-আমি লিখতে পারব, মির্জাসাব?
-খোদা চাইলে পারবে।
আরিফকে একদিন না দেখলে অস্থির হয়ে উঠতুম, মান্টোভাই। তাই একদিন বললুম, তুমি আমার বাড়িতে এসেই থাকো। আরিফ এককথায় রাজি। আকাশের মতো মন ছিল ওর। বিবি আর দুই ছেলেকে নিয়ে আমার বাড়িতে এসেই উঠল। উমরাও বেগমও আনন্দে আত্মহারা। ছেলে, ছেলের বউ, নাতিরা এসেছে। অনেকদিন বড় একা একা কাটিয়েছি, মান্টোভাই। ওরা এসে আমাদের ঘর রংদার বানিয়ে দিল। বাচ্চা দুটোর কিচিরমিচির শুনতে-শুনতে মনে হত, একটা বাগনই যেন আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। পাখিরা গান গাইছে। ফুলের খুশবু পেতে লাগলুম। জীবন যদি এইরকম উৎসব না হয়, তবে আর বাঁচা কেন? আমার রোজগারে তো এত মানুষের ভরণপোষন সম্ভব নয়, তবু কষ্ট করে এতজন একসঙ্গে থাকার আনন্দও তো আলাদা। উমরাও খুব খুশি হয়েছিল বুঝতে পেরেছিলুম, ওর ওই খুশিটুকু আমি কেড়ে নিতে চাইনি। তার চেয়েও বড় কথা, আরিফকে তো আমার নিজের ছেলে বলেই মনে হত। ওর নাম কাগজে লিখতে গেলে আমার আঙুলে ধরা কলম যেন আনন্দে নেচে উঠত।
ওর শরীরের অবস্থা একেবারেই ভাল ছিল না। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়ত-জ্বর, কাশি। তারপর একদিন বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতাই রইল না। হাকিম এসে দেখে বললেন, ওর রু আ মানে যক্ষা হয়েছে। মুখ দিয়ে জলের মত রক্ত বেরোতে লাগল। আমরা ভেবেছিলাম ওর দিন শেষ হয়ে এসেছে। এদিকে ওর বিবিও একই অসুখে ভুগছিল। আরিফের আগেই চলে গেল মেয়েটা। আরিফ তারপর আর মাস চারেক বেঁচেছিল। ওর দিকে তাকানো যেত না, মান্টোভাই। যেন একটা কঙ্কাল বিছানায় শুয়ে আছে। উমরাও বেগম তো সবসময় তার বিছানার পাশে আর খোদার কাছে দোয়া মাঙে। একদিন আমার হাত আঁকড়ে শিশুর মতো কাঁদতে লাগল উমরাও, আমি যাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই, সে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যায় কেন মির্জাসাব? এর তো কোনও উত্তর হয় না। খোদা কী খেলা খেলবেন আমাদের মতো ছায়াপুতুলদের নিয়ে, তা তিনিই জানেন। আরিফ চলে গেল, ওরা রেখে গেল দুটো ছোট্ট বাচ্চাকে। বকিরের বয়স তখন পাঁচ, আর হুসেন দুই।
আমার মহল একেবারে অন্ধকার হয়ে গেল। নিজের কুঠুরিতে একা-একা বসে থাকতুম, কোথাও যেতে ইচ্ছে করত না। তবে দরবারে তো যেতেই হবে। বাদশার চাকর কি না। আরিফের মৃত্যু একদিন ফুটে উঠল গজল হয়ে, মান্টোভাই। আমরা তো মৃত্যুকেই লিখি। এভাবে মৃত্যু রচনা করতে-করতে হয়তো একদিন অমৃতের পথে যাওয়া যায়। আমি অমরত্বের কথা বলছি না, মান্টোভাই; নিজেকে মুছতে-মুছতে, মৃত্যু লিখতে লিখতে এই যে অমৃতের পথের দিকে যাওয়া, তা তো অমরত্বের জন্য নয়; আমার নাম এই দুনিয়ায় থেকে যাবে, হাজার বছর পরেও আমার গজল মানুষ পড়বে, তা আমি কখনও ভাবিনি; শুধু ভেবেছি, যে ধুলো থেকে। আল্লা আমাদের তৈরি করেছেন, আবার যেন সে-ধুলো হয়ে যেতে পারি-সে-ই আমার অমৃতের পথ।
আরিফ, বেটা আমার, তাকে ডেকে আমি বললুম:
লাজিম থা কে দেখো মেরা রাস্তা কোই দিন অওর
তহা গয়ে কিউ অব রহো, তহা কোই দিন অওর
আমাদের পথ, আরিফ বেটা আমার, কোনও একদিন গিয়ে মিলবে; একা চলে গেছে, আরও কিছুদিনের জন্য একাই থাকো।
মিট জায়েগা শর গর তিরা পাথর না ঘিসেগা
হুঁ দর পে তের নাসিয়া-ফর্শ কোই দিন অওর
তোমার কবরে মাথা ঠুকতে ঠুকতে আমার কপাল রক্তাক্ত হবে, আরিফ, তবু আমি সেই দিন-না আসা পর্যন্ত কবরের পাসেই থাকব।
আয়ে হো কাল অওর হি কহতে কি যাউঁ
মানা কে হামেশা নহীঁ আচ্ছা কোই দিন অওর
গতকাল তো এলে, আর আজই চলে যাওয়ার কথা বলছ? চিরদিন থাকবে না জানি, অন্তত কয়েকটা দিন তো থাকো।
যাতে হুয়ে কহতে হো কয়ামৎ কো মিলেঙ্গে
কেয়া খুব কেয়ামৎ কা হ্যায় গয়া কোই দিন অওর
যাওয়ার সময় বলে গেলে, কেয়ামতের দিন দেখা হবে। তোমার চলে যাওয়াই তো আমার জীবনে কেয়ামতের দিন, আরিফ।
হাঁ আয়ে ফলক -এ -পীর জবান থা অভি আরিফ
কেয়া তেরা বিগড়তা জো না মরতা কোই দিন অওর
ওগো প্রাচীন আশমান, আরফ তো যুবকই ছিল। আরও কিছুদিন ও বেঁচে থাকলে কী এমন ক্ষতি হত তোমার?
তুম মাহ্ -এ-শব্-এ-চার- দুহম্ থে মেরে ঘর কে
ফির কিউ না রহা ঘর কা ওহ্ নকশা কোই দিন অওর
তুমি আমার মহলের পূর্ণচাঁদ ছিলে আরিফ। আরও কিছুদিন কি অমন নকশা থেকে যেতে পারতে না?
নাদান হো জো কহতে হো কি কিউ জিতে হয় গালিব
কিসমত মে হয় মরনে কি তমান্না কোই দিন অওর
বোকারা শুধোয়, গালিব এখনও বেঁচে আছে কেন? আমার ভাগ্য এমনই যে আরও কিছুদিন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে যেতে হবে।
হ্যাঁ, মান্টোভাই, আমাকে তো সব দেখে যেতেই হবে, সব ক্ষতচিহ্ন শরীরে বহন করতে হবে; খোদা তো আমাকে ফকিরির পথে যেতে দেননি; আমার সব প্রার্থনা না-জায়েজ হয়ে গেছে। শুধু মাঝে মাঝে আমার সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে পূর্ণতায় ভরে গেছে মন। সেইটুকু আমার খোদাকে পাওয়া। আরিফের জন্য ওই গজলটা লেখার অনেকদিন পর আমি বুঝতে পেরেছিলুম উর্দু গজলে এমনটা আর কখনও হয় নি। কেন জানেন? আমার সময়ে কবি আনিস, দবীর-রা দীর্ঘ মার্সিয়া লিখে গেছেন। সেসব শোকগাথার বিষয় ছিল কারবালা-হুসেন ও তাঁর পরিবারের শহাদৎ। কারবালা ছাড়া মার্সিয়া লেখার কথা কেউ ভাবতেই পারত না। সেই প্রথম, আরিফের জন্য লেখা উর্দু গজলে মার্সিয়ার সুর ফুটে উঠল। এ-সব তো আমি ভেবে করিনি। কীভাবে যে হয়ে গেছে। শুধু কারবালা? প্রিয়জনের জন্য আমরা শোকগাথা লিখব না?
