বারেক ফিরে এসেছে। মাথা নিচু করে হাসানের ঘরে বসে আছে। সে খানিকটা লজ্জিত। কারণ সাঁতরে তাকে নৌকা পর্যন্ত যেতে হয়নি। নৌকার মাঝি তাকে দেখতে পেয়ে নৌকা নিয়ে এগিয়ে এসে পানি থেকে টেনে তুলেছে।
হাসান আধশোয়া হয়ে খাটে বসে আছে। রাতের খাবারের ডাক এসেছে। সে জানিয়েছে খাবে না। ক্ষিধে নেই। সে উকিল সাহেবের বাড়ির প্রণব বাবুর মতো একবেলা খাওয়ার চেষ্টায় আছে। চেষ্টা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। গভীর রাতে ক্ষুধা হচ্ছে। তখন বারেককে পাঠিয়ে খাবার আনাচ্ছে।
বারেক!
জি ছোট সাব।
তুমি তো সাঁতার খুব ভালো জানো। সাঁতরে অনেক দূর গিয়েছিলে।
বারেক চুপ করে রইল। মাথা তুলল না। হাসান বলল, পানিতে ডুবে মরার সম্ভাবনা তোমার খুবই কম। কাজেই পড়াশোনা করবে। আমি বই-খাতার ব্যবস্থা করব। ঠিক আছে?
বারেক জবাব দিল না।
হাসান বলল, মূর্খ মানুষ আর গরু ছাগলের মধ্যে কোনো তফতি নাই। গরুছাগলও পড়তে পারে না। এখন আমার দিকে চোখ তুলে তাকাও। আমার হাতে এটা কী?
দড়ি।
তাকিয়ে থাকে। দেখো আমি কী করি। দড়িটা কাচি দিয়ে মাঝখানে কাটলাম। এখন আমি ফু দিব। ফু দিলেই দড়ি জোড়া লেগে যাবে। তাকিয়ে থাকো।
বারেক তাকিয়ে থাকল। দড়ি জোড়া লাগানো দেখল। দেখে চমকৃত হলো এরকম মনে হলো না। হাসান বলল, কীভাবে হয়েছে বলো তো।
বারেক বলল, মন্ত্র দিয়া করছেন।
হাসান বলল, ঠিক বলেছ। মন্ত্র দিয়ে করেছি। লেখাপড়াও মন্ত্র। লেখাপড়া মন্ত্র দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। বুঝেছ?
বুঝেছি।
প্রতিদিন তোমাকে একটা করে অক্ষর শিখাব। আজ থেকে শুরু। বলো ‘ক’।
বারেক ভীত গলায় বলল, ক।
হাসান কাগজে ক লিখল। বারেকের হাতে কাগজটা দিয়ে বলল, এই কাগজটা সঙ্গে রাখবে। মাঝে মাঝে কাগজটার দিকে তাকাবে আর বলবে ক’। মনে মনে বলবে না। শব্দ করে বলবে।
আচ্ছা।
টেবিলের উপর একটা বই আছে, বইটা হাতে নাও। বইয়ে যে কয়টা ক পাবে প্রত্যেকটা কলম দিয়ে কাটবে। কীভাবে কাটাবে দেখিয়ে দিচ্ছি। বইটা দাও আর কলম দাও।
হাসান একটা ক কেটে দেখাল। আর তখন সুলতান এসে বলল, বড় সাব ডাকেন। হাসান উঠে দাঁড়াল। সুলতান বলল, বড় সাবের শরীর ভালো না। বেজায় জ্বর আসছে।
হাসান কাঁচি এবং দড়ি হাতে নিল। হঠাৎ করেই তার ইচ্ছা করছে বাবাকে সে এই ম্যাজিকটা দেখাবে।
হাজি সাহেব খাটে হেলান দিয়ে বসেছেন। তাঁর চোখ বন্ধ। হাতে হুক্কার নল। তিনি নল মুখে দিচ্ছেন না। খাটের পাশে চেয়ার রাখা। হাসানকে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি চোখ মেললেন। ছেলেকে ইশারায় বসতে বললেন। হাসান বসল।
হাজি সাহেব বললেন, প্রায়ই শুনি তুমি রাতে খানা খাও না। রাতে খানা না খেলে শরীর থেকে এক চড়ুই পাখির রক্ত কমে। রাতে খানা অবশ্যই খাবে।
হাসান জবাব দিল না।
হাজি সাহেব বললেন, তোমাকে অতি জরুরি একটা বিষয় বলার জন্যে ডেকেছি। মন দিয়ে শোনো। তোমার হাতে দড়ি কী জন্যে?
আপনাকে দড়ি কাটার একটা ম্যাজিক দেখাব।
হাজি সাহেব বললেন, ম্যাজিক দেখানো বেদে-বেদেনির কাজ। তোমার কাজ। বুঝেছ?
জি।
জরুরি কথাটা এখন বলি। অপরাধ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। তুমি একটা বড় অপরাধ করেছ। এখন প্রায়শ্চিত্ত করবা।
কীভাবে?
তোমার মামাতো বোন রেশমাকে তুমি বিবাহ করবা। এটা আমার হুকুম।
রেশমাকে বিবাহ করব?
হুঁ। তার গায়ের রঙ শ্যামলা। শ্যামলা গাত্রবর্ণের মেয়েদের মন হয় ফর্সা।
হাসান বলল, এই মেয়ে সারাক্ষণ জানবে আমি তার বাবাকে খুন করেছি। এটা কি তার জন্যে ভালো হবে?
হাজি সাহেব বললেন, তুমি তোমার ভালো চিন্তা করবে। তার ভালো চিন্তা করার প্রয়োজন তোমার নাই। এখন দড়ি দিয়ে কী ম্যাজিক দেখাতে চেয়েছ দেখাও।
হাসান দড়ি কেটে জোড়া লাগাল। হাজি সাহেব বিস্মিত হলেন। নিজের অজান্তেই বললেন, সোবাহানআল্লাহ!
হাসান বলল, আপনি কি আরও কিছু বলবেন? আর কিছু না বললে আমি উঠব।
হাজি সাহেব বললেন, ম্যাজিকটা আরেকবার দেখাও।
হাসান বলল, কোনো ম্যাজিক দুইবার দেখানো যায় না।
হাজি সাহেব বললেন, আমি দেখাতে বললাম তুমি দেখাও।
হাসান কঠিন গলায় বলল, না।
হাজি সাহেব বললেন, তুমি আমার সঙ্গে বেয়াদবি করছ।
হাসান বলল, আপনি অন্যায় আবদার করা শুরু করেছেন। এটা উচিত না।
হাজি সাহেব বললেন, আমাকে তুমি উচিত অনুচিত শেখাও? আমি তোমার জন্মদাতা পিতা।
হাসান উঠে দাঁড়াল। হাজি সাহেব বললেন, উঠে দাঁড়িয়েছ কী জন্যে? বসো। আমার কথা শেষ হয় নাই।
হাসান বসল না, ঘর থেকে বের হয়ে গেল। হাজি সাহেব হুক্কার নল মুখে নিয়ে টানতে লাগলেন। অসুস্থ শরীরে তামাকের গন্ধ অসহনীয় লাগছে, তারপরেও তিনি ফুসফুস ভর্তি করে ধোয়া নিচ্ছেন। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। সামান্য স্বাসকষ্ট হচ্ছে। তিনি চাপা গলায় ডাকলেন, সুলতান সুলতান!
সুলতান খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। হাজি সাহেব বললেন, হাসান আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছে। বিরাট বেয়াদবি।
সুলতান বিড়বিড় করে বলল, বয়স কম।
হাজি সাহেব বললেন, বেয়াদবি বয়স কমের কারণে করে নাই। বিকারের কারণে করেছে। বিকার মাথায় উঠে গেলে মানুষ বেয়াদবি করে, খুন খারাপি করে। বুঝেছ?
জি।
বিকার নামানোর অনেক বুদ্ধি আছে। পাখি শিকার, জীবজন্তু শিকার। রক্ত দর্শনে বিকার কমে। আবার যৌনকর্মেও বিকার কমে। এইজন্যেই কিছুদিনের
জন্যে হলেও ঘটুপুত্র রাখা দোষের না। বুঝেছ?
জি।
বারেক নামের ছেলেটা ঘাটু দলের না?
