কাল্লু কোথা থেকে এক দস্তানগোকে ধরে নিয়ে এল। ও তো শিকারি বাঘের মতো কিস্সা বলিয়েদের খোঁজে থাকত। আমি আর কাল্লু তার কাছে কিস্সা শুনতে বসলুম। মওলা রুমির মসনবি থেকে, আহা কী স্বর্গীয় কিস্সাই যে সে শোনাল আমাদের। মন দিয়ে শুনুন ভাইজানেরা।
দ্বিতীয় খলিফা ওমরের সময়ের কথা বলছি। মদিনায় তখন তসলিম নামে একজন গায়ক। থাকতেন। শুধু গানই নয়, রবাব বাজানোতেও তিনি ছিলেন উস্তাদ। লোকে বলত, তার গান শুনে নাকি বুলবুলও নাকি লজ্জা পেতে, মৃতরাও কবরে উঠে বসত। উঁচু-নীচু, সবরকমের মানুষের সঙ্গেই ভাব -ভালবাসা ছিল তাঁর। তসলিম যেখানেই যেতেন, কত যে মানুষ তার পিছনে পিছনে যেত; যেন তসলিম ছাড়া তাদের জীবনে আর কেউ নেই।
তসলিমের বয়স বাড়তে লাগল, কণ্ঠস্বর আর আগের মতো রইল না, আঙুলও সুরঝঙ্কার তোলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে লাগল। একসময় তার গলা শুনে মদিনার লোকজনদের মনে হতে লাগল, যেন গাধা ডাকছে। তসলিম যখন সত্তর বছরে পৌঁছলেন, তখন তাঁর গান ও রবাবের শ্রোতা কেউ রইল না। তসলিম ভেবেছিলেন, তাঁর জনপ্রিয়তা আজীবন একই রকম থেকে যাবে। তাই উপার্জনের সব টাকা উড়িয়ে দিয়েছেলেন ভোগ বিলাসে। বৃদ্ধ বয়েসে তিনি ঋণগ্রস্থ। বাড়িওয়ালা তাঁকে ঘর থেকে বের করে দিল। একটা রুটি কিনে খাবার মত পয়সাও তার ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, ছেড়া তারের রবাব নিয়ে তিনি পথে-পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। একা একা নিজের সঙ্গেই কথা বলেন। আল্লা, পরম করুণাময়, আমার এই এত যন্ত্রণা পাওয়ার কথা ছিল? এক সময় সবাই তো তাঁকে খোদারই সুর সাধক মনে করত। আর খোদা তাকেই ভুলে গেলেন? এ দুনিয়ায় তা হলে কি কোনও বিচার নেই?
রাস্তায় তার দিকে কেউ ফিরেও তাকাত না। দুএকজনের সালাম আলেকুম বলে পাশ কাটিয়ে যেত। মদিনার মানুষ তখন নতুন শিল্পীর কাছে ছুটেছে। তসলিমকে দেখে মনে হত, যেন একটা খণ্ডহর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এভাবেই তিনি একদিন মদিনার বাইরে কবরস্থানে। এসে পৌঁছলেন। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত তসলিম একটা কবরের উপর গিয়ে বসলেন। এই জীবনের অর্থ কী? যে সম্মান তিনি পেয়েছেন, সবই আসলে মিথ্যে? যৌবনের খ্যাতি এখন তিক্ত স্মৃতি। আর তো তিনি গাইতে পারবেন না, রবাব বাজাতে পারবেন না। এই-ই তো তাঁর জীবনের দোজখ। তসলিমের মনে হল,নিজের প্রতিভার জন্য গর্বই কি তাঁর পাপ? খ্যাতির মোহের জন্যই কি আজকের এই শাস্তি? চারপাশের কবর তাঁকে একটা কথাই বলছিল : একমাত্র মৃত্যুই সত্য। তসলিম ভাবলেন, মৃত্যুর আগে খোদার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করবেন। কখনও তো সেভাবে আল্লার কথা ভাবেননি তিনি। কবরের ওপরেই শুয়ে পড়লেন তিনি। অনুভব করলেন, তার নীচে পড়ে আছে একজন মানুষ বা মানুষীর ঠাণ্ডা হাড়-হাড়ের কাঠামোটুকু শুধু। তাঁর চোখের অশ্রুর সঙ্গে মিশে গেল নীরব কথাগুলি। আল্লা, তুমি আমার গান কেড়ে নিয়েছ। গানই ছিল আমার শ্বাস-প্রশ্বাস, আমার রুটি। গান ছাড়া আমি কী করে বাচব? এই অধমকে তুমি অনেক দিয়েছ, আবার একসময় কেড়েও নিয়েছ। আমার তো নালিশ কিছু নেই। যা দিয়েছ, আর নিয়েছ, সবই তোমার। শুধু যেন এই যন্ত্রণাকে বহন করতে পারি। নাঙ্গা হয়ে আমি তোমার দরজায় এসে আজ দাঁড়িয়েছি। খোদা, আমাকে গ্রহণ করো। যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকি, আমি শুধু তোমার জন্যই রবাব বাজাব, তোমার জন্যই গান গাইব। অন্তত কয়েকটা পয়সা জুটিয়ে দাও, যাতে রবাবের তার কিনতে পারি। যে তোমাকে ভুলে থাকে, তাকেও তো তুমি ক্ষমা করো। আমাকেও ক্ষমা করো খোদা।
বলতে-বলতে তসলিমের প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে উড়ে গেল সেই অনন্ত বাগানে যেখানে সবসময় বসন্ত। তাঁর আত্মা যেন মধুর সাগরে ডুবে গেল। পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার কোনও বাসনাই আর রইল না। সে জগতে তো খ্যাতি-সমৃদ্ধি-উচ্চাশা কিছুই নেই। তসলিমের আত্মা ভাবল, এর চেয়ে সুখের জায়গা আর কোথায়? তখনই সে সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ভাইজানেরা, সেই আদি শব্দ,যার পাশে সব শব্দই প্রতিধ্বনি মাত্র। কণ্ঠস্বর বলল, এখানে আটকে থেকো না। এ শুধু তোমার জন্য অন্য এক অভিজ্ঞতা। এবার বেরিয়ে পড়ো।
-কোথায়? ওই দুনিয়ায় আবার ফিরে যেতে হবে? দয়া করো, কিছুতেই আমি ওখনে ফিরব না।
ঠিক সেইসময়, এই দুনিয়াতে, দরবারে বসে থাকতে থাকতে খলিফা ওমরের ঝিমুনি এসেছিল। দেখতে-দেখতে খলিফা ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে খলিফা ওমর সেই আদি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন, মদিনার কবরখানায় আমার প্রিয় একজন মানুষ শুয়ে আছে। কোষাগার থেকে সাতশো দিনার নিয়ে তাঁকে দিয়ে এসো। আর বোলো, রবাবের জন্য সে যেন তার কিনে নেয়।
ঘুম ভেঙে উঠেই খলিফা ওমর সাতশো দিনার নিয়ে কবরখানার দিকে দৌড়লেন। এক কবর থেকে আরেক কবরে ঘুরতে ঘুরতে তিনি দেখলেন থুথুরে একজন বুড়ো মানুষ একটা কবরের ওপর শুয়ে আছেন। খলিফা আরও খুঁজতে লাগলেন। শেষে তার মনে হল, আমি বুড়োর বাইরের চেহারাটাই শুধু দেখেছি। খোদার প্রিয় মানুষ হয়তো এই লোকটিই। ওমর বুড়োর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ খেয়াল করে দেখার পর তসলিমকে চিনতে পারলেন।
তসলিমের আত্মা তখনও অন্য দুনিয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন সময় একটা হাঁচির শব্দ। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে হেঁচেছিলেন খলিফা ওমর। কিন্তু তসলিমের আত্মার মনে হল, এই হাঁচিরও নিশ্চয়ই কোন অর্থ আছে। খোদার দুনিয়ায় সবই নিয়মে বাঁধা। তসলিমের আত্মা তার শরীরের ভিতরে এসে ঢুকে পড়ল। তসলিম সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলেন। খলিফাঁকে দেখে তার পা জড়িয়ে ধরলেন। হুজুর ধার বাকির জন্য আমাকে কয়েদখানায় পুরবেন না। এবারের মতো আমাকে ছেড়ে দিন।
