাকে হাজির হতে বলা হল।
সেই সময় ইসমতকে লিহাফ গল্প লেখার জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওকেও একই এজলাসে হাজির হতে হবে। শুনে বেশ মজাই পেয়েছিলাম, মির্জাসাব। যাক্, এবার তাহলে লাহোরে গিয়ে একটু মওজ-মস্তি করা যাবে। শফিয়াকে নিয়ে ইসমতের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম।
-তোমরা দুজনে যা শুরু করেছ! শহিদ আমার পিঠ চাপড়ে বলল, চলো সেলিব্রেট করা যাক। ইসমত তো গুম মেরে বসে আছে।
-কেন?
-আমিও তো তাই বলছি। ওর এখন মনে হচ্ছে, লিহাফ লিখে ও যেন বড় গুনাহ্ করে ফেলেছে।
-সে কথা এখনও বলিনি। ইসমত ফুঁসে ওঠে।
-তা হলে?
-একটা গল্প লেখার জন্য এত বিড়ম্বনা পোষায় না।
-মান্টোসাবকে আমিও তাই বলেছিলাম। শফিয়া বলে, গল্প লেখার জন্য জেলে যেতে হলে, ও সব না-লেখাই ভাল।
-শোনো, ইসমত বহিন, জীবনে এইরকম সময় খুব কম আসে।
-মানে? মনে হচ্ছে, তুমি ভিক্টোরিয়া ক্রস পেয়েছ।
