আরিফের জন্য শোকে ডুবে থাকার সময় তো আমাদের ছিল না। বকির আর হুসেনকে ওরা। এতিম করে দিয়ে চলে গেছে। যে জীবন দুটো রয়ে গেল, এবার তাদেরই তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বকিরকে নিয়ে গেলেন আরিফের মা। হুসেনকে আমরা দত্তক নিলুম। ওইটুকুন ছেলে, সারাক্ষণ আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে; আমি বুঝতে পারতুম, মা-বাবার কথাই ও জানতে চায়। বাপ-মা হারা ছেলে মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়ত। উমরাও সারা রাত ওর মাথার কাছে জেগে বসে থাকত। বুঝতে পারি, ওর সবসময় ভয়, হুসেনও যদি আমাদের ছেড়ে চলে যায়। বছর খানেকের মধ্যে আরিফের মা-ও মারা গেলেন। বকিরকে নিয়ে এলুম আমাদের কাছে। ওকে কোথায় ফেলে দেব বলুন? তবে দুটো বাচ্চার খেলাধুলো, কথাবার্তায় আমার মহলে প্রাণ ফিরে এল।
এর মধ্যে মিঞা কালে সাবের হাভেলি থেকে বল্লিমারোঁ মহল্লায় একটা বাড়িতে উঠে এসেছি। ১৮৫৪-তে এসে একটু পয়সাকড়ির মুখও দেখতে পেলুম। বছরে আমার রোজগার বাইশশো পঞ্চাশ টাকা। পেনশন পেতুম সাড়ে সাতশ টাকা, বাদশা দিতেন দুশো টাকা, বাদশার উত্তরাধিকারী মির্জা ফকরউদ্দিন আমাকে তাঁর উস্তাদ মেনেছিলেন, সে জন্য চারশো টাকা। আর অওধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের জন্য কসীদা লিখে পাঠিয়েছিলুম বলে তিনি আমাকে বছরে পাঁচশো টাকা মঞ্জুর করলেন। ওই বছরেরই শেষে বাদশার উস্তাদ কবি জওকের মৃত্যু হল। কবি মোমিন খাঁও তখন আর বেঁচে নেই। মোমিন খাঁ-র একটা শের শুনুন, ভাইজানেরা :
তুম মেরে পাস হোতে হো গয়া
যব কোই দুসরাঁ নহীঁ হোতা।
(মনে হয় যেন আমার পাশে থাকো তুমি
যখন আর কেউ থাকে না।)
কেয়াবাৎ! এই শেরটা শুনে মোমিন খাঁকে বলেছিলুম, মিঞা, এই শেরটা আমাকে দিয়ে দিন, বদলে আমার পুরো দিবান নিয়ে নিন।
জওক মারা গেলেন, মোমিন খাঁ নেই, জাঁহাপনাকে অগত্যা এই ব্যাঙকেই গিলতে হল। বাদশা আমাকে শায়র-উল-মুলক পদে বরণ করলেন। আমি জানতুম জওক সাবের মতো মালিক-উশ শুয়ারা উপাধি আমার জুটবে না। তা নিয়ে আমার তেমন মাথা ব্যাথাও ছিল না। কিন্তু বাদশা টাকার অঙ্কও বাড়ালেন না। এদিকে বাদশার উস্তাদ হয়ে তাঁর গজলও আমাকে সংশোধন করে দিতে হবে। এই কাজটা আমার কোন দিনই ভাল লাগত না। কবিতার কোন সংশোধন হয়? যা লেখা হল, তা কবিতা, নয়তো কবিতা নয়। সংশোধন করে তো গাধাকে ঘোড়া বানানো যায়। না। তবু চাকরি বলে কথা। একদিন দেওয়ান-ই-আমে নাজির হুসেন মির্জার সাথে বসে গল্প করছি। নাজিরসাব হলেন বাদশার দেওয়ান। একজন রক্ষী এসে বলল, বাদশা তাঁর। গজলগুলো দেখতে চাইছেন। আমি কাল্লুকে বললুম, যা পালকি থেকে কাপড়ের পোঁটলাটা নিয়ে আয়। তো পোঁটলা এল, আমি সেটা খুলে আট-নটা কাগজ বার করলুম, বাদশার অর্ধেক লেখা সব শের। প্রত্যেকটার বাকি অর্ধেক আমি লিখে রক্ষীর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিলুম।
নাজিরসাব বললেন, এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল?
-এ আর এমন কী কাজ! জাঁহাপনা খুশ হয়ে যাবেন। কবিতার সংশোধন, বইয়ের ভূমিকা লিখে দেওয়া, এসব কাজ যে কত ঘেন্নার সঙ্গে করতে হয়েছে, মান্টোভাই। ও কি কোনও কবির কাজ? যাদের সব পণ্ড হয়ে গেছে, তারা এইসব করুক গিয়ে। হরগোপাল তক্তা ছিল আমার এক শার্গিদ, দোস্তও বটে। সেকান্দ্রাবাদে থাকত। ওর কতো যে ফারসি কবিতা আমাকে সংশোধন করে দিতে হয়েছে। ওর দিবানের ভূমিকাও লিখে দিয়েছিলুম। পড়ে তক্তা খুব রেগে গিয়েছিল; ওর মনে হয়েছিল, আমি নাকি প্রশংসার আড়ালে ওর কবিতা নিয়ে ব্যাঙ্গ করেছি। আমি আর কী বলব, বলুন? চিঠিতে লিখেছিলুম, তুমি আমার শত্রু নও, প্রতিদ্বন্দ্বীও নও। আমার বন্ধু এবং নিজেকে আমার শার্গিদ মনে করো। প্রশংসার আড়ালে আমি তোমাকে নিয়ে মজা করব? এত দূর হীন মনে করো আমাকে? কিছুদিন বাদে আবার একটা দিবান প্রকাশ করার জন্য উঠে পড়ে লাগল তাস্তা। অনুরোধ এল আমাকে ভূমিকা লিখে দিতে। এবার সত্যিই বিরক্ত হলুম। সোজাসুজি ওকে লিখলুম, তুমি খুব সহজে দিবান লিখতে পারো ঠিকই, কিন্তু আমি ত সহজে ভূমিকা লিখতে পারি না। কবিতাকে ভালবাসলে শুধু লিখে যাও, ছাপানোর জন্য অত তাড়াহুড়ো করো না। ধৈর্য ধরো। না হলে দ্বিতীয় দিন ছাপা হলেই তুমি তৃতীয়টার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেবে। এত ভূমিকা তো আমার পক্ষে লেখা সম্ভব হবে না। আমি এই বয়েসে আমার পথ থেকে সরে আসতে পারব না । প্রতি বছর তুমি দিবান লিখলে আমাকে ভূমিকা লিখে দিতে হবে? এইসব ফালতু লেখা আমি আর লিখব না। তারপর তক্তা আমাকে অনেকদিন চিঠি লেখে নি। এরা কী মনে করে, মান্টোভাই? কবিতার মতো গদ্য লেখাও খুবই কঠিন কাজ। আমার ওই বয়েসে কারও সঙ্গে সমঝোতা করার কথা আমি ভাবতেও পারতুম না। আবুল ফজলের আইন-ই আকবরি সম্পাদনা করার সময় সৈয়দ আহমদ খান আমাকে একটা ভূমিকা লিখতে বলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার খুবই দোস্তি ছিল। অতবড় দার্শনিক, নেতা। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, এই নতুন সময়ে আইন-ই আকবরি-র কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই। তার ওপর আবুল ফজলের গদ্যশৈলী আমার একেবারেই না -পসন্দ ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাস সম্পর্কে আমার কোন আগ্রহই ছিল না। তো, আমি ভূমিকা হিসাবে একটা কবিতা লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলুম। তাতে আইন-ই-আকবরি নতুন সময়ে কতটা অসাড়, সে কথাই লিখেছিলুম। সৈয়দ সাবের পছন্দ হয় নি। কবিতাটি তিনি ছাপেনওনি। এজন্য আমি কী করতে পারি বলুন? বন্ধু বলেই তার সব কাজের প্রশংসা করতে হবে, এমনটা তো আমার ধাতে ছিল না। তাই ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছিলুম আর তা মেনেও নিয়েছিলুম। নতুন কিছু আর কী-ই বা ঘটতে পারে জীবনে?
