-আরে মান্টো, কেমন আছ?
-আমি তো ভালই। আপনার এই হাল কেন? কী হয়েছে?
অরোরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসল। -সিতারা, মান্টো, সিতারা। সব সিতারার জন্য।
আল-নাসির এসেছিলেন দেরাদুন থেকে নায়ক হবে বলে। দেখতে-শুনতে ভাল, পুরুষালি চেহারা। সুযোগও পেয়ে গেল একটা ছবিতে আরা সেই সিনেমাটায় সিতারাও অভিনয় করছিল। আল-নাসির এক্কেবারে বাঘিনীর মুখে গিয়ে পড়ল। এমন ভাববেন না ভাইজানেরা যে, সিতারা এক প্রেমিক ছেড়ে আর এক প্রেমিক ধরত। সবাইকে ও একসঙ্গে ধরে রাখত; দেশাই, অরোরা, মেহবুব, আল-নাসির, আরও কত যে ছিল, হিসেব নেই। বম্বেতে ফিরে এসে আল নাসিরের অবস্থাও আমি দেখেছিলাম। তার রং ছিল একেবারে গোলাপি, তা ছাইয়ের মতো পোড়া-পোড়া হয়ে গেছে। অমন সুন্দর চেহারাও ভাঙাচোরা, যেন ওর শরীরের সব রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। আল-নাসিরও একই কথা বলেছিল, সিতারা, মান্টোসিতারা, সব সিতারার জন্য
-কেন, ও কী করেছে?
-ও একটা ভ্যাম্পায়ার মান্টো। আমাকে ছিবড়ে করে দিয়েছে। ওর কাছ থেকে বেরোতে না পারলে আমি শেষ হয়ে যাব।
আল-নাসির তারপর দেরাদুন পালাল। তিনমাস সেখানে এক স্যানিটোরিয়ামে থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরেছিল।
এরপর সিতারা এক আশ্চর্য কাণ্ড করেছিল। আরে লাখে এইরকম একটা মেয়ে হয়, বলছি না ভাইজানেরা। যেন একটা অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গেরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সিতারা এবার ফাঁসাল নাজির সাবকে। নাজির সাবের প্রেমিকা জেসমিন তখন তাঁকে ছেড়ে গেছে। সোসাইটি সিনেমায় নাজির সাব সিতারাকে নিয়েছিলেন। আর অমনি সিতারার জালে আটকে গেলেন। খুব সোজা সাপ্টা, দিলখোলা মানুষ নাজির সাব। যাকে পছন্দ করতেন,তাকে খিস্তি দিতে দিতে বুকে টেনে নিতেন। সিতারার সঙ্গে তার সম্পর্ক বেশ কয়েক বছর টিকেছিল। নাজির সাবের ব্যক্তিত্ব ছিল প্রখর, তাই সিতারা প্রথম দিকে কিছুদিন অন্য পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি। কিন্তু ওভাবে থাকা তো সিতারার মতো মেয়ের পক্ষে সম্ভব নয়, ভাইজানেরা। অরোরা, আল নাসির,মেহবুব, দেশাইয়ের কাছেও আবার যাওয়া আসা শুরু হল। নাজির সাহেব মতো। মানুষের পক্ষে তা মেনে নেওয়া সম্ভব হল না। নাজির সাব মাঝেমধ্যেই সিতারাকে পেটাতেন। সিতারা যেন সেই মারের মধ্যেও এক ধরনের যৌন আনন্দ উপভোগ করত।
এবার কিস্সটা আরেকরকম ভাবে জমে উঠতে চলেছে, ভাইজানেরা। নাজির সাবের ভাইপো আসিফও একই ফ্ল্যাটে থাকত। বয়স কম হলে কী হবে, বেশ শক্তপোক্ত চেহারা, দেখতেও। সুন্দর। তখনও পর্যন্ত আসিফের জীবনে কোনও মেয়ে আসেনি। কাকার কাছ থেকে সিনেমার কাজকর্ম শেখাতেই ওর আগ্রহ। নাজির সাব আর সিতারার মধ্যে কী কাণ্ড চলছে, সে বুঝতে পারত। বন্ধ ঘর থেকে ভেসে আসা সিতারার শীৎকার ও উন্মাদনা তাকে দিনে দিনে খেপিয়ে তুলছিল। একদিন সে কী করে যেন সবটা দেখেও ফেলল। আসিফ আমাকে বলেছিল, মান্টোসাব, যেন দুটো কুকুর-কুকুরী নিজেদের ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে। সিতারার সঙ্গে কাকা পারবে কেন?
-সে এক ভয়ঙ্কর খেলা, তাই না আসিফ?
-জন্তু। মানুষ যে আসলে জন্তু, এই প্রথম বুঝতে পারলাম। আর মহব্বত কী জানেন, মান্টোসাব?
-কী
-মওতের সঙ্গে মোকাবিলা। আমিও শালা একবার এইরকম মোকাবিলা করতে চাই।
-সিতারার সঙ্গে?
-আলবৎ। একবার পাঞ্জা লড়বই মান্টোসাব। তবে কী জানেন, মেয়েছেলেটাকে দেখলেই কেমন ভয় করে।
-কেন? সিতারাকে ভয়ের কী আছে?
-মনে হয়, ওর ভেতরে জিন ঢুকে বসে আছে।
-আসিফ, বরফের মতো ঠাণ্ডা মেয়েদের থেকে সিতারা অনেক ভাল। ওর উন্মাদনার মধ্যে
জীবন আছে। লড়ে যাও। আসিফ সিতারার সঙ্গে প্রথম কথাবার্তা শুরু করল। কিন্তু ছুঁয়ে দেখার সাহস পাচ্ছিল না। কেননা কাকার মেজাজ সে জানে। অথচ কে না জানে, আসিফ একবার ইঙ্গিত করলেই সিতারা। ঝাঁপিয়ে পড়বে। আসিফ দিনে দিনে অধৈর্য হয়ে পড়ছিল। চনমনে যুবক, কতদিন নিজেকে ধরে রাখবে? নাজির সাব আস্তে আস্তে খেলাটা টের পাচ্ছিলেন। একদিন সিতারাকে বহুৎ পেটালেন, তারপর ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যেতে বললেন। সিতারা তবু গেল না। সেই রাতে রাগে গরগর করতে করতে নাজির সাব তাঁর অফিস ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। আসিফ দেখল এই সুযোগ। সে সিতারার ঘরে গিয়ে তার ব্যাথার জায়গায় হাত বোলাতে শুরু করল। ব্যস, কেল্লা ফতে। মৃত্যুর সঙ্গে আসিফের মোকাবিলা হয়ে গেল। তারপর জিনিসপত্র গুছিয়ে সে সিতারাকে পৌঁছে দিল দাদারের ফ্ল্যাটে। ওখানে সিতারার নিজের একটা ফ্ল্যাট ছিল। আসিফের সঙ্গে শুরু হল সিতারার নতুন প্রণয়পর্ব। সেদিনই আসিফ সিতারাকে বলেছিল, আমাদের সম্পর্কটা অনেক গভীর সিতারা। তুমি আর কারও কাছে যেও না। শুধু আমার কাছেই থেকো।
-মেরি জান, আমি এতদিন ধরে তোমাকেই খুঁজেছি। বিশ্বাস করো, সিতারা আজ থেকে আর কারুর দিকে তাকাবে না।
-না হলে আমি পাগল হয়ে যাব।
-কথা দিলাম।
সিতারা আসিফকে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে তুলল।
পরদিন আসবে বলে আসিফ ফিরে গেল। সিতারা তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসল। নতুন করে সাজল। শাড়ি বদলাল। রাস্তায় এসে ট্যাক্সি ধরে ড্রাইভারকে অরোরার ঠিকানায় নিয়ে যেতে বলল। আচ্ছা মির্জাসাব, আপনার কী মনে হয়, এই মেয়েটা সারাজীবন শুধু যৌনখিদের পিছনে দৌড়েছে? আমি এক গভীর অসহয়তা দেখতে পাই। একই অসহায়তা দেখতে পেয়েছিলাম সৌগন্ধীর মধ্যে। মধু তাঁকে শুষে খাচ্ছিল। তারপর একদিন মধুকে তাড়িয়ে দিয়ে সৌগন্ধী তার পোষা রাস্তার কুকুরটাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। সিতারা আমাকে একেবারে সহ্য করতে পারত না। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম ও যেন একদিন সৌগন্ধীর মতো ঘুমিয়ে পড়তে পারে।
