ঘুম ভাঙল ফজরের আজানের শব্দে। তিনি বজরা থেকে বের হয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, বজরা কইতরবাড়ির ঘাটে বাঁধা। মাঝিরা কেউ নেই। তিনি স্তব্ধ হয়ে বজরার পাটাতনে দাঁড়িয়ে রইলেন। কইতরবাড়ির মসজিদ দেখা যাচ্ছে। মুসল্লিরা নামাজ পড়তে যাচ্ছে।
দোতলার উত্তরমুখী ঘরটা রাশেদাকে দেওয়া হয়েছে। তার স্যুটকেস, হোল্ডসল, এই ঘরে এনে রাখা হয়েছে। রাশেদা খাটের একপ্রান্তে হেলান দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। রেশমা জানালার শিক ধরে হাওরের দিকে তাকিয়ে আছে। একটি বিশেষ দৃশ্য তাকে মোহিত করেছে। বিশাল বকের ঝাঁক হাওরের একটা বিশেষ জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে, ফিরে আসছে, আবার যাচ্ছে। ওই জায়গাটায় কী আছে তার জানতে ইচ্ছা করছে। রাশেদা বললেন, আমাদের আটক করেছে। বিষয়টা বুঝেছিস?
রেশমা মা’র দিকে না তাকিয়ে বলল, বুঝি নাই। তার দৃষ্টি বকের দিকে।
রাশেদা বললেন, কী জন্যে আটক করেছে জানতে চাস?
চাই।
কাছে আয় বলি।
রেশমা বলল, কাছে আসব না। তুমি বলো আমি শুনছি।
রাশেদা বললেন, এরা জোর করে খুনিটার সঙ্গে তার বিবাহ দিতে চায়। তোর উপরে আদেশ—প্রয়োজনে ফাঁসিতে ঝুলবি, কবুল বলবি না।
রেশমা বলল, ফাঁসিতে ঝুলার মধ্যে আমি নাই মা।
খুনিটারে বিবাহ করবি?
কথায় কথায় খুনি বলবা না শুনতে খারাপ লাগে।
খুনিরে সাধুপুরুষ বলব?
কিছুই বলতে হবে না। আমি জানি খুনের পিছনে বিরাট ঘটনা আছে। ঘটনা জানলে হাসান ভাইরে ক্ষমা করা যাবে। একদিন আমি ঘটনা জানব।
কীভাবে জানবি?
রেশমা স্বাভাবিক গলায় বলল, বিবাহের পর উনারে জিজ্ঞাস করব। স্ত্রীর কথা উনি ফেলতে পারবেন না।
রাশেদা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, তুই কী বললি?
রেশমা বলল, তামাশা করলাম। তোমার মন মেজাজ ভালো না। এইজন্যেই তামাশা!
আর একবার যদি এমন তামাশা করস তোরে আমি জীবন্ত কবর দিব।
সকালের নাশতা চলে এসেছে। চালের আটার রুটি। ভুনা হাঁসের মাংস, পায়।
রাশেদা বললেন, সব নিয়া যাও। আমি কিছু মুখে দিব না। আমার মেয়েও মুখে দিবে না। এই বাড়িতে আমরা পানিও স্পর্শ করব না।
রেশমা বলল, আমার ভূখ লাগছে। আমি খাব। হাঁসের মাংস আমার প্রিয়।
রেশমা এখনো জানালা ধরে আছে। বক রহস্যের সমাধান হয়েছে। বকরা ঠোটে মাছ নিয়ে ফিরছে। এতক্ষণ হয়তো তারা ঝাঁক বেধে মাছ খুঁজছিল।
এনএসএফের কিছু পাণ্ডা
অক্টোবর মাস।
পনেরো তারিখ।
এনএসএফের কিছু পাণ্ডা তুমুল আড্ডায় বসেছে। চপ-কাটলেট এসেছে। কফি এসেছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় কেবিন অন্ধকার। স্থান ‘লিবার্টি কাফে’। কাফের কোনার দিকে শুকনো মুখে নির্মলেন্দু গুণ একা বসে আছেন। তিনি খানিকটা বিষণ্ণ। তার পকেট ধুপখোলার মাঠ। এক কাপ চা কিনবেন সেই উপায় নাই। নির্মলেন্দু গুণ কবিতা লেখা শুরু করেছেন, তবে কবি স্বীকৃতি তখনো পাননি। কবিতা নিয়ে তাকে শরীফ মিয়ার ক্যানটিনে আড্ডা দিতে দেখা যায়। সেই আড্ডায় কবিতা-বিষয়ক আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাথা থেকে উকুন বাছেন এবং সশব্দে উকুন ফোটান। তার পাশের লোকজনদের বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞাস করেন, উকুন ফোটাবেন? নেন আমার কাছ থেকে। কোনো অসুবিধা নাই। সাপ্লাই আছে। তখন তার বিষয়ে প্রচলিত ছড়াটা হলো—
নির্মলেন্দু গুণ
মাথায় উকুন।
লিবার্টি কাফেতে নির্মলেন্দু গুণ উকুন বাছা শুরু করেছেন। তার সামনে এক কাপ কফি। এবং একটা চিকেন কাটলেট। খাবারের দাম কীভাবে দেবেন—এই নিয়ে তার মধ্যে সামান্য শঙ্কা কাজ করছে। তবে তিনি প্রায় নিশ্চিত দুপুরের মধ্যে পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। কপাল ভালো থাকলে তার ওপর দিয়ে দুপুরের খাবারটা হয়ে যাবে। লিবার্টি কাফের মোরগপোলাও অসাধারণ।
নির্মলেন্দু গুণের মাথায় একটা কবিতার কয়েকটা লাইন চলে এসেছে। লাইনগুলি তাকে যথেষ্ট যন্ত্রণা দিচ্ছে। লিখে ফেললে যন্ত্রণা কমত। সঙ্গে কাগজকলম না থাকায় যন্ত্রণা কমাতে পারছেন না।
কী মনে করে মাথার একটা উকুন তিনি কফির কাপে ফেলে দিলেন। কফি খেতে খেতে একটা উকুন কীভাবে মারা যায়, সম্ভবত এই দৃশ্য তার দেখতে ইচ্ছা করল। মাথার ভেতরের কবিতা এবং চুলে উকুন এই দুইয়ের যন্ত্রণায় তিনি অস্থির। কবিতার প্রতিটি শব্দ আলাদা করা যাচ্ছে। উকুনগুলি আলাদা করা যাচ্ছে না। নির্মলেন্দু গুণ মনে মনে একের পর এক লাইন সাজাতে লাগলেন।
আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
চতুর্দিকে চিকচিক করছে রোদ্দুর–;
আমার শরীরে ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে।
অতি বিখ্যাত কবিতাটির নাম ‘হুলিয়া’। এই একটি কবিতাই তার নামের আগে কবি শব্দটি চিরস্থায়ীভাবে বসিয়ে দিল।
কবি নির্মলেন্দু গুণের পাশের কেবিনে আলোচনা বন্ধ হয়েছে। এনএসএফের খোকা এসে সবাইকে নিয়ে গেল। লিবার্টি কাফেতে সময় নষ্ট করার কিছু নাই। আজ নানান আমোদের ব্যবস্থা আছে। মহসিন হলে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা জুয়া চলবে। সন্ধ্যাবেলায় এসএম হলে ফিস্ট। ফিস্ট শুধুমাত্র এসএম হলের ছাত্রদের জন্যে, কিন্তু এনএসএফের নেতারা সব ফিস্টের বিশেষ সম্মানিত অতিথি। ফিস্টে যাওয়ার আগে জ্বিনের খেলা। ছাত্রলীগের এক পাণ্ডা, নাম রোস্তম, ভৈরব থেকে জ্বিনসাধক ধরে এনেছে। সে জ্বিন নামাবে।।
খোকা লিবার্টি কাফের ম্যানেজারকে সবার খাবারের বিল দিল। কবি নির্মলেন্দু গুণের বিলও দিল। খোকা কবি গুণের দিকে তাকিয়ে বলল, দাদা কী করেন?
