জি।
তোমার ছোট সাহেব কি তাকে ব্যবহার করে?
না।
জেনে না বললা, -কি অনুমানে বললা?
অনুমানে বলেছি। ছোট সাহেব অন্য ধাঁচের মানুষ। ভালো মানুষ।
ভালো মানুষ, মন্দ মানুষ বিবেচনার মতো বুদ্ধি তোমার নাই।
জি, ঠিক বলেছেন।
উত্তরের দালানের যে বড় ঘরটা আছে, তার সঙ্গে টাট্টিখানা কি আছে?
আছে।
হাজি সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোমার ছোট সাহেবকে উত্তরের ঘরে তালাবন্ধ করে রাখো। খানা দিবা জানালা দিয়া। আমার হুকুম না পাওয়া পর্যন্ত তালা খুলবা না। এটা বেয়াদবির শাস্তি।
জি আচ্ছা।
সামনে থেকে যাও। যা করতে বলছি করো।
আপনার জ্বর কি আরেকবার দেখব?
দেখো।
সুলতান কপালে হাত দিয়ে বলল, জ্বর আরও বেড়েছে।
হাজি সাহেব বললেন, জ্বর বেড়েছে, কমবে। ব্যস্ত হবার কিছু নাই।
সুলতান বলল, জ্বরের ঘোরে ছোট সাহেবের শাস্তির বিধান দিয়েছেন। জ্বর অবস্থায় বিধান দেওয়া ঠিক না।
হাজি সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, তোমাকে যা করতে বলেছি করো। আমাকে বিধান শিখাবা না।
হাসানকে উত্তরের ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে। সে তা নিয়ে কোনোরকম উচ্চবাচ্য করছে না। উত্তরের ঘরের একটা জানালা দিয়ে হাওর দেখা যায়। সে বেশিরভাগ সময় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হাওর দেখে। বাকি সময়টা ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত হাঁটে। খাটের চারপাশে চক্রাকারে ঘোরে। প্রতি সন্ধ্যায় একটা খাতায় কী যেন লেখে। খাতাটার সে একটা নাম দিয়েছে মাতাল হাওয়া। হাওরের উথালপাথাল হাওয়ার কারণেই মনে হয় এমন নাম।
বারেক তার ঘরের বাইরে সারাক্ষণ বসে থাকে। রাতে চাদর পেতে তালাবন্ধ দরজার সামনেই ঘুমায়! তিনটা অক্ষর তার শেখা হয়েছে। ক, খ, গ। ঘুমের ঘোরে সে বিড়বিড় করে—ক খ গ, ক খ গ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বজরায় করে হাসানের মামি রাশেদা কইতরবাড়িতে এসেছেন। সঙ্গে তার সতেরো বছরের মেয়ে রেশমা। রেশমার মুখ গোলগাল। পাতলা ভুরু। নাক খানিকটা চাপা। শ্যামলা এই মেয়েটির চেহারায় অন্য এক ধরনের সৌন্দর্য যা ব্যাখ্যা করা কঠিন। তার চোখে চিরস্থায়ী বিষণ্ণতা।
হাজি সাহেব রাশেদাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়েছেন। রাশেদা খাটের পাশে রাখা চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছেন। হাজি সাহেব বললেন, ভালো আছ রাশেদা?
রাশেদা হা-সূচক মাথা নাড়লেন।
হাজি সাহেব বললেন, আমার ছেলের বিষয়টা কি ঠিকমতো জানো?
রাশেদা বললেন, কোন বিষয়
খুন হাসান করে নাই, আমার খাস লোক ফরিদ খুন করেছে। সে পুলিশের হেফাজতে আছে। সব স্বীকার পেয়েছে।
রাশেদা বললেন, এইসব মিথ্যা কোর্টের জন্যে, আমার জন্যে না। খুন কে করেছে আপনি যেমন জানেন আমিও জানি।
মানুষের সব জানা ঠিক না। জানায় ভুল থাকে। সেই ভুল ঠিক করতে হয়।
এইটা বলার জন্যেই কি আপনি আমাকে আনায়েছেন?
তোমাকে একটা প্রস্তাব দিব বলে আনিয়েছি।
কী প্রস্তাব?
হাজি সাহেব শান্ত গলায় বললেন, একটা বিবাহের প্রস্তাব। আমি রেশমার সঙ্গে হাসানের বিবাহ দিতে চাই।
হতভম্ব রাশেদা বললেন, এইসব কী বলেন? আপনি কি উন্মাদ হয়েছেন? উন্মাদও তো এরকম কথা বলবে না।
হাজি সাহেব নিঃশব্দে তামাক টানতে লাগলেন। রাশেদা বললেন, আপনার টাকাপয়সা আছে। ক্ষমতা আছে। ইচ্ছা করলে অনেক কিছুই করতে পারেন। নিজে খুন করে সেই দোষ অন্যের ঘাড়ে ফেলতে পারেন। আপনার কাছে আমি এবং আমার মেয়ে তুচ্ছ। তারপরেও একটা খুনির সঙ্গে আমি মেয়ের বিবাহ দিব না।
হাজি সাহেব বললেন, ঠিক আছে।
আমি আপনার এইখানে থাকব না। চলে যাব। আজই যাব।
জি সাহেব বললেন, আমি তো জোর করে তোমার মেয়ের বিবাহ দিব না। আজই চলে যেতে হবে কেন?
আমি থাকব না। আমি চলে যাব।
হাজি সাহেব বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিলেন, এখন উঠে বসলেন। হুক্কা নল নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, এই বাড়ি থেকে তুমি যেতে পারবে না। মামলার রায় হওয়ার পরে যাবে। মামলা যেভাবে সাজানো হয়েছে, তুমি তাতে ঝামেলা করতে পারো। সেই সুযোগ তোমাকে আমি দিব না।
আমাকে আটকায়ে রাখবেন?
হ্যাঁ।
আমাকে আটকায়ে রাখার ক্ষমতা আপনার নাই।
হাজি সাহেব বললেন, গলা নামায়ে কথা বলে। তুমি উঁচুগলায় কথা বলছ। লোকজন শুনছে। এটা ঠিক না। মাথা ঠান্ডা করো। খাওয়াদাওয়া করো। তুমি আমার ছেলের শাশুড়ি হবা। তোমার এই বাড়িতে আনেক মর্যাদা।
রাশেদা বললেন, আপনি যত কিছুই করেন, আমার মেয়ে কোনোদিনই রাজি হবে না। এই জাতীয় কোনো প্রস্তাব তার কানে গেলে সে হাওরে ঝাঁপ দিয়ে পড়বে। আপনাকে শ্রাল্লার দোহাই লাগে এই ধরনের কোনো কথা যেন আমার মেয়ের কানে না যায়। এখন ইযত দিন আমি বিদায় হই।
ইযাযত দিলাম।
রাশেদা দ্রুত ঘর থেকে বের হলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আজ রাতেই ফিরে যাবেন। ঘাটে বজরা বাধা আছে। ডিঙ্গাপুতার হাওর রাতে রাতে পাড়ি দিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়া। কইতরবাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকা যাবে না। রাতে খাওয়াদাওয়া করে বজরায় উঠবেন। রেশমাকে এই মুহূর্তে কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজন নাই।
রাতের খাওয়ার সময় রেশমা তার মায়ের কানে ফিসফিস করে বলল, ঘটনা কী জানো মা? হাসান ভাইকে তালাবন্ধ করে রেখেছে।
রাখুক।
কী জন্যে তালাবন্ধ সেটা কেউ জানে না।
না জানুক। তুই তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ কর। আমরা আজ রাতেই ফিরব।
কেন? ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
বজরায় ঘুমাবি।
রাশেদা হাজি সাহেবের কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই বজরায় উঠলেন। বজরা ছেড়ে দিল। রেশমা ঘুমাচ্ছে। তিনি রেশমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় নিজেও ঘুমিয়ে পড়লেন। নৌকার দুলুনিতে তাঁর গাঢ় ঘুম হলো।
