ইসমত সব সময় বলত, এই যে আমি নানা কোঠা আর বেশ্যাদের গল্প বলি, এসবই নাকি আমার বানানো। আমার দোস্তদের সম্পর্কেও যা বলতাম, তা-ও বিশ্বাস করত না। এই ধরুন রফিক গজনভি। ও তো একটা লোফার ছিল, একেবারে লোচ্চা। এক বাড়ির চার বোনকে পর পর বিয়ে করেছিল, লাহোরের কোঠার এমন কোনও মেয়ে ছিল না, যার সঙ্গে শোয়নি।
রফিককে আমার সত্যিই ভাল লাগত। জীবনটা যেন একটা খেলার মতো ওর কাছে। একদিন ইসমতকে বললাম, চলো, রফিকভাইয়ের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই।
-আমার তাতে লাভ? তুমি তো বলো, ও একটা লোচ্চা।
-সেইজন্যই তো আলাপ করবে। তোমাকে কে বলেছে, লোচ্চা মানেই সে খারাপ মানুষ? রফিকের মতো শরিফ আদমি খুব কম দেখা যায়।
-মান্টোসাব, তোমার কথার মানে কিছু বুঝছি না। আমি হয়ত ততটা বুদ্ধিমান নই।
-ভান করো না তো। একবার দেখা করোই না। রফিকভাই খুব মজার মানুষ। ওকে দেখলে প্রেমে পড়েনি এমন কোনও মেয়ে নেই, বুঝলে?
-আমিও তো মেয়ে।
-আরে তুমি তো আমার ইসমত বহিন।
-আবার বহিন। তোমার এই ভাঁড়ামো আমার ভাল লাগে না, মান্টোভাই। ইসমত আমার পাঞ্জাবির কাঁধ খামচে ধরে।
-তোমাকে ছাড়া আমি আর কাউকে এভাবে বহিন বলি না, ইসমত। ইকবালকেও না।
-কেন বলো?
এর যে কোন উত্তর নেই, মির্জাসাব। ইসমতই তো একদিন বলেছিল, জীবনে একটা কথাও তুমি মুখ ফুটে বলতে পারলে না? ইসমত জানত, মান্টোর মতো শয়তানেরও মুখোশের দরকার হয়।
রফিকভাইয়ের সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম ইসমতের। ইসমত স্বীকার করেছিল, সত্যিই ও শরিফ আদমি। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কী করে এমনটা হয় মান্টোভাই?
-জানি না। আমি কখনও রফিকভাইকে বোঝবার চেষ্টা করিনি। ও যেমন, তেমন ভাবেই মেনে নিয়েছি।
-মান্টোভাই—
-হুকুম করো।
-পাঁক খুঁড়ে খুঁড়ে এইসব মুক্তো তুমি কীভাবে বার করো?
-খোদাকে সালাম জানাও।
-আর কোঠার গল্পগুলো? ওগুলোও সত্যি? আমি বিশ্বাস করি না। মিথ্যে বলায় তো তোমার সঙ্গে কেউ পেরে উঠবে না।
-মিথ্যের কী আছে? পকেটে পয়সা থাকলে যে কেউ কোঠায় যেতে পারে।
-তোমার দুনম্বরি বন্ধুগুলোর সে-সাহস নেই মান্টোভাই। হ্যাঁ, মুজরো শুনতে যেতে পারে, তার বেশী কিছু করার সাধ্য ওদের নেই।
-আরে, আমিও তো গেছি।
-মুজরো শুনতে? ইসমত বাঁকা হাসে।
-কেন?কেন? শুধু মুজরো কেন? কোঠায় গিয়ে যে-জন্য টাকা খরচ করে মানুষ, সেজন্যই গেছি।
-চুপ করো। বেহায়া কোথাকার! ইসমত চিৎকার করে ওঠে। মিথ্যে বলার একটা সীমা আছে
-কেন? অসুবিধে কোথায়?
-হতে পারে না। নিজের এইরকম ইমেজ তুমি ইচ্ছে করে তৈরি করো।
-খোদা কসম, ইসমত, আমি কোঠায় গেছি।
-খোদার নাম মুখে এনো না। তুমি তাঁকে বিশ্বাস করো।
-আমার মরা ছেলের কসম।
-মান্টোভাই। সে দুহাতে আমার চুল খামচে ধরে।-তুমি কি মানুষ? মরা ছেলের নামে কসম খাচ্ছ?
দেখতে পেলাম, ইসমতের দুই চোখ ঝাপসা। আমি হাসতে লাগলাম।
-তুমি বিশ্বাস করছ না কেন, ইসমত বহিন, আমি মেয়ে পটাতে ওস্তাদ।
-মান্টোসাব, এই কিন্তু আমাদের শেষ দেখা বলে দিচ্ছি। ইসমত ফুসতে থাকে। ওর গালে টোল পড়েছে। এইরকম সময়ে ওকে আরো রাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করে আমার। বলি, দাঁড়াও, শফিয়াকে ডাকি। ও কি বলে শোনো।
শফিয়া আসতেই ইসমত ফেটে পড়ে, মান্টোভাই তোমাকে বলেছে, ও কোঠার মেয়েদের কাছে গেছে?
-কতবারই তো বলেছেন।
-হতে পারে না। ইসমত রাগে গরগর করতে করতে পায়চারি করতে থাকে।-আচ্ছা, না হয় গেছে, গেলেও ওদের সঙ্গে দুটো একটা কথা বলে চলে এসেছে, মান্টোভাই। ঠিক কি না। শফিয়া?
-কি জানি। মান্টোসাবই বলতে পারবেন।
আমি হা-হা করে হাসতে থাকি। আর ইসমত তত চেঁচাতে থাকে, হতে পারে না, কিছুতেই হতে পারে না। মান্টোভাই কোরান ছুঁয়ে বললেও আমি বিশ্বাস করব না।
কী শিশুর মত বিশ্বাস! মনেই হয় না, এই ইসমত মৃত দাদা আজিম বেগকে নিয়ে দোজখি-র মত গল্প লিখতে পারে। ইসমত লিখেছিল, আজিম বেগের লেখা-বলা সব গল্পই মিথ্যে। আজিম বেগ কথা বলতে শুরু করলেই নাকি ওদের বাবা বলতেন, আবার তুমি হাওয়া মহল তৈরি করতে শুরু করলে? আজিম বেগ বলতেন, আব্বাজান, জীবনে যেটুকু রং, তা তো মিথ্যের জন্যই। সত্যের সঙ্গে মিথ্যে না মেশালে, শুনতে মজাদার হয় না। আজিম বেগের। পাগলামিটা ইসমতের মধ্যেও ছিল। অদ্ভুত সব খেয়াল চাপত ওর মাথায়। একবার বলল, মোরগ-মুরগিদের ইশ্য নিয়ে একটা কিস্সা লিখবে। একদিন মনে হল, লেখা ছেড়ে দিয়ে। সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়ে উড়োজাহাজ চালাবে। জানেন, মির্জাসাব, ও এমনই একটা মেয়ে, হয়তো আপনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, কিন্তু আপনাকেই সবচেয়ে বেশী আক্রমণ করবে বা আপনার সঙ্গে কথাই বলবে না। হয়তো খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছে ওর, তার বদলে গালে সূচ ফুটিয়ে তামাশা করবে। শফিয়াও ইসমতের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। সে-কথা একদিন বলায়। ইসমত শফিয়াকে বলেছিল, বাব্বা, প্রেমে পড়ার আদিখ্যেতা তো তোমার কম নয়! তোমার বয়েসের মেয়েদের বাপেরা আমার প্রেমে হাবুডুবু খায়, আর তুমি এসেছ-। একজন লেখক তো ইসমতের প্রেমে একেবারে দিবানা হয়ে গিয়েছিল; পরেরপর চিঠি লিখত। ইসমতও চিঠি লিখে যেত। শেষে এমন ল্যাং মারল, ভাইজানেরা, লেখকের তো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। ইসমত এইরকম, একখণ্ড উড়ো মেঘের মতো। যখন লিখত না, মাসের পর মাস। কেটে যেত, জোর করেও ওকে লিখতে বসানো যেত না। আর লিখতে বসলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে যাবে, নাওয়া-খাওয়া-ঘুম ভুলে যেত। শুধু আইসক্রিম রেখে দিতে হবে তার সামনে।
