-তারপর?
-একদিন সেই বনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে সিকন্দরও সেই বাঁশির সুর শুনতে পেলেন। আওয়াজ অনুসরণ করে তিনি রাখালদের ডেরায় পৌঁছলেন। যে বাঁশি বাজাচ্ছিল, তাঁকে গ্রেফতার করে দরবারে নিয়ে এলেন। জেরায় রাখাল সব কথা খুলে বলল। অসম্ভব, সম্রাট গর্জে উঠলেন। সিকন্দর এবার বিলালকে ডেকে পাঠালেন। বিলাল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, হুজুর, আমি তো কানের কথা কাউকে বলিনি। শুধু পুকুরকে বলেছিলাম।
-পুকুরকে? সম্রাটের চোখ কপালে উঠল।
-হুজুর, কথাটা আমি আর বইতে পারছিলাম না। অন্য কাউকে তো বলা যাবে না, তাই পুকুরকে গিয়ে বলেছিলাম।
-তারপর?
-সিকন্দর সেই পুকুর থেকে আরও একটা নললতা তুলে আনতে বললেন। রাখালটি সেই নলতা থেকে বাঁশি বানাল। সেই বাঁশি থেকেও একই কথা শোনা গেল, উরিব্বাশ, সে কী। ইয়া বড় বড় সম্রাট সিকন্দরের কান। শুনে সিকন্দর অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর সিপাইদের বললেন, রাখালকে ছেড়ে দাও। আর বিলালের দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললেন, চাইলে তুমি এখনও আমার নাপিত থাকতে পারো।
-তারপর?
-সিকন্দর শহরের সেরা লিপিচিত্রকরকে ডেকে পাঠালেন। সোনার কালিতে সে লিখে নিয়ে গেল কয়েকটা কথা; সিকন্দর তা বাঁধিয়ে রাখলেন নিজের শোবার ঘরে যাতে রোজসকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখতে পান।
-কী কথা?
-নিজেকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করো না। এমনকি পুকুরও বিশ্বাসঘাতকতা করে।
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
ইকবাল আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী বুঝলেন মিঞা?
-তুমি যা বলতে চেয়েছ বুঝেছি। তবে এই কিস্যার মধ্যে আরও একটা লুকনো কথা আছে।
-কী মিঞা?
-জাঁহাপনারও কিছু লুকনো থাকে না। খোদা একদিন না একদিন সবার পর্দা ফাঁস করে দেন। সব ক্ষমতা একদিন এভাবেই হাস্যকর মনে ওঠে, তাই না ইকবাল ভাই?
-জি। একথাটা তো আমি ভেবে দেখিনি।
-সবাই নিজের মর্জি মোতাবেক ভাবে। তাই তো দুনিয়ার খেলাটি টিকে আছে। খোদার দয়ায়, কয়েদখানাকেও আমি একসময় খেলাঘর বানিয়ে তুলতে পেরেছিলুম, মান্টোভাই। আর কয়েদখানা থেকে বেরোনোর পর নসিব আমার দিকে তাকিয়ে প্রথম হাসল। মাত্র কয়েক বছরের জন্য। তাও তো জীবনেরই দান। এই দানের অর্থ জানেন তো, মান্টোভাই? খোদা আপনিই যা দিয়েছেন, আর জুয়ার দান চেলে আমি যেটুকু কেড়ে নিয়েছি। শুধু আয়নায় আসন্ন মৃত্যুর ছায়া এসে লেগে আছে।
৩২. মির্জাসাব, এই দোজখে
মেহ্ নহ্ থী হমারী কিসমৎ কেহ্ বিলাস-এ য়ার হোতা,
অগর অওর জীতে রহেত য়হী ইন্তজার হোতা।
(বন্ধুর সাথে মিলন ভাগ্য ছিল না;
যদি আরও বাঁচতাম, এই প্রতীক্ষাই চলত।)
মির্জাসাব, এই দোজখে, আপনাদের সামনে আজ স্বীকার করছি, ইসমতকে আমি ভালবেসেছিলাম। কখনও ওকে বলার প্রয়োজন হয়নি, কেননা, আমরা দুজনেই তা জানতাম। ইসমতের সঙ্গে বিবাহিত জীবনের কথা আমি কখনও ভাবিইনি; বিয়ে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে কতগুলো অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে ফেলে, আর তারপর সম্পর্কটা বিবর্ণ হতে হতে একেবারে ধূসর হয়ে যায়। ইসমতকে আমি দেখেছিলাম একটা তসবির মহলের মতো; সে মহলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কত নতুন নতুন ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠত, কত যে দৃশ্যের জন্ম হত। ইসমত আহামরি কিছু সুন্দরী ছিল না, কিন্তু একই সঙ্গে স্নিগ্ধ ও প্রখর। চশমার কাচের ওপারে ওর চোখ দুটো যেন সবসময় বিস্মিত হওয়ার অপেক্ষায় মুখর হয়ে আছে। গালে যখন টোল পড়ত তখন সত্যিই চোখ ফেরানো যেত না। আর ওর আইসক্রিম খাওয়া দেখতে এত মজা লাগত আমার; আইসক্রিম পেলে ইসমত একেবারে বাচ্চা মেয়ে হয়ে যেত।
আমার চোখ দেখলেই নাকি ওর ময়ূরের পেখমের কথা মনে পড়ত। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন এইরকম মনে হয়, ইসমত?
-জানি না। মনে হয়।
-গল্প লিখতে লিখতে বানিয়ে কথা বলার অভ্যাস রপ্ত করেছ বেশ।
-আমি মিথ্যা বলি না মান্টোভাই।
-কেন বলো না? মিথ্যে ছাড়া জীবনে কোনও রং থাকে?
-তুমি তো বলো। সেখান থেকে রং চুরি করি।
-মাশাল্লা।
-আর একটা কথা শুনে রাখো মান্টোভাই। তোমার চোখের দিকে তাকালে আমি হার্টের একটা বিট মিস করি।
-আরিব্বাস। শফিয়াকে বলতে হবে। তার কখনও এমনটা হয় বলে শুনিনি।
-নিজের প্রশংসা শুনতে খুব ভাল লাগে, না?
-কার না লাগে?
-তোমার সবচেয়ে বেশী লগে। তোমার মত নার্সিসাস আমি দেখিনি।
যেন একটা খেলার মতই গড়ে উঠেছিল আমাদের সম্পর্কটা। কথায় কথায় তর্ক বেধে যেত। ইসমত তো কোনও কিছুতেই কাউকে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। আমার কাজ ছিল ওকে রাগিয়ে দেওয়া। রাগী ইসমতের সৌন্দর্য যে কত আদিম, তা আমার মতো কেউ জানে না, মির্জাসাব। ঝগড়া একেক দিন এমন জায়গায় পৌঁছত, মনে হত, এর পর থেকে আর আমাদের দেখা হবে না। একবার ঝগড়া হতে হতে আমি হঠাৎ বলে ফেললাম, তুমি মেয়ে না হলে এমন কথা বলতাম, আর কথা বলার মুরোদ রাখতে না।
-যা মনে হয় বলো না। আমাকে ছাড় দেওয়ার দরকার নেই। ইসমত গম্ভীর হয়ে বলল।
-তাই? তুমি ছেলে হলে–
-আরে বলো না। কোন খিস্তিটা দেবে আমায়? কী করবে?
-লজ্জা পাবে ইসমত।
-একেবারেই না।
-তা হলে তুমি মেয়ে নও। আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম।
-কেন? লজ্জা না পেলে শুধু মেয়ে বলে আমাকে লজ্জা দেখাতে হবে কেন? মান্টোভাই, তুমিও তা হলে এভাবে নারী-পুরুষকে আলাদা করে দ্যাখো? আমি ভেবেছিলাম, তুমি আম আদমির চেয়ে আলাদা।
