এরা সব আশ্চর্য মেয়ে, ভাইজানেরা। পরিরানি নাসিম বানুর কথা কি আমি কোনদিন ভুলতে পারব? কী চোখ তার। যেন সরোবরে ফুটে ওঠা দুটো পদ্ম। বেগম সিনেমার গল্প লেখার সময় আমি নাসিমকে কাছ থেকে দেখেছিলাম। নাসিমের বাড়িতে বসে আমি আর এস মুখার্জি গল্পটা নিয়ে আলোচনা করতাম, গল্পের অদলবদল করতাম। আমরা ভেবেছিলাম নাসিম না জানি কত বড় বাড়িতে থাকে। ওর পোরবন্দর রোডের বাড়িটা একেবারেই সেকেলে ধরনের, দেওয়ালে পলেস্তারা খসা, জানলার খড়খড়ি টুটফুটা। ঘরে সাধারণ কিছু আসবাবপত্র, সবই ভাড়া করা। একদিন দেখি সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গোয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করছে। গোয়ালা নাকি আধ সের দুধের হেরফের করেছে। আমি তো অবাক। যে নাসিমের জন্য লোকজন দুধের নহর বইয়ে দিতে পারে, সে আধ সের দুধের জন্য গোয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করে? পুকার-এর নূরজাহান আসলে এইরকম? কেনই বা হবে না? আমাদের সবার ভিতরেই তো খড়ের একটা কাঠামো আছে। একেক সময় তা বেরিয়ে পড়ে।
সিনেমার লোকেরা এই খড়ের কাঠামোটা সবসময় ঢেকে রাখতে চায়, ভাইজানেরা। নাসিম বেশির ভাগ সময় গোলাপি রঙের পোশাক পরত। গোলাপি তো বড় মারাত্মক রং, চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। নাসিম যেন সেটাই চাইত। তবে ধাঁধা লাগানোর মতো ব্যাপারও ওর মধ্যে ছিল। গোলাপের পাপড়ির মতো অমন ত্বক আর কারও দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না।
গয়না, আতর, সেন্টের প্রতি নাসিমের তীব্র আকর্ষেণের পাশাপাশি দেখেছি অন্য এক অনুরাগ, তার বাবার প্রতি। ওর ভ্যানিটি ব্যাগে সবসময় বাবার ছবি থাকত। আমি একবার লুকিয়ে ছবিটা দেখেছিলাম। আমার একটা বদভ্যাস ছিল, মির্জাসাব। চুরি করে মেয়েদের ব্যাগ দেখা। এভাবেই একদিন ওর ব্যাগ দেখছিলাম আর তখনই নাসিম এসে হাজির।
-এ কী করছেন, মান্টোসাব?
-মাফ কিজিয়ে, এটা আমার খুব বাজে অভ্যাস। তবু নিজেকে ধরে রাখতে পারি না।
নাসিম হেসে ফেলল।-মেয়েদের দিল লুকিয়ে দেখার অভ্যাস নেই, এটাই বাঁচোয়া।
-ও আমি এমনিতেই দেখতে পাই।
-মেয়েদের দিল?
-হুঁ।
-আমার হৃদয়ে কী আছে বলুন তো?
-একটা গোলাপি ওড়না উড়ছে।
-ভারি মজার আপনি, মান্টোসাব।
-কিন্তু ফটোটা কার?
-কেন? আমার আব্বাজানের। শধু ওই শব্দটা আব্বাজান-উচ্চারণ করতেই ও যেন শৈশবের শিশিরভেজা দিনগুলোতে ফিরে গেল। আমি দেখতে পেলাম, কী গভীর টান-ভালবাসা ফুটে উঠেছে ওর মুখে।
বেগম-এর গল্প লেখার সময় এস মুখার্জির সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে প্রায় রাত দুটো হয়ে গেল। সেদিন আমার সঙ্গে শফিয়াও ছিল। আমরা যাবার জন্য পা বাড়াতেই নাসিম বলল, এটা যাবার সময়? আজ এখানেই থেকে যান।
-কোনও অসুবিধা হবে না। সাড়ে তিনটেয় ট্রেন আছে। প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করতে করতেই ট্রেন এসে যাবে।
কিন্তু নাসিম আর ওর বর এহসান কিছুতেই ছাড়বে না। অগত্যা থেকে যেতে হল। শফিয়াকে নিয়ে নাসিম শোবার ঘরে চলে গেল। আমি আর এহসান বারান্দাতেই শুয়ে পড়লাম।
পরদিন শফিয়ার মুখ থেকে এক অন্য নাসিমের ছবি দেখতে পেলাম, ভাইজানেরা। শোবার ঘরে ঢুকেই পালঙ্কে নতুন চাদর বিছিয়ে দিল নাসিম। তারপর একটা শোয়ার পোষাক বার করে শফিয়াকে বলল, এটা পরে নাও। একেবারে নতুন। তারপর শুয়ে পড়ো।
-তুমি?
-আমার কয়েকটা কাজ বাকি আছে।
নাসিম কাপড় বদলে মুখের মেকাপ ধুয়ে এল। শফিয়া ওর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, এ কী চেহারা তোমার নাসিম? তুমি তো একেবারে শ্যামলা। তা হলে..?
-সব সাজের বাহার শফিয়া। নইলে আমিও তো একটা বাজে মেয়ের মতোই। নাসিম তারপর নানারকম তেল মালিশ করল মুখে। অজু করে পড়তে শুরু করল কোরান শরিফ। শফিয়া মুখ ফস্কে বলে ফেলেছিল, নাসিম, তুমি তো আমাদের চেয়েও অনেক ভালো মেয়ে। নাসিম কোন উত্তর দেয় নি; আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিল।
এইরকম ছেঁড়া ছেড়া কতজনকে যে মনে পড়ে, মির্জাসাব। আমি কী কোনদিন ভুলতে পারব নূরজাহানের কণ্ঠস্বর? সবাই তার সৌন্দর্যের কথা বলত, কিন্তু তার রূপ আমাকে কোনওদিন ছুঁতে পারেনি। শুধু কণ্ঠস্বর। নূরজাহান মানেই, আমার কাছে আকাশপথে ভেসে যাওয়া একটা পুকার। অমন দরাজ গলা, অপূর্ব খরজ, তীব্র শাণিত পঞ্চম আমি আর কখনও শুনিনি, মির্জাসাব। বাজিকররা যেমন শূণ্যে দড়ির ওপর স্থির হয়ে থাকতে পারে, নূরজাহানের তানও সেইরকম-ঘন্টাখানেক তো সে ধরে রাখতেই পারত। তবে কী জানেন, খোদা যাদের দয়া করেন, তারাই সবচেয়ে বেশী অপচয় করে। মদে গলা নষ্ট হয়ে যায় আর সায়গল সাব মদ ছাড়া এক পাও চলতে পারতেন না। টক আর তেলেভাজায় গলার ক্ষতি হয়, আর নূরজাহান এক পোয়া তেলের আচার একবারে খেয়ে ফেলত। মাঝে মাঝে মনে হয়, খোদার সঙ্গে টক্কর দিতেই সায়গল-নূরজাহানদের জন্ম। এই গ্রহ যতদিন থাকবে, মির্জাসাব, নূরজাহানের কণ্ঠস্বরও ততদিন থেকে যাবে।
নূরজাহানের কত যে প্রেমিক ছিল, তার ঠিকঠিকানা নেই। রইস আদমিদের কথা বাদ দিন, কত হোটেলের বাবুর্চিকে জানি, তারা নূরজাহানের ছবি উনুনের ধারে লটকে ওর গাওয়া গান বেসুরো গলায় গাইতে গাইতে সাহেব-মেমদের জন্য রান্না করত। নূরজাহানের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার সময় রফিক আমাকে বলেছিল, এ হল নূর, নুর-এ-জাঁহা। খোদার কসম এমন গলা পেয়েছে যে বেহস্তের হুরও যদি শোনে তা হলে আকাশ থেকে নীচে নেমে আসবে। রফিক আলাপ করিয়ে দেওয়ার আগেই আমি নূরজাহানকে জান-মন দিয়ে চিনতাম, শুধু ওর গলার জন্য। নূরজাহানের এক প্রেমিক ছিল নাপিত। তার মুখে সবসময় নূরজাহানের কথা আর ওর গান। একদিন নাপিতের দোস্ত তাঁকে জিজ্ঞেস করল, তুমি সত্যিই নূরজাহানকে ভালবাস?
