আচ্ছা, মির্জসাব, এই যে ইসমতকে নিয়ে এত কথা বলছি, ওকে আপনি চিনতে পারছেন? যেন নানা রংয়ের-সবুজ, লাল, হলুদ, গোলাপি আবির আনা হয়েছে উঠোনে আর কোথা থেকে হাওয়া আসছে, রংগুলো মিলেমিশে যাচ্ছে, কাউকে আর আলাদা করে ছোঁয়া যাচ্ছে না। ঠিক সেইরকম না? দাদা আজিম বেগকে নিয়ে লেখা ওর দোজখি-র সেই জায়গাটা মনে পড়ছে, মির্জাসাব। একদিন ভোরে শামিম এসে ইসমতকে ডাকল, বলল, তৈরি হয়ে নাও, আজিমভাই মারা যাচ্ছে। ইসমত বলল, আজিমভাই কখনও মরবে না। শুধু শুধু ঘুম থেকে তুললে কেন?
শামিম ওকে ঠেলতে লাগল, ওঠো ইসমত। আজিমভাই তোমাকে খুঁজছে।
-বলো কেয়ামতের দিন দেখা হবে। বলছি না, আজিম ভাই মরতে পারে না।
ইসমত লিখেছিল, জন্নত বা জাহান্নাম, মুন্নাভাই যেখানেই থাকুক, আমি তাঁকে দেখতে চাই। আমি জানি, সে এখনো হাসছে। পোকারা তার শরীর খুঁটে-খুঁটে খাচ্ছে। হাড়গুলো ধুলো হয়ে গেছে, মোল্লাদের ফতোয়ায় তার ঘাড় ভেঙে গেছে। তবু সে হাসছে। দুষ্টু চোখ দুটো নাচছে। বিষে নীল হয়ে গেছে তার দুই ঠোঁট, তবু তার চোখে কেউ জল দেখতে পাবে না। আসলে সে তো এক দোজখ থেকে অন্য দোজখে গেছে।
আজিম বেগের পর আর একজন দোজখি-কে ইসমত খুঁজে পেয়েছিল, আমার মধ্যে। হয়তো পাঁচ মিনিট দেখা হওয়ার কথা, কিন্তু কোথা থেকে পার হয়ে যেত পাঁচ ঘণ্টা। শুধু তর্ক আর তর্ক। আমাকে ও হারাবেই। ওর হারানো মুন্নাভাইয়ের ওপর শোধটা কি আমার উপর দিয়েই তুলতে চাইছিল? মদ খেতে খেতে আমার খুব কাশি হত। ছোটবেলা থেকেই তো কফের ব্যারাম। আমার এই কাশি ইসমত একেবারে সহ্য করতে পারত না। একদিন বলল, এত কাশির অসুখ তোমার, চিকিৎসা করাও না কেন মান্টোভাই?
-চিকিৎসা! ডাক্তার মানেই গাধা। কয়েক বছর আগে ওরা বলেছিল আমি বছর খানেকের মধ্যে টিবি-তে মারা যাব। দেখতেই পাচ্ছ, আমি কেমন বহাল তবিয়তে আছি। ডাক্তারদের চেয়ে জাদুকররা অনেক ভাল।
-তোমার আগে আরেকজনের মুখেও আমি কথাটা শুনেছি। ইসমত গম্ভীর হয়ে বলে।
-কে সেই ফরিস্তা?
-আমার দাদা, আজিম বেগ। এখন কবরে নাক ডাকছে।
হ্যাঁ, মির্জাসাব, আমি একদিকে ওর মান্টোভাই, কখনও মান্টোসাব, অন্যদিকে ওর মুন্নাভাই আজিম বেগ চুঘতাই। দাদার সঙ্গে যে খেলাটা ও খেলতে পারেনি, আমাকে সেই খেলার টার্গেট করে নিয়েছিল। আর ওর বর শহিদ খেলাটা খুব উপভোগ করত; শহিদ জানত, একমাত্র মান্টোকে ছিন্নভিন্ন করেই শান্ত হবে ইসমত; ইসমতের সব দরাজদস্তি মেনে নেবে মান্টো নামের একটা ভাঁড়।
দরাজদস্তি নিয়ে ইসমতের সঙ্গে তর্ক হয়েছিল খুব। একবার শহিদ আর ইসমত আমাদের নেমন্তন্ন করেছে ওদের মালাদের বাড়িতে। খেতে খেতে শহিদ বলল, মান্টো তোমার উর্দুতে এখনও ভুল থাকে কেন?
-বাজে কথা বোলো না।
কথার চাপানউতোর চলল। রাত দেড়টা বেজে গিয়েছে। শহিদ ক্লান্ত হয়ে বলল, ছাড়ো তো এখন, ঘুম পাচ্ছে।
ইসমত কিছুতেই ছাড়বে না। ও তর্ক চালিয়ে যেতেই লাগল। কী একটা কথা প্রসঙ্গে ও দস্তদরাজি শব্দটা বলে ফেলল। আমিও মওকা পেয়ে গেলাম। বললাম, অনেক বড়-বড় কথা বলছ তখন থেকে। দস্তদরাজি বলে কোনও শব্দ হয় না ইসমত। ওটা দরাজদস্তি।
-কিছুতেই না।
-অভিধান দ্যাখো।
-দরকার নেই। আমি বলছি, দস্তদরাজি।
-ফালতু তর্ক করো না।
-তুমি নিজেকে কী মনে করো, মান্টোভাই? উর্দু সাহিত্যের শাহেনশা?
শেষে শহিদ পাশের ঘর থেকে অভিধান নিয়ে এল। দস্তদরাজি বলে কোনও শব্দই নেই। লেখা আছে দরাজদস্তি। শহিদ বলল, ইসমত, তুমি হেরে গেছ, মেনে নিতেই হবে।
কিন্তু ইসমত কিছুতেই মানবে না। এবার শুরু হল স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া। আমি ঠ্যাং-এর উপর ঠ্যাং তুলে বসে মিটিমিটি হাসতে লাগলাম। ততক্ষণে ভোর হয়ে এসেছে; চারপাশে মোরগরা ডাকাডাকি শুরু করেছে। ইসমত অভিধানটা ছুঁড়ে ফেলে বলল, আমি যখন অভিধান তৈরি করব, সেখানে দস্তদরাজি শব্দটাই থাকবে। দরাজদস্তি কোনও কথা হল! যত্তসব।
ইসমত-ও একটা খেপি, সত্যিকারের খেপি। কেউ যদি কখনও সত্যিই আমাদের প্রশ্ন করত, কেন এত টান-ভালবাসা তোমাদের, বলো তো মান্টো, ইসমতের কী তোমার ভাল লাগে? মান্টোর ভেতরের কী তোমাকে টানে ইসমত, জানো? আমি জানি, আমরা দুজনেই কয়েক মুহূর্ত অন্ধকারে ডুবে যেতাম। সেই অন্ধকারে ইসমত আর আমি, পরস্পরের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি। কারও জন্যই একটা জীবন যথেষ্ট নয়, মির্জাসাব।
৩৩. একটা সুফি কিস্সা মনে পড়ল
মওজুঁ করো কুছ অওরভী, শায়দ কেহ্ মীরজী
রহ জায়ে কোঈ বাত কিসূকী জবান পর।
(আরও কিছু কাব্য রচনা করো মীরসাহেব, হয়তো বা
তোমার কোনো কথা রয়ে যাবে কারুর মুখে।)
একটা সুফি কিস্সা মনে পড়ল, ভাইজানেরা। এক ভিখারি খিদের জ্বালায় শহরের বাড়ি থেকে বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ভিখারিকে জানলা থেকে দেখে কেউই আর দরজা খোলে না। শেষে এক বাড়ির দরজা খুলল। বাড়ির কত্তা জিজ্ঞেস করল, কী-কী হয়েছে কী-তখন থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছ কেন?
-হুজুর কিছু খাবার। তিনদিন কিছু খাইনি।
-তা আমি কী করব? বাড়িতে এখন কেউ নেই।
-আমি কাউকেই চাই না হুজুর। শুধু একটু খাবার। আর কিছু চাই না।
এই ভিখারিটার মতোই আমি দোরে-দোরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর খোদা আমার জন্য কয়েকদিনের খাবারের বন্দোবস্ত করে দিলেন। মিঞা নাসিরুদ্দিন সাব আমাকে বুকে টেনে নিলেন। তাঁকে সবাই মিঞা কালে শাহ বলেই ডাকত। বাদশা বাহাদুর শাহ তাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহন করেছিলেন। তা জেল থেকে বেরিয়ে আমি লালকুঁয়ায় মিঞা কালে সাবের হাভেলির একটা অংশে এসে উঠলুম। ভাড়া দিয়ে থাকার মতো সামর্থ্য তখন আমার ছিল না; কালে সাবও সে-সব কথা তোলেননি। একদিন কালে সাবের সঙ্গে তাঁর বৈঠকখানায় বসে আছি, কে একজন এসে বলল, মুবারক মির্জাসাব।
