আরে, কবিতা লেখো বা যতই ভাল ফারসি লেখো, মনে রাখতে হবে, তুমি দরবারের চাকর ছাড়া আর কিছু নও। বাদশার হারেমের খোজার চেয়ে নিজেকে বড় কিছু ভাবতে যেও না। বাদশার কাছে সবাই খোজা, মান্টোভাই। নইলে যে-লোকটা গজল লেখে, বাদশা তাঁকে কী। কাজ দিলেন? মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস লিখতে হবে ফারসিতে। বছরে এজন্য আমাকে ছশো টাকা দেওয়া হবে।
সব অপমানই আনুষ্ঠানিক। তাই দরবারি, পোশাকের সঙ্গে খেতাব দেওয়া হল আমাকে। নজম উদ-দৌল্লা, দবীর-উল-মুলক-নিজাম-জঙ্গ। এটা কোন কবির খেতাব? কিন্তু বাদসার মর্জি। তার মানে, আপনি আর কবি নন, সাম্রাজ্যের তারকা, দেশের রচনাকার ও যুদ্ধের নায়ক। আরে, কোন যুদ্ধটা আমি করতে পারি? টিকে থাকার যুদ্ধেই যে পরাজিত, সে হবে যুদ্ধের নায়ক? ঘরে ফিরে আমি খুব একচোট হেসেছিলুম; সে হাসি আর থামতেই চায় না। আমি হলুম ইতিহাসকার? সিকন্দর ও দারার গল্প আমি পরি নি, প্রেম আর মৃত্যুর কিস্সা নিয়েই তো আমার অর্ধেক জীবন কেটে গেছে। কিন্তু বাদশা চাইলে আমাকেও ইতিহাসকার হতে হবে। বছরে ছশো টাকা দেবে বলে কথা। বাদশা চাইলে আমাকে তাঁর হারেমের খোজা প্রহরীও করে দিতে পারেন।
সেদিন উমরাও বেগম আমার কাছে এল। হয়তো কাল্লুর মারফত শুনেছিল, গাধার ডাকের মতো আমার অনর্গল হাসির কথা। আমি সেদিন একটু বেশী নেশাও করেছিলুম। উমরাওকে দেখেই আমি হাসতে হাসতে বললুম, আরে, মসজিদ ছেড়ে আমার দোজখে কেন বেগম?
-আজ আপনার খুশির দিন, মির্জাসাব।
-বটেই তো। আমি নিজাম-জঙ্গ।
আবার হাসতে শুরু করলুম।
-কী হল মির্জাসাব?
-তুমি বুঝবে না বেগম।
-আমি কি আপনাকে একেবারেই বুঝি না?
-না, বেগম। তুমি একেবারেই আমাকে বোঝ না।
কতদিন পর, উমরাওকে আমার বুকের ভিতরে টেনে নিই।-বেগম, আমার আর কোনও স্বপ্ন নেই। কবিতা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। শুধু খাওয়া-পরার জন্য যে আমাকে চাকর হতে বলবে, আমি তার নোকর হতে পারি। আমি তো শুধু আসাদুল্লা খাঁ ছিলাম না, আমি গালিবও এই দুটো মানুষ আলাদা বেগম। আসাদুল্লা খাঁ দারু খেতে ভালবাসে, কাবাব -পরোটা খেতে ভালবাসে, গালিব খেতে ভালবাসে শধু শব্দ-রামধনু-লাগা শব্দ; বাদশা কিনতে পারে আসাদুল্লা খাঁ-কে, গালিবকে কেনার টাকা কোথায় তাঁর রাজকোষে? কেননা না, আমার আপস যত খুশি কেননা।
-মির্জাসাব
-বলো।
-আপনি তা হলে চাকরিটা ছেড়ে দিন।
-না, বেগম।
-কেন?
-এখন তো আর অসুবিধে নেই বেগম। গজল যাকে ছেড়ে চলে গেছে, সে এবার যা খুশি তা-ই করতে পারে। বাদশার পা টিপতে পারে, রাজনীতি করতে পারে। তুমি আমাকে না হয় কাল একটু কিমাপোলাও খাওয়াও। বেগম, এবার একটু সুখ চাই।
আমি বুঝতে পারতুম, জাঁহাপনা আমাকে একটুও পছন্দ করতেন না। শুধু কালে সাব আর অক্সানউল্লা খান সাবের জন্যই মেনে নিয়েছিলেন আমাকে। দরবারের আদব কায়দাও তো ভাল লাগত না আমার। ঈদের জন্য বাদশাকে খুশি করে কবিতা লেখো, আরও কত কত উৎসব যে লেগে থাকত, সব কিছুর জন্য কবিতা লিখে দাও। আমি ওসব লিখতে পারতুম না। মুখে মুখেই দুএকটা শের বলে দিতুম; সেসব কখনও লিখে রাখি নি। ওসব কবিতা নাকি? উৎসবের সময় তো জাঁহাপনাকে নজরানা দিতে হত; সেই টাকা বাঁচানোর জন্যই কিছু না – কিছু লিখতে হয়েছে। ওগুলো সবই গু-গোবর, মান্টোভাই, যা আমি বাদশার মুখে ছুঁড়ে মেরেছি; বাদশার সাধ্য কি শিল্পীর হারামিপনা বুঝবে? তার তো চাই শুধু প্রশস্তি। সভাকবি জওকসাবের কাছে প্রশস্তি শুনতে-শুনতে তার মজ্জায় মজ্জায় একটা কথাই ঢুকে গিয়েছিল, দুনিয়ার সব। কবিতা আসলে জাঁহাপনা বাহাদুর শাহর প্রশস্তি। সব সম্রাট এমনটাই ভাবেন। তাঁদের এই ভাবনার বিপরীতে গেলেই আপনাকে সারাজীবন লাথিঝাঁটা খেতে হবে। জাঁহাপনা আকবরকে নিয়ে ইতিহাসে কতই না প্রশস্তি ভাবুন। কিন্তু আনারকলিকে তিনি কীভাবে হত্যা করেছিলেন? তার আসল নাম ছিল নাদিরা বেগম। কেউ কেউ বলত, শরউন্নিশা বেগম। জাঁহাপনা আকবরের হারেমের অতি সুন্দরী ক্রিতদাস-কন্যা। একদিন আয়ানামহলে বসে জাঁহাপনা আকবর আয়নায় দেখতে পেলেন, আনারকলি যুবরাজ সেলিমের দিকে তাকিয়ে হাসছে। শুধু ওই হাসিটুকু হয়ে গেল আনারকলির মৃত্যুবীজ। প্রাসাদের দেওয়ালের গভীরে জীবন্ত আনারকলি হারিয়ে গেল। সব-সব সাম্রাজ্য এভাবেই মানুষকে গ্রাস করে।
সাম্রাজ্য আর ইতিহাস বড় সর্বগ্রাসী, মান্টোভাই। জাঁহাপনার আদেশে আমি ইতিহাস লিখতে শুরু করলুম। মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে দুই খণ্ডে ছকে নিলুম। প্রথমভাগে থাকবে তৈমুর লং থেকে হুমায়ুন; আর দ্বিতীয় পর্বে সম্রাট আকবর থেকে বাদশা বাহাদুর শাহ পর্যন্ত। প্রথম খণ্ডের নাম দিলুম মিহর-ই-নিমরোজ। মধ্যদিনের সূর্য। আর দ্বিতীয় খণ্ড মাহ-ই-নিম্মাহ। মধ্য মাসের চাঁদ। পুরো বইয়ের নাম হবে পরতাবি স্তান, আলোর রাজ্য।
টাকা পেতে হবে বলে কথা, তাই তাড়াতাড়ি লিখতে শুরু করলুম। কথা ছিল, ছমাস অন্তর আমাকে পারিশ্রমিকের টাকা দেওয়া হবে। তা প্রথম ছমাসে আমি জাঁহাপনা বাবরের জীবনেতিহাস লিখে ফেললুম। কিন্তু এইরকম একটা বিরক্তিকর কাজের জন্য ছমাস অন্তর টাকা পেলে চলে? আমার পারিশ্রমিক যাতে প্রতি মাসে দেওয়া হয়, সেই অনুরোধ জানিয়ে বাদশাকে একটা কবিতা লিখে পাঠিয়ে দিলুম। ঠিকই করেছিলুম মাসে-মাসে টাকা -না-দিলে ইতিহাস লেখা বন্ধ করে দেব।
