হাবীব চিঠিটা কুচিকুচি করে ছিঁড়লেন। নোংরা চিঠি সঙ্গে নিয়ে ঘোরা ঠিক। কখন কার হাতে পড়বে! তিনি চিঠির টুকরা দিঘির পানিতে ছুড়ে মারলেন। বাতাসের কারণে টুকরাগুলো পানিতে পড়ল না। তার গায়ে ফিরে এল। হাবীবের শরীরে জ্বলুনির মতো হলো।
চায়ের কাপ নিয়ে প্রণব আসছেন। তার পেছনে হুক্কা হাতে একজন। তাকে হাবীব আগে দেখেননি। মহিষের মতো বলশালী চেহারা। গাত্রবর্ণও মহিষের মতো কালো শরীরের তুলনায় মাথা ছোট। মাথার চুল কদমছাট করা। প্রণব চায়ের কাপ হাবীবের পাশে রাখতে রাখতে বললেন, এর নাম ভাদু। কোচ চালনায় ওস্তাদ। জেলখাটা লোক। আপনি বললে রেখে দিব। বাড়িতে পাহারার লোকের সংখ্যা কম। রাতে বাড়ি পাহারা দিবে, দিনে ফুটফরমাশ খাটবে। এখন সময় খারাপ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলাবে, তখন সমস্যা আরও বাড়বে। ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্টে আরও সৈন্য এসেছে। এখন বলুন, ভাদুকে রাখব?
এত অকারণ কথা কেন বলো? রাখতে চাইলে রাখবা।
প্রণব বললেন, এই ভাদু, বড় সাহেবকে কদমবুসি করে চলে যা।
ভাদু কদমবুসি করল। হাবীব বললেন, কাগজের টুকরাগুলি তুমি তুলে দিঘির পানিতে ফেলো, এটা তোমার প্রথম কাজ।
হাবীব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। ভাদু কাগজের টুকরা একটা-একটা করে বা হাতে জমাচ্ছে। আগ্রহ করে দেখার মতো কোনো দৃশ্য না। তারপরেও মানুষ মাঝে মাঝে তুচ্ছ বিষয়ে আগ্রহ বোধ করে। এখন ভাদু কাগজের টুকরাগুলি দিয়ে বল বানাচ্ছে। এখন সে কাগজের বল দিঘির দিকে ছুড়ে মারল। কাগজের বল দিঘির প্রায় মাঝখানে ভেসে রইল। হাবীব বললেন, তোমার প্রথম কাজে আমি সন্তুষ্ট। তুচ্ছ কাজ থেকে বোঝা যায় বড় কাজ কেউ পারবে কি না। তুমি কি কখনো খুন করেছ?
জি-না। তবে বললে করতে পারব।
আচ্ছা এখন সামনে থেকে যাও।
ভাদু থপথপ শব্দ করে চলে যাচ্ছে। প্রণব আবারও দৃষ্টি ফেরালেন দিঘির দিকে। কাগজের বল পানিতে জেগে আছে। বাতাসে ভাসতে ভাসতে তীরের দিকে আসছে। হাবীব খান অস্বস্তি বোধ করছেন। এই কাগজের বল কখন ডুববে! তিনি ক্লান্ত গলায় বললেন, প্রণব! তুমি নাদিয়াকে আমার কাছে পাঠাও।
এক্ষণ পাঠাইতেছি।
হাবীব বললেন, থাক দরকার নাই। তুমি সামনে থেকে যাও। আমি কিছুক্ষণ একা থাকব।
নাদিয়া তার দাদির খাটে বসে দাদির জন্যে পান ঘেঁচে দিচ্ছে। খটখট শব্দ হচ্ছে। নাদিয়া বলল, পান ঘেঁচার যন্ত্র থাকলে ভালো হতো, তাই না দাদি? সুপারি-পানচুন যন্ত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। বোতাম টিপলাম। মিকচার বের হয়ে এল।
হাজেরা বিবি বললেন, তোর হাতে যেইটা আছে সেইটাও তো যন্ত্র।
নাদিয়া বলল, তা ঠিক। এই যন্ত্রটা চলছে শরীরের শক্তিতে। আমি যে যন্ত্রের কথা বলছি সেটা চলবে বিদ্যুতের শক্তিতে।
হাজেরা বিবি হঠাৎ গল নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, যন্ত্রের একটা গফ শুনবি?
নাদিয়া বলল, কী গল্প?
হাজেরা বিবি বললেন, কাছে আয় কানে কানে বলি। এইটা উঁচাগলার গফ না। কানাকানির গরু।
নিশ্চয়ই নোংরা কোনো গল্প। আমি শুনব না।
হাজেরা বিবি খলবলিয়ে হাসতে লাগলেন। তার চোখ এখন আনন্দে চকচক করছে। তিনি পানের জন্যে হাত বাড়ালেন। নাদিয়া পান-সুপারির গুঁড়া তার হাতে ঢালতে ঢালতে বলল, তোমাকে নিয়ে আমি একটা উপন্যাস লিখছি। পড়ে শোনাব?
না। তুই আমার গফ শুনবি না, আমিও তার গফ শুনব না।
প্রথম লাইনটা শুধু শোনো—’আজ বারোই চৈত্র। হাজেরা বিবির বিবাহ।’
তুই তারিখে ভুল করছস। চৈত্র মাসে বিবাহ হয় না।
দাদাজানের লেখা খাতা থেকে তারিখ নিয়েছি।
তোর দাদাজান আমার বিষয়ে যা লিখেছে সবই ভুল। আমার নামও ভুল। হাজেরা আমার নাম না।
তোমার নাম কী?
এখন বিস্মরণ হয়েছি। তোর দাদাজান নাম বদলায়েছে। সে বলল, ডাক দেওয়া মাত্র হাজির হব। তাই নাম দিলাম হাজিরন বিবি। সেই থাইকা হাজেরা বিবি। তারপর কী হইল শোন। আমি উনাকে বললাম, একদিন আমার দিন আসব। আমি আপনারে ডাক দিব। আপনি হাজির হইবেন। আপনার নাম বদলায়ে আমি নাম রাখব হাজির বাবা।
নাদিয়া বলল, তুমি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলা শুরু করেছ। বিয়ের সময় তোমার বয়স দশ বছর। দাদাজানের ত্রিশ বছর। দশ বছরের বালিকা এমন বয়স্ক একজনকে এ ধরনের কথা বলতে পারে না।
হাজেরা বিবি বললেন, আমি পারি। এখন তুই বিদায় হ।
চলে যাব?
হুঁ।
নাদিয়া খাট থেকে নামল। হাজেরা বিবি তার পুত্রকে ডাকতে লাগলেন, হাবু। হবু। হাবুরে। তিনি ডেকেই যাচ্ছেন।
নাদিয়ার এখন কিছু করার নেই। লাইব্রেরি থেকে গল্পের বই আনা হয়েছে। ভোরবেলা গল্পের বই নিয়ে বসতে ইচ্ছা করছে না। গল্পের বই পড়তে হয় দুপুরে। খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শরীর এলিয়ে গল্পের বই পড়তে পড়তে কিছুক্ষণের ভাতঘুম। একটা কাজ অবশ্য করা যায়। বই নিয়ে দিঘির ঘাটে চলে যাওয়া যায়। ছাতিম গাছে হেলান দিয়ে বই পড়া।
নাদিয়া বই হাতে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এখান থেকে দিঘির ঘাট চোখে পড়ে। সে দেখতে পাচ্ছে তার বাবা দিঘির ঘাটে বসে আছেন। তামাক খাচ্ছেন। এই সময় তার দিঘির ঘাটে বসে থাকার কথা না। তিনি কি কোনো সমস্যায় আছেন? দিঘির ঘাটের দিকে তাকালেই নাদিয়ার মনে আসে বিদ্যুত স্যারের কথা। কী বুদ্ধি মানুষটার! মাস্টারি বাদ দিয়ে মানুষটা যদি সমাধান নাম দিয়ে অফিস খুলত তাহলে সবার উপকার হতো। সমস্যায় পড়তেই সমাধান অফিসে চলে যাওয়া। স্যারের কাছ থেকে সমাধান নিয়ে আসা।
