-কেন?
-জেল থেকে ছাড়া পেলেন, তাই।
আমার মাথায় তো সবসময় বদবুদ্ধি খেলে, মান্টোভাই। কালে সাহেবের দিকে তাকিয়ে হেসে। বললুম, ছাড়া পেয়েছি? কী যে বলেন মিঞা! গোরাদের জেলখানা থেকে বেরিয়ে কালে সাবের জেলখানায় এসেছি বলতে পারেন।
কালে সাব রসিক মানুষ; হা-হা করে হাসতে লাগলেন। তারপর বললেন, জাঁহাপনা কেন যে আপনাকে এতদিন দরবারে ডাকেননি, বুঝতে পারি না। আপনার রসের ছিটেফোঁটা বাদশাহর গায়ে লাগলে, তাঁর জীবনটা এমন অভিশপ্ত হত না।
-জাঁহাপনা কেন আমাকে ডাকবেন, মিঞাসাব। আমি তো খোদার কুকুর।
-মাশাল্লা! এই তো মির্জা গালিবের মতো কথা।
-কিছু ভুল বললুম?
-আপনি সেই কিস্সাটা শোনেননি? নকস্বন্দি তরিকার মুর্শিদ মওলা দরবেশ নিজেকে কুকুর বলতেন। -আপনি কিস্সাটা বলুন জনাব। শুধু তার আগে আমি একবার কাল্লুকে ডেকে পাঠাই।
-কেন?
-কিস্সা না শুনলে ওর ঘুম আসে না। আমার যেমন দারুর নেশা, ওর নেশা হয় কিস্সায়।
-বড় আজব নোকর আপনার, মির্জা।
কাল্লুকে ডেকে পাঠালুম। নতুন কিস্যা শোনার লোভে ওর চোখ দুটো চকচক করছিল; কালে সাবের সামনে বসে তাঁর পা টিপতে শুরু করে দিল। কাল্লুকে নিয়ে একটা নাম লেখা আমার। উচিৎ ছিল, মান্টোভাই; এমন কিস্সাখোর মানুষ আমি আর দেখিনি জীবনে।
কালে সাব তার কিস্স শুরু করলেন।-একদিন এক দরবেশ দরগায় বসে মুরিদদের মওলা রুমির বচন শোনাচ্ছিলেন। মওলা রুমি কী বলেছিলেন জানেন তো? মানুষকে তার জীবনে তিনটে পর্ব পেরিয়ে যেতে হয়। প্রথমে সে যে-কোনও কিছুকেই পুজো করে, পুরুষ, নারী, টাকা, শিশু, এই দুনিয়া, একটা পাথর, যাই হোক না কেন। পরের ধাপে সে আল্লার উদ্দেশ্যে। নামাজ পড়ে। আর শেষ ধাপে পৌঁছলে আল্লাই আমার সব যেমন বলে না, আবার আল্লা বলে কেউ নেই এ কথাও বলে না। এমন সময় এক মোল্লা রাগে গরগর করতে করতে দরগায় এসে ঢুকল। মওলার উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করল, কুত্তা কাঁহিকা। এখানে বসে বসে তুমি। মুরিদদের নিয়ে খোশগল্প করছ, আর আমি যতই খোদার দিকে সবার মন ফেরাতে চাই, কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।
-তারপর? কালু উত্তেজিত হয়ে ওঠে।-মোল্লাটাকে বেধড়ক পেটানি দিলে—
-সবুর করো কাল্লু। কালে শাহ হাসলেন।-পেটালেই কি কাজ হাসিল হয়? তবে কিনা মুরিদরা সব উঠে দাঁড়িয়ে মোল্লাকে এই মারে তো সেই মারে।
-মারাই তো উচিত। কাল্লু আবার উত্তেজিত।-আমি থাকলে মোল্লার দাড়ি ছিঁড়ে—
-কাল্লু, মিঞাকে কিস্সাটা বলতে দে। তুই সেখানে থাকলে কিস্সাটাই আর আমরা শুনতে পেতুম না। আর তুই মোল্লার দাড়ি হাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুড়ে বেড়াতিস। আমি হাসতে হাসতে বলি।
-মওলা তো তাঁর মুরিদদের থামালেন। হাসতে হাসতে তাদের বললেন, আরে করো কী, করো কী! কুত্তা শব্দটা এমন খারাপ কি শুনি? আমার তো বেশ ভালই মনে হয়। আমি কুকুর বই আর কী? প্রভুর সব কথা শুনে চলছি। প্রভুর বিপদ দেখলে ঘেউ ঘেউ করি, প্রভুর আনন্দ হলে লেজ নাড়াই। ঘেউ ঘেউ করা, লেজ নাড়ানো, প্রভুকে ভালবাসা-এই তো কুকুরের ধর্ম। এতে তো অপমানের কিছু আমি দেখছি না। তো মির্জা আপনি যদি খোদার কুকুর হন, তার চেয়ে বড় সম্মানের আর কী আছে?
এই হচ্ছেন মিঞা কালে শাহ। যেমন রসিক মানুষ, তেমনই পরম করুণাময়। জাঁহাপনাকে তিনি আমার সম্পর্কে অনেক কথাই বলতেন। তিনি সর্বান্তকরণে চাইতেন, দরবারে যেন আমি জায়গা পাই। আমাকে বলতেন, মনে রাখবেন মির্জা, খোদা এই দুনিয়াতেই সব হিসেবনিকেশ মিটিয়ে দেন। কেয়ামতের দিনে শুধু তো তাঁরই সঙ্গে থাকা। সেখানে চাওয়া-পাওয়া বলতে। কিছু নেই। খোদার জন্য যে-সৌন্দর্য আপনি সৃষ্টি করেছেন, তার মূল্য আপনি নিশ্চয়ই পাবেন।
-খোদাই তো সব সৌন্দর্যের স্রষ্টা, মিঞাসাব। তাঁর জন্য আমরা আর কী সৃষ্টি করতে পারি?
-তা হলে তিনি আমাদের এই দুনিয়াতে আনলেন কেন, মির্জা? তিনি আমাদের দেন সত্য, আর আমরা তাঁকে দিই মায়া।
কালেসাব ঠিকই বলেছিলেন। গজল তো আসলে মায়া-ই। গজল শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটা কথা। আওরতো সে গুগু। দয়িতার সাথে প্রণয়ের কথা। বাহার যেমন আসে, আবার হারিয়ে যায়, প্রেমও তো বসন্তের মতোই আসে, তারপর হারিয়ে যায়। ভাবলে। খুব শীত করে না, মান্টোভাই? মিলনের আকাঙ্খর ভেতরেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে মৃত্যুর বীজ। শরীর ঝরে যাবে, মন ঝরে যাবে, আকাঙ্খা এগিয়ে যাবে তার মৃত্যুর পথে। মায়ার তসবিরমহলে আমরা কয়েকটা দিন ঘুরে-ফিরে বেড়াই। বাদ দিন এসব হেঁদো কথা। মায়া খেয়ে তো আর মানুষ বাঁচে না। আমার তখন দরকার একটু পরোটা –গোস্ত -সুরা।
বাহান্ন বয়েসে দরবারে জায়গা পেলুম। আগ্রা থেকে যখন শাহজাহানাবাদে এসেছিলুম, তখন দরবার ছিল আমার কাছে স্বপ্নের জগৎ। সে স্বপ্ন কবেই মরে হেজে গেছে, মান্টোভাই। শায়র হিসেবেও আর কিছু চাই না। আমি তো জানি, গুগু আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। শুধু খেয়ে পড়ে বাঁচবার জন্য দরবারে একটু জায়গা দরকার ছিল। দরবার তো আর কোন শিল্পীর জীবনে সৃজনের বসন্ত নিয়ে আসতে পারে না। যখন সত্যিই লিখতে পারতুম, তখন দরবারে ঠাঁই পেলে বেঁচে থাকার জন্য নানা নোংরামি করতে হত না, ভাষাকে আরও গভীরভাবে আদর করার সময় পেতুম। কালে সাব তো ছিলেনই, বাদশার হাকিম আক্সানউল্লা খানও আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। তিনি আমার ফারসি রচনা খুবই পছন্দ করতেন।বাদশাকে আমার ফারসি দিবান আর পঞ্চ অহঙ্গ-এর কথা বলে দরবারে চাকরি জুটিয়ে দিলেন। চাকরি ছাড়া আর কী?
