গুণ হাসিমুখে বললেন, উকুন মারি।
মারেন, উকুন মারেন উকুন মারার প্রয়োজন আছে।
সেই সময় মহসিন হলে এনএসএফের দখলে তিনটি রুম ছিল। একটা অ্যাসিসটেন্ট হাউস টিউটরদের বরাদ্দের দুই কামরার বড়ঘর। এটি ব্যবহার করা হতো মেয়েঘটিত অসামাজিক কার্যকলাপে। দোতলায় সাউথ ব্লকের একটিতে জুয়া খেলা হতো।
সেই দুপুরের জুয়া অসম্ভব জমে গেল। সন্ধ্যা পার হয়ে গেল। জুয়াড়ির সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় রোস্তম খেলায় অংশ নিতে পারল না। সে জুয়াড়িদের সাহায্যে নিয়োজিত থাকল। প্রধান সাহায্য বিশেষ পানীয়ের গ্লাস হাতে তুলে দেওয়া। কর্মকাণ্ড দেখে জ্বিনসাধক সামান্য ভড়কে গেছে। খোকা আসরে নেই। সে গেছে এসএম হলে। ফিস্টের তদারকিতে।
সন্ধ্যার পরপর এসএম হলে সবার যাওয়ার কথা। কিন্তু তিন তাসের খেলা এমনই জমে গেল যে কেউ উঠতে পারছে না। আরেক দান আরেক দান করে খেলা চলছেই।
রাত আটটায় ঘরে ঢুকল খোক। তার চক্ষু রক্তবর্ণ। চেহারা উদ্ভ্রান্ত। তার কাছেই জানা গেল, কিছুক্ষণ আগে এসএম হলে পাচপাত্তুরকে ছুরি মারা হয়েছে। অবস্থা গুরুতর। পাচপাত্তুর খাওয়াদাওয়া করে নিজের ঘরে আরাম করে সিগারেট খাচ্ছিল, তখন ছাত্র ইউনিয়নের মজনু এবং করিম গল্প করার ছলে পাচপাত্তুরের ঘরে ঢুকে তাকে ছুরি মেরে নিমিষের মধ্যে হাওয়া হয়ে যায়।
পাচপাত্তর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ২০ তারিখ মারা যায়। এর দু’মাসের মাথায় খোকার ভাগ্যেও একই ঘটনা ঘটে। তাকে নারায়ণগঞ্জের এক পতিতাপল্লী থেকে ধরে খুন করে ফেলে রাখা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।
যে-কোনো মহৎ আন্দোলনের পেছনে বড় কিছু মানুষের ভূমিকা থাকে। জাতি এদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রাখে। তাদের নামে সড়কের নাম হয়, মহল্লার নাম হয়। ঋণাত্মকভাবে এখানে আসে খোকা এবং পাচপাত্তুরের নাম।
ঘৃণ্য দুই ঘাতকের মৃত্যু ঊনসত্তরের গণআন্দোলনকে বেগবান করে। অন্য ছাত্র সংগঠনগুলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাদের কর্মকাণ্ড বিপুল উৎসাহে শুরু করে। খোকা এবং পাচপাত্তুর জীবিত থাকলে তা এত সহজ হতো না।
হাবীব সহজে বিচলিত হওয়ার মানুষ না
হাবীব সহজে বিচলিত হওয়ার মানুষ না। তার চরিত্রে ‘হংসভাব প্রবল। হাঁসের গায়ে পানি লাগে না। হাবীবের মনে রাগ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা তেমন ছায়া ফেলে না। তবে আজ নিশ্চয়ই বড় কিছু ঘটেছে। সকাল থেকে তিনি চরম ঝিম ধরে বসে আছেন। বলে দিয়েছেন কোনো মক্কেলের সঙ্গে আজ আর বসবেন না। যত জরুরি কথাই থাকুক চলে যেতে হবে।
প্রণব বলল, শরীর কি খারাপ?
হাবীব জবাব দিলেন না। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। প্রণব বলল, শরীর খারাপ বোধ করলে চেম্বারে বসে না থেকে বিছানায় শুয়ে থাকেন। কাউকে বলুন গা-হাত-পা টিপে দিবে।
হাবীব কিছুই বললেন না। টেবিলের ওপর থেকে খবরের কাগজ হাতে নিলেন। খবরের কাগজটা বাসি। গতপরশুর কাগজ। একবার পড়া হয়েছে। বাসি খবরের কাগজ বিষ্ঠার কাছাকাছি। হাতে লাগলেও গা ঘিনঘিন করে। হাবীব পাতা উল্টালেন। প্রণব বলল, আপনার মক্কেল সবুর বসে আছে। টাকাপয়সা নিয়ে এসেছে।
তুমি রেখে দাও।
আমার হাতে দিবে না। আপনার হাতে দিতে চায়। দুটা মিনিট সময় দেন। টাকা দিয়ে চলে যাক। ভাটি অঞ্চলের মক্কেল তো, টাকা সহজে বের করে না।
হাবীব হাত থেকে খবরের কাগজ রাখতে রাখতে বললেন, একবার বলে দিয়েছি দেখা হবে না। এখন টাকা দিবে বলে দেখা করব, এটা কি ঠিক? তাহলে কথার ইজ্জত কি থাকে।
প্রণব বলল, ঠিক বলেছেন। বাস্তব চিন্তা। আমার মাথায় বাস্তব চিন্তা আসে না। সব অবাস্তব চিন্তা।
হাবীব খান উঠে দাঁড়ালেন। দিঘির ঘাটলায় কিছুক্ষণ বসবেন। মন শান্ত করবেন। পানির দিকে তাকিয়ে থাকলে মন শান্ত হয়। প্রাচীন সাধুসন্ন্যাসীরা এই জন্যেই কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে মন্ত্র-তন্ত্র পড়তেন।
হাবীব খানের মন বিক্ষিপ্ত হবার মতো ঘটনা ঘটেছে। তিনি একটা বেনামি চিঠি পেয়েছেন। বেনামি চিঠিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা ঠিক না। তিনি নিজেও করছেন না। কিন্তু মন শান্ত করতেও পারছেন না। চিঠির বিষয়টা নিয়ে প্রণবের সঙ্গে আলাপ করবেন কি না তাও বুঝতে পারছেন না। জটিল সমস্যায় কাছের মানুষের সাহায্য নিতে হয়। হাবীব হঠাৎ লক্ষ করলেন, তার কাছের মানুষ কেউ নেই।
দিঘির ঘাটে ছাতিমগাছের ছায়া। ছাতিমের ফুল ফুটেছে। মাথা ধরে যাবার মতো উগ্র গন্ধ। বসতবাড়ির আশেপাশে ছাতিম গাছ রাখতে নেই। ছাতিম ফুলের গন্ধে নেশা হয়। সেই নেশার ঝেকে কুকর্ম করতে মন চায়।
হাবীব ছাতিম গাছের নিচের ছায়াতে বসলেন। বাইরে কড়া রোদ। ছায়াতে বসে থাকতে ভালো লাগছে। গাছটা কাটিয়ে ফেলতে হবে। তখন আর গাছের ছায়ায় বসা যাবে না। তার মনে হলো, প্রতিটি কাজের কিছু উপকার আছে আবার কিছু অপকারও আছে। দুইয়ে মিলে সমান সমান।
দিঘির জলে শাপলা ফুটেছে। দেখতে সুন্দর লাগছে। এই সুন্দরের সঙ্গে অসুন্দরও আছে। অসুন্দরটা কী? ফুলের অসুন্দর নিয়ে চিন্তা করতে করতে হাবীব নিজের অজান্তেই পাঞ্জাবির পকেট থেকে বেনামি চিঠি বের করলেন। তিনচারবার পড়া চিঠি তিনি আবারও পড়লেন।
জনাব,
আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি আপনার একজন শুভাকাক্ষী। আপনার কন্যা নাদিয়ার বিষয়ে আমি আপনাকে একটি গোপন তথ্য দিতেছি। নাদিয়া তাহার এক শিক্ষককে কোর্টে বিবাহ করিয়াছে। শিক্ষক হিন্দু। তাহার নাম বিদ্যুত কান্তি। আপনার মতো একজন সম্মানিত মানুষের মুসলিম কন্যার সহিত এক হিন্দু খনাবিহীন লিঙ্গ দ্বারা প্রতি রাতে যৌনকর্ম করিবে, ইহা কি সহ্য করা যায়? এখন কী করিবেন আপনার বিবেচনা।
