ইসমতের জিভ এইসব কথা বলার সময় একেবারে ছুরির ফলা হয়ে যায়।
আমি আমতা-আমতা করে বললাম, একেবারেই না…ছেলে আর মেয়েদের আমি একেবারেই আলাদা করে দেখি না।
-তা হলে কথাটা বলছ না কেন?
আমি চুপ করে গেলাম। ইসমত এবার খোঁচাতে লাগল, বলো মান্টোভাই, বলো, কথাটা শুনি। তারপর না হয় মেয়েদের মতো লজ্জা পেয়ে ছুটে পালাই। বাচ্চা মেয়ের মতো আমাকে খ্যাপাতে লাগল। আমি হেসে ফেললাম, না ইসমত, আমার রাগ জল হয়ে গেছে।
এভাবেই, ইসমতের কাছে হেরে যেতেই হবে। একেবারে একা-নিজে নিজে-ইসমত তার নিজস্ব দুনিয়াটা তৈরি করেছিল। ওর বাবা কাসিম বেগ চুঘতাই ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট; বদলির কত জায়গাতেই না থাকতে হয়েছে। আলিগড়ে ইসমত যখন ক্লাস নাইনে পড়ে, ওর বাবা বদলি হয়ে গেলেন রাজস্থানের সম্ভরে। ইসমত হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল; ওর বাবা-মা রাজি হননি। সম্ভরে এসে ইসমতের দমবন্ধ হওয়ার অবস্থা। পড়াশোনার কোনও সুযোগই সেখানে নেই। একদিন সকালে নাস্তার পর ওর বাবা বসে আখবার পড়ছেন; পাশেই একটা চৌকিতে বসে মা সুপুরি কাটছিলেন। ইসমত ঘরে ঢুকে মায়ের পাশে গিয়ে বসল। তারপর খুব শান্তভাবে বলল, পড়াশোনা করতে সে আলিগড়ে যেতে চায়। মা তো চোখ বড় – বড় করে ইসমতের দিকে তাকিয়ে আছে। কাসিম বেগ চুঘতাই দেখলেন, মেয়ে তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে। কোনও ছেলেমেয়েই এভাবে তাঁর চোখের ওপর চোখ রাখতে পারেনি কখনও।
ইসমত সোজাসুজি আবারও বলল, পড়াশোনা করতে আমি আলিগড়ে যাব।
-এখানে তো বড় আব্বার কাছে পড়ছ।
-আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে চাই।
-কেন? জুগনুর আর দুবছর পড়া বাকি। তারপরই তো তোমাদের শাদি হবে।
-আমি ম্যাট্রিক দেব।
-কোনও দরকার নেই।
-তা হলে আমি পালাব।
-পালাবে? কোথায় যাবে?
-যেখানে খুশি।
ইসমতের মা খুব রেগে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাসিম বেগ চুঘতাই মেয়ের এই সমানে সমানে কথায় হয়তো কিছু আঁচ করেছিলেন। তিনি ইসমতকে আলিগড়ে পাঠিয়ে দিলেন। ইসমতের জীবনের প্রথম জয়। অন্যান্য বোনের মত ও ছোটবেলায় পুতুল খেলেনি, ছেলেদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে নেমেছে; ইসমত কখনও চায়নি, বোনেদের মতো তারও কুড়ি বছরের মধ্যে নিকে হয়ে যাক। ছবছর ধরে ইসমতের সঙ্গে সম্পর্কটা যেন একটা জল রং-এ আঁকা ছবির মতো। ছবিটা কীভাবে আঁকা শুরু হয়েছিল, কবে শেষ হয়েছিল, কিছু আর মনে নেই। তার ওপর, মদ খেতে খেতে, বুঝতেই পারছেন ভাইজানেরা, আমার মাথার হালত খুব খারাপ, কোনটা আগে, কোনটা পরে, কিছুতেই খেই খুঁজে পাই না। একটা মজার রাতের কথা মনে পড়ছে, ভাইজানেরা। শহিদ আর ইসমত তখন মালাদে থাকে। আমরা রাত বারোটার পর গিয়ে ওদের বাড়িতে হানা দিলাম। আমি, শফিয়া, নন্দাজি আর খুরশিদ আনোয়ার। শফিয়া তো এসবে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু আমাকে একা ছাড়বে না বলেই ওর আসা। দরজা খুলতেই শফিয়া ইসমতের হাত চেপে ধরে বলতে লাগল, কত করে বোঝালাম, এত রাতে ওদের বিরক্ত করো না। তোমার মান্টোভাই। আসবেই।
-তুমি আমাকে ঠেকাবে শফিয়া? আমার যখন যেখানে খুশি যাব।
শাহিদ এসে আমার পিঠে হাত রেখে বলল, রাতটা জমে যাবে মান্টো, এসো-এসো–।
আমাদের তো খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু সব হোটেল তখন বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বললাম, ইসমত, আজ নিজেরাই বেঁধে খাব। আটা, ডাল আর আলু থাকলেই চলবে।
শফিয়া তো কিছুতেই আমাদের রান্নাঘরে যেতে দেবে না। ছেলেরা রান্না করে খাবে, তা কখনও হয় নাকি? কিন্তু আমরা রান্নাঘরেই বসে গেলাম বোতল আর গ্লাস নিয়ে। আমি আটা মাখছি, নন্দাজি স্টোভ ঠিক করছে, আর খুরশীদ আলুর খোসা ছাড়াচ্ছে। একসময় খুরশিদ বলে উঠল, এ শালা আলুর খোসা ছাড়ানো আমার কম্ম নয়। মান্টোভাই, কাঁচা খেতে পারবে না? আমি রুটি বানালাম, তবে আধপোড়া, আর পুদিনার চাটনি। খেয়েদেয়ে আমরা কজন রান্নাঘরেই শুয়ে পড়লাম। এইরকম কত রাতে ইসমত আর শহিদ আমার অত্যাচার সহ্য করেছে। মদের মাত্রা যত বাড়ত, আমি ইসমতকে বোঝাতে চেষ্টা করতাম, আল্লার কসম ইসমত, আমি মাতাল হইনি। দেখতে চাও? বাজি লড়। কালই আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দেব। মদ ছেড়ে দেওয়া কোনও ব্যাপারই না আমার কাছে।
-বাজি লড়ো না মান্টোভাই, তুমি হেরে যাবে। এখন তুমি মাতাল।
মজা লাগে, মির্জাসাব, খুব মজা লাগে, আপনার-আমার গায়ে কেমন মাতালের ছাপ্পাটা লেগে। গেল। আপনি যদি সবসময় মাতালই থাকতেন, তা হলে এত গজল লিখলেন কখন? এত চিঠি লেখা সম্ভব হত আপনার পক্ষে? আমিই বা এত-এত গল্প লিখলাম কী করে? এলোমেলো, ছন্নছাড়া একটা জীবন, পেটের ভাত জোগাড় করতেই সকাল থেকে রাত্তির কত নোংরামিতে ডুবে থাকা, মদ খাওয়ার পর ঠিকঠাক ফোকাস করতে পারতাম, আমার লেখার ঘরটা খুঁজে পেতাম। সে-ঘরে শব্দরা হাঁটাচলা করে, উড়ে বেড়ায়, গুনগুন করে গান গায়, কী যে বেদনায় গুমরে গুমরে ওঠে, শব্দের ভেতরেই তো খুঁজে পেতাম কত গোপন অশ্রু, মুচকি হাসি, খেটে খাওয়া মানুষদের অট্টহাসি আর খিস্তি, কত ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, হতাশ্বাস, শব্দের ভেতরেই জ্বলে উঠত সে নীল আলো যার গভীরে লুকিয়ে থাকে কামনার লাল শিখা। আমি তো কখনও নিজের কথা লিখতে চাই নি মির্জাসাব। কোনও লেখকই কি সে দৈনন্দিনে কীভাবে বেঁচে আছে, তার সুখ-দুঃখ, পছন্দ-অপছন্দের কথা লেখে? সে তো শব্দের ভেতরে খুঁজে বেড়ায় চেনা-অচেনা মানুষদেরই সেইসব ছবি, যে ছবিগুলো তারা লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল, যে সব ছবির স্মৃতি তাদের গভীর দহনের পথে নিয়ে গেছে। সারাদিন কঠিন পরিশ্রম করে যে নারী রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে, সে কখনও আমার গল্পের নায়িকা হতে পারে নি, ভাইজানেরা। যে-মেয়েটা সারারাত বাতি জ্বেলে খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করে, তারপর দিনের বেলা ঘুমিয়ে পড়ে আর হঠাৎই একটা স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে জেগে ওঠে, আমি তার কথাই ভেবেছি। কি স্বপ্ন দ্যাখে সে? তার বৃদ্ধ, লোলচর্ম শরীর তারই দরজায় এসে কড়া নাড়ছে।
