সত্যি বলতে কী মান্টোভাই, সেহ্রার শেষ দুই পংক্তিতে আমি কাউকে আঘাত করতে চাইনি। তবু আমাকে ক্ষমা চেয়ে জাঁহাপনার কাছে কবিতা পাঠাতে হল। এছাড়া আর কীই বা করার ছিল বলুন? এই সমাজের চোখে কবি তো ভিখারিরও অধম। আমাকে বেশীর ভাগ মানুষ পছন্দ করত না কেন জানেন? মুশায়েরায় কেউ কবিতা পড়লেই-তা সে ভাল, খারাপ যাই হোক-সবাই হায় হায়, কেয়া বাৎ কেয়া বাৎ করত। আমি তা পারতুম না। কবিতার মর্মোদ্ধার না-করা। পর্যন্ত কারুর প্রশংসা আমি করতে পারিনি। সবাই আমার ওপর ক্ষেপে যেত। কিন্তু দেবী সরস্বতীর শুভ্রতা কবিতায় ফুটে না উঠলে, আমি কী করে প্রশংসা করব বলুন? অথচ কোনও গজল ভাল লাগলে আমার প্রশংসা বাধ মানতে চাইত না। একবার মুনশি গুলাম আলি খান দাবা খেলতে খেলতে একটা শের বললেন। ওঃ কী শের! একেবারে তিরের মতো বুকে এসে বিধল। আমি সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলুম, এটা কার শের মুনশিজি?
-জওকসাবের।
-আবার বলুন।
মুনশিজির কাছে কতবার যে আমি শেরটা শুনতে চেয়েছি। জওকসাব লিখেছিলেন, ক্লান্ত হতে। হতে মৃত্যুর কাছেই তো আমরা আশ্রয় খুঁজি। কিন্তু মৃত্যুতেও যদি শান্তি না পাওয়া যায়? মুশায়েরায় যেতে আমার একেবারেই ভাল লাগত না। কবিতা তো একা একা জন্মায়-সমুদ্রের গভীর থেকে গভীরতরে যেমন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মুক্তার জন্ম হয়।
মীর সাব একটা শের-এ যেমন লিখেছিলেন :
জুলফ্-সা পেচদার হ্যয় হর শের
হ্যায় সুখন্ মীরকা আজব ঢবকা।
(তার কেশের কুণ্ডলীর মতো আমার প্রত্যেকটা শের,
মীরের কবিতার ধরনই অদ্ভুত।)
৩৪. কবরে আজ আমাদের খুশির দিন
খুলতা কিসী-পে কিঁউ মেরে দিল-কা মুআমিল;
শেরোঁ-কে ইন্তখাব-নে রুস্বা কিয়া মুঝে।।
(কেই-বা জানতো আমার হৃদয়ের ব্যাপার;
কোন্ কুক্ষণেই যে কবি হতে গেলাম, মান-মর্যাদা সবই গেলো।)
ভাইজানেরা, কবরে আজ আমাদের খুশির দিন। আমি জানি, মির্জাসাবের কথা শুনতে শুনতে আপনাদের মন ভারী হয়ে উঠেছে; কিন্তু মনে রাখবেন, মির্জাসাবের জীবন তো একটা পাথরকে বার বার পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তোলার চেষ্টা, বার বার পাথরটা নেমে এসেছে আর মির্জাসাব তাঁকে আবার ওপরে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। জীবন কি সবসময় এভাবে পাথর বইবে? তার চেয়ে নরক গুলজার হোক। আমরা আজ গাঞ্জে ফেরেস্তে-দের কিস্সা শুনব। এরা বেশির ভাগই বম্বের সিনেমা জগতের লোকজন। পর্দার ছবিতে তাদের যেমন দেখাত, আসলে জীবন তো তেমন ছিল না। জীবন তো সিনেমার মতো সাজানো-গোছানো নয়। রোটি, আওরত আর তন্তের জন্য লড়াইয়ের নামই জীবন। দুনিয়ার সব কিস্সাও লেখা হয়েছে এই লড়াই নিয়েই। খিদে সবচেয়ে আদিম, তাই না ভাইজানেরা? খিদের কথা কেউ কখনো ভুলতে পারে না। মানুষ যবে থেকে এই দুনিয়ায় এসেছে, সেদিন থেকেই ক্ষমতার জন্য তার লোভ, নারীর জন্য তার রিরংসা। এগুলো কোনদিনই বদলায় না, ভাইজানরা। শুধু রুটি, নারী ও সিংহাসনের ওপর যখন ঘৃণা জন্মায় তখনই মানুষ আল্লার কথা ভাবে। এই তিনের চেয়ে তিনি তো আরও রহস্যময়, যাঁকে লড়াই করেও পাওয়া যায় না।
মাফ করবেন, বেশি বকবক করে ফেললাম। আপনাদের কথা দিয়েছিলাম, সিতারার কিস্সা একদিন শোনাব; গাঞ্জে ফেরেস্তেদের কথা ওকে দিয়েই শুরু করছি। ভাইজানেরা, সিতারা এক বাঘিনীর নাম, যেন একটা ঘূর্ণিঝড় ওর ভিতরে লুকিয়ে ছিল, বাইরে থেকে তাকে বোঝা যায় না। রোজ সকালে এক ঘন্টা সিতারা নাচের রেওয়াজ করত অথচ তারপর ওকে ক্লান্ত দেখিনি। সিতারা চুপচাপ বসে থাকতে পারত না, কিছু না কিছু করছেই বা করার ফন্দি আঁটছে।
সিতারার আরও দুই বোন ছিল-তারা ও অলকনন্দা। ওরা একে একে নেপালের এক গ্রাম। থেকে বম্বেতে এসেছিল নসিব বদলানোর জন্য। তবে তিন বোনের মধ্যে সিতারার কোনও তুলনা নেই। লাখে একজন এইরকম মেয়ে জন্মায়। আমার মাঝে মাঝে মনে হত, সিতারা আসলে অনেকগুলো মেয়ের নাম, নইলে অত পুরুষকে নিয়ে সে খেলত কী করে? সিতারা যেন। বম্বের পাঁচতলা কোন বাড়ি, সেখানে কত যে ফ্ল্যাট, আলোকিত, কোনওটা বা অন্ধকার। সবসময় পাতলা, ফিনফিনে মসলিন শাড়ি পরত। ফলে ওর শরীর নিয়ে কল্পনা করার কিছু ছিল না।
সিতারা বম্বেতে এসেছিল সিনেমার এক পরিচালকের হাত ধরে, তার নাম ভুলে গেছি, আমরা দেশাই বলেই ডাকতাম। ওদের বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু বেশিদিন একসঙ্গে থাকতে পারেনি। দেশাই বলত, ওই মেয়ের সঙ্গে যুঝে ওঠা আমার কম্মো নয়। সিতারা তখন অন্য কার সঙ্গে যেন থাকে, কিন্তু মাঝেমধ্যেই দেশাইয়ের কাছে আসত। তবে দেশাই তাকে বেশীদিন নিজের কাছে রাখত না। হিন্দু আইন মেনে দুজনের বিয়ে হয়েছিল তো, তাই নতুন নতুন প্রেমিক জোটালেও সিতারার পরিচয় ছিল মিসেস দেশাই।
মেহবুব সাবের কপাল তখন তুঙ্গে। সিতারাকে একটা সিনেমায় নিয়েছিলেন। মেহবুব সাবও সিতারার শিকার হয়ে গেলেন। আমাদের লাইনে তখন তাদের নিয়ে রোজই নতুন নতুন কিস্সা। মেহবুব সাবের ছবিও শেষ, সিতারাও নতুন প্রেমিক পাকড়ে ফেলল। তার নাম পি এন অরোরা। ইংল্যান্ড থেকে সিনেমার ট্রেনিং নিয়ে এসেছিল। তারপর সিতারা ঝাঁপ দিল আল নাসিরের ওপর। এর মধ্যে পি এন অরোরার একটা গল্প বলে নিই, ভাইজানেরা। আমি তখন দিল্লিতে চাকরি করি। হঠাৎ একদিন রাস্তায় অরোরাকে দেখতে পেলাম। লাঠি হাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। মনে হল, লোকটার সামান্য জীবনীশক্তিও অবশিষ্ট নেই। টাঙ্গা থামিয়ে আমি অরোরার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
