আপ কা বন্দহ্ অওর ফিরু নঙ্গা?
আপ কা নৌকর,অওর খাঁউ উধার?
মেরী তনখাহ্ কীজিয়ে মাহ্ ব মাহ্
তা না হো মুঝকো জিন্দেগী দুশওয়ার।
(আপনার ভৃত্য, নিস্ব রিক্ত?
আপনার দাস, ঋণগ্রস্থ বারোমাস?
মাসে মাসে, হোক আমার বেতন
দুরূহ না হয় যেন জীবনযাপন।)
ওই ইতিহাস আমি আর শেষ করতে পারিনি ভাইজানেরা। শুধু প্রথম খণ্ড মিহর-ই-নিমরোজই প্রকাশিত হয়েছিল। মাহ-ই-নিম্মাহ-এর কাজ এগোয়নি। হয়েছিল কী, হাকিম অক্সানউল্লা খান সাবকে জানিয়েছিলুম, আমার মতো মানুষের পক্ষে ইতিহাসে জঙ্গল ছুঁড়ে ঠিক ঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়, হৃদয়ের আলোয় আমি শুধু কবিতাই লিখতে পারি হাকিমসাব, তাই যে – তথ্যগুলো ইতিহাসে যাওয়া দরকার, সেগুলো বেছে পাঠিয়ে দিলে আমার সুবিধে হয়। তিনি কী করলেন জানেন? আদমের জন্মকাল থেকে চেঙ্গিজ খান পর্যন্ত নানা তথ্য লিখে পাঠালেন। আমি তো সাম্রাজ্যের ইতিহাস শুরু করেছিলুম তৈমুর লং থেকে। কী আর করা? যা লিখেছিলুম, তার আগে ওই অংশটা জুড়ে দিলুম। কিন্তু দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য আর তথ্য এল না। চৌষট্টি পাতার মতো লিখেছিলুম। কতবার খবর পাঠালুম পরবর্তী তথ্যগুলো পাঠানোর জন্য। একবার উত্তর এল, এখন রমজান চলছে। পরের বার জানাল, সবাই এখন ঈদের উৎসবে ব্যস্ত। ধুত্তোরি। আরে আমার কী দায় পড়েছে রাজা-বাদশার সাম্রাজ্যের ইতিহাস লেখার? ওই চৌষট্টি পাতাই পাঠিয়ে দিলাম। সে-লেখা কেল্লার কোন অন্ধকার ঘরে উইয়ে কেটেছে কে জানে! ইতিহাস তো উইয়ে কাটার জন্যই, তাই না, মান্টোভাই?
ইতিহাস লেখানো যেমন রাজাবাদশার খেয়াল, ইতিহাসকে মুছে দেওয়াও তাঁদেরই অহঙ্কার। আমরা তার সঙ্গে তাল রাখতে পারি? আর যে কবিতা লেখে? সে তো ইতিহাসের শরীরে প্রজাপতির রংচঙে দুটো ডানা লাগিয়ে দিতে চায়-উড়ক-উড়ে যাক-জন্নত, জাহান্নম, যেখানে খুশি। জাঁহাপনা বাহাদুর শাহ আমার গজল পছন্দ করতেন না, তা তো আপনাদের আগেই বলেছি। জওকসাবের শের শুনতে শুনতে তিনি হায় হায়, কেয়া বাৎ, কেয়া বাৎ বলতেন, আর আমার শের শুনে একটাই কথা, ঠিক হ্যায়। একবার বললেন, মির্জা, আপনি পড়েন খুব ভাল। মানে বুঝলেন? গজলের অর্থ যেন কিছুই নয়। তা তাঁরও তো খুব কবি হওয়ার শখ। হয়েছিল। একসময় তাঁর গজল সংশোধন করে দিতেন জওকসাব; আর জওকসাবের মৃত্যুর পর আমি। কী লিখেছেন আমাদের জাঁহাপনা? কী লেখা সম্ভব ছিল তার পক্ষে? ওইরকম। একটা কাপুরুষ-পূর্বপুরুষের টাকায় বসে বসে খাওয়া ছাড়া যার জীবনে আর কিছুই ছিল না, বেগম জিনত মহলের হাতের পুতুল, জীবনটা শুধু পরজীবী হয়ে কাটিয়ে দিলেন, তিনি লিখবেন গজল? আওরতো সে গুগু-র জন্য অনেক দম্ লাগে, মান্টোভাই।
বাদশার ছোট ছেলে মির্জা জওয়াঁ বখতের শাদির সময় এক কাণ্ড ঘটল। জওয়াঁ বখত বেগম জিনত মহলের ছেলে। ফলে বাদশার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী। খুব জাঁকজমক করে শাদি হবে। বেগমের নির্দেশে আমাকে শাদির জন্য একটা সেহ্রা-বিবাহগীতি লিখে দিতে হল। তো সেই। সেহ্রার শেষে আমি লিখেছিলুম :
হম্ সুখন্ মহিম হ্যায়, গালিব কে তরফদার নহীঁ
দেখে, ইস সহ্রে সে কহ্ দে দোই বেস্তর সেহরা।
(কবিতার মর্ম বোঝেন গালিবের তরফদার নন
লিখুন তো দেখি কেউ, সব সেরা সেহ্রা এমন।)
বাদশা ভেবে নিলেন আমি এখানে তাঁকে এবং তাঁর উস্তাদ ইব্রাহিম জওকত্সবকে অপমান। করেছি। তার মানে কী দাঁড়াল? জওকসাবকে যিনি মালিক-উশ-শুয়ারা খেতাব দিয়েছেন, তিনি যেমন কবিতা বোঝেন না, জওকসাবের পক্ষেও এমন কবিতা লেখা সম্ভব নয়। আমি চলে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলে বাদশা বললেন, একটু বসুন মির্জা। উস্তাদজিকে আসতে দিন।
-জি হুজুর।
জাঁহাপনা হঠাৎ শের বলতে শুরু করলেন :
হমসে ভী ইস বসত্ পে কম হোঙে বদ-কমর
জো চাল হম চালে, সো নিহায়ৎ বুরি চালে।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কার শের জানেন?
-না, জনাব।
-উস্তাদজির। আপনাকে দেখতে দেখেতে শেরটা মনে পড়ল।
এমন সময় জওকসাব দরবারে এসে ঢুকলেন। জাঁহাপনা উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন।
-আইয়ে আইয়ে উস্তাদজি। মির্জাসাব কেমন সেহ্রা লিখেছেন পড়ে দেখুন।
সেটা পড়ে জওকসাব আমার দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টিতে আমার প্রতি আমর্ম ঘৃণা। যেন পোকার দিকে তাকিয়ে আছেন।
জাঁহাপনা বললেন, উস্তাদজি, আপ ভি এক সেহ্রা কহ দিজিয়ে।
-বহুৎ খুব। বলেই তিনি সেহ্রা লিখতে বসে গেলেন। শেষ দুই পংক্তিতে লিখেছিলেন :
জিস্ কো দেওয়া হয় সুখন্ কা, য়ে সুনা দে উস্ কো
দেখ ইস্ তরহ্ সে কহতে হ্যাঁয় সুখবর সেহ্রা।
(শুনিয়ে দাও তাদের, কবি বলে দাবি করে যারা,
দেখো এইভাবে কবিরা লেখেন সেহ্রা)
-কেয়া বাৎ। কেয়া বাৎ। জাঁহাপনা উল্লাসে ফেটে পড়লেন। তারপর কী হল জানেন? সন্ধেবেলায় দিল্লির অলিতেগলিতে জওকসাবের সেহ্রা মাতিয়ে তুলল সবাইকে।
জাঁহাপনা এভাবেই আমাকে অপমান করতেন। তিনি পতঙ্গবাজি করতে যাবেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। কেন জানেন? অপমান, কত দূর অপমান করা যায়। মাসে মাসে যখন টাকা দিই, তুই মির্জা গালিব বা যেই হোস, আমার হারেমের একটা খোজা ছাড়া আর কী? মুশায়েরায় আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাকে বসিয়ে রাখতেন। সবশেষে বা মাঝামাঝি কোন এক সময়ে আমাকে কবিতা পড়ার জন্য ডাকা হত।
