-খোদা কসম, নূরজাহান বেগম মেরা জান হ্যায়।
-তার জন্য জান দিয়ে দিতে পারো?
-ছোটা সা চিজ।
-মহিওয়ালের মতো নিজের মাংস কেটে দিতে পারবে?
নাপিত সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুর বার করে বন্ধুর হাতে দিয়ে বলল, যে কোনও জায়গা থেকে গোস্ত কেটে নাও।
বন্ধুও ভারি আজিব আদমি। নাপিতের হাত থেকে মাংস কেটে ফেলল। রক্তাক্ত হাত দেখে সে নিজেই পালাল। নাপিত অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান ফিরতেই তার মুখে একটাই নাম, নূরজাহান। সে এক আজিব দুনিয়া ছিল, ভাইজানেরা। ইশক, খুন,রক্তপাত-এই না হলে জীবন?
জীবনকে একেবারে খুল্লামখুল্লা উপভোগ করেছিল আমার বন্ধু শ্যাম। আমি তখন পাকিস্থানে। শ্যাম একটা চিঠিতে লিখেছিল, আমি মানুষকে ঘেন্না করি। এভাবেই জীবন যাচ্ছে। এই জীবনটাই আমার প্রেমিকা, যাকে আমি হাড়েমজ্জায় ভালবাসি। শ্যাম ছিল অদ্ভুত মানুষ। সভা সমিতিতে যারা পাজামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরে ভালোমানুষ সেজে বসে থাকে শ্যাম তাদের বলত জোকার। মদ খেয়ে জীবন নিয়ে কেউ বড় বড় কথা বললে খিস্তির বন্যা বইয়ে দিত সে। টাকা আর খ্যাতি পাওয়ার জন্য অনেক লড়াই করতে হয়েছিল শ্যামকে। টুটাফাটা অবস্থায় হাতে পয়সা নিয়ে হাসতে হাসতে বলত, দোস্ত আর কত কষ্ট দেবে? একদিন না একদিন আমার পকেটে তোমাকে আসতেই হবে। বাড়ি, গাড়ি, খ্যাতি-সবই হয়েছিল শ্যামের। শ্যাম কখনও আমাকে ভোলেনি।
পাকিস্থানে এসে তখন আমার ল্যাজে গোবরে অবস্থা। সিনেমা প্রায় তৈরিই হয় না বলতে গেলে, কার জন্য গল্প লিখব, এদিকে ঠাণ্ডা গোস্ত গল্প লেখার জন্য মামলায় জেরবার। আদালত আমাকে তিনমাস সশ্রম কারাদণ্ড ও তিনশো টাকা জরিমানা শাস্তি দিয়েছে। মন একেবারে বিষিয়ে গেছে। বারে বারেই মনে হচ্ছিল, এতদিন যা লিখেছি, সব পুড়িয়ে ফেলব। এর চেয়ে কোন অফিসে কেরানিগিরি করব। বউ-বাচ্চারা তো বাঁচবে। দিনে দিনে মদ খাওয়া বেড়ে যাচ্ছিল। একদিন তাহসিন পিকচার্স –এর মালিকের চিঠি পেলাম। তাড়াতাড়ি দেখা করুন। বম্বে থেকে একটা চিঠি এসেছে। আমি পাকিস্থানে, আমাকে বম্বে থেকে কে চিঠি পাঠাবে? তবু গেলাম। শ্যামের চিঠি। সঙ্গে পাঁচশো টাকা। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মির্জাসাব। ও কী করে জানল, আমার খুব টাকার দরকার। অনেকবার ওকে চিঠি লেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সব ছিঁড়ে ফেলেছি।
শ্যামকে ধন্যবাদ দেওয়া কি মানায়? ও নিশ্চয়ই তা হলে লিখত, মান্টো এই তোমার উত্তর? শ্যাম একবার একটা অনুষ্ঠানে লাহোরে এসেছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে দেখার জন্য দৌড়লাম। গাড়ি থেকে শ্যাম আমাকে দেখতে পেয়েছিল, হাত নাড়ল, ড্রাইভারকে থামাতে বলল। কিন্তু ওর ভক্তদের ভিড় এড়াতে ড্রাইভার গাড়ি থামাতে পারল না। হলের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে ওর সঙ্গে দেখা করলাম। বললাম রাতে তোমার হোটেলে যাব।
হোটেলে আমি বহিরাগতদের মতোই বসে ছিলাম। ভক্তদের ভিড় ঠেলে শ্যামের কাছে পৌঁছতে ইচ্ছে করছিল না। শ্যাম একসময় এসে আমাকে বলল, সবাই হিরামন্ডি যাচ্ছে। তুমিও চলো। আমার সঙ্গে।
-না
-কেন?
-আমি যাব না, তুমি গেলে যাও।
-তাহলে আমার জন্য অপেক্ষা করো। আমি এই এলাম বলে। শ্যাম চলে গেল। আমিও বাড়িতে ফিরে এলাম। আমি জানি, শ্যাম আর আমি এখন অনেক দূরের মানুষ। যেমন হিন্দুস্থান আর পাকিস্থান। আমরা আর কেউ কারও বন্ধু নই। যেভাবে আমি পাকিস্থানে চলে আসার পর ইসমত আর আমার কোনও চিঠির উত্তর দেয় নি। উত্তর দিলেই বা আর কী হত?
৫. জীবনটাকে একেবারে শূণ্য করে
করেঁ কেয়া কেহ্ দিলভী তো মজবুর হয়।
জমীন সখত হয়, আসমা দূর হয়।।
(কবর কী, হৃদয়ের কি কোনও স্বাধীনতা আছে?
মাটি কঠিন, আকাশ দূর।।)
একেকজন মানুষ কয়েক দিনের জন্য এসে জীবনটাকে একেবারে শূণ্য করে দিয়ে চলে যায়। বুকের ভেতরে ধূ-ধূ করে কারবালা। আরিফ আমাকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেল। সেই প্রথম বুঝলুম, অন্য সব প্রবৃত্তির মতো সন্তানস্নেহও মানুষের কত গভীরে লুকিয়ে থাকে। সন্তানস্নেহ যে অনুভব করেনি, তার জীবনে একটা বড় জায়গা অন্ধকারেই থেকে যায়। যে মোমবাতি আমার ঘর আলো করে, আরিফ ছিল তার শিখা, মান্টোভাই।
উমরাও বেগমের বোনের ছেলে আরিফ; ওর আসল নাম জৈন-উল-আবিদিন খাঁ। আরিফ ওর তখঙ্কুশ। ও আর ওর দোস্ত গুলাম হুসেন খাঁ মাহব রোজ আমার কাছে আসত। একের পর। এক প্রশ্ন, গজল নিয়ে। আরিফের কল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ। মনে হত, হ্যাঁ, আরিফই আমার একমাত্র ছেলে হতে পারে। আমি তো মুশায়েরায় যেতে চাইতুম না। ওই বাচ্চা ছেলে দুটো এসে আমাকে জোড় করে নিয়ে যেত। আরিফ মাঝে মাঝে আমাকে জিজ্ঞেস করত, আপনি মুশায়েরায় যেতে চান না কেন, মির্জাসাব?
-আমি বজম-এর বাইরের লোক আরিফ।
-কেন এমন মনে করেন নিজেকে?
-আমি তো পথে-পথেই সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছি। মজলিসে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি সবসময় পথের পাশেই বসে থাকতে চেয়েছি। তবু সেখান থেকেও আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
-কেন মির্জাসাব?
-পাগলকে কে না ভয় পায় বলো? গজল লিখতে লিখতে তুমি একদিন বুঝতে পারবে, শব্দের জান্-কে ছুঁতে হলে ভেতর থেকে একেবারে ফকির হয়ে যেতে হবে। কেউ তোমার পাশে থাকবে না আরিফ। প্রিয়জনরা তোমার মুখে থুতু ছিটোবে। আর সেদিন তুমি বুঝতে পারবে গুগু শব্দটার অর্থ। কাকে বলে আশিকের সঙ্গে প্রেমালাপ। কত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ওই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে।
