হাওরের ঘাট থেকে বারেক সাঁতার দিতে শুরু করেছে। তার গা খালি, পরনে সাদা প্যান্ট। সাদা রঙের কারণে দূর থেকে প্যান্টিটা দেখা যাচ্ছে। হাসান চোখে দুরবিন লাগিয়ে সাঁতারুর অগ্রযাত্রা লক্ষ রাখছে। বারেক এগুচ্ছে খুব সহজ ভঙ্গিতে। তার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই।
মাগরেবের নামাজ শেষ করে হাসানের বাবা হাজি সাহেব বিছানায় চাদর গায়ে শুয়ে আছেন। তার মাথার কাছের বড় জানালাটা খোলা। জানালায় পর্দা নেই। হাওরের হাওয়া ই-হু করে ঢুকছে। তার শীত করছে। জ্বর আসার পূর্বলক্ষণ। ঘরে হারিকেন জ্বলছে। হারিকেনের আলো চোখে লাগছে। সন্ধ্যাবেলা ঘর অন্ধকার করে রাখতে নেই বলেই হারিকেন জ্বলছে। একতলায় গানবাজনা হচ্ছে। গানের আওয়াজও তার কানে লাগছে। অসুস্থ অবস্থায় কোনো কিছুই ভালো লাগে না। তিনি ইচ্ছা করলেই কাউকে ডেকে গান বন্ধ করার কথা বলতে পারেন। তা তিনি বলছেন না। এই বাড়িতে কিছুদিন আগেই বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। সবকিছু আগের মতো করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা বন্ধ করা উচিত না।
হাজি সাহেব গানের কথা শোনার চেষ্টা করছেন। গায়কের গলা শ্লেষ্যমাখা। কোনো কিছুই পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে না। খোল-করতাল এবং হারমোনিয়ামের বাদ্যই প্রবলভাবে শোনা যাচ্ছে। বৃদ্ধ গায়ক গাইছেন—
ও সুন্দর গৌরারে পিয়ারি মনচোরারে
প্রেমভাবে নাচে গৌরা ও পিয়ারি মনচোরারে
যাইতে যমুনার জলে
ও দেইখে পাইলাম প্রাণবন্ধুরে
আচা চটক লাগলরে
আমি নারীর চিত্ত বাউরা
ও পিয়ারি মনচোরারে।
হাজি সাহেবের খাস লোক সুলতান ঢুকল। তার হাতে ফরসি হুক্কা। তামাকের গন্ধ হাজি সাহেবের ভালো লাগছে। অসুস্থ অবস্থায় তামাকের গন্ধ ভালো লাগার কথা না। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। হাজি সাহেব বিছানায় উঠে বসে হুক্কার নল হাতে নিলেন। একটা টান দিতেই শরীর গুলিয়ে উঠল। তিনি নল পাশে রেখে দিলেন।
সুলতান বলল, আপনার শরীরটা কি খারাপ?
হাজি সাহেব হ্য-সূচক মাথা নাড়লেন।
সুলতান বলল, ছোট সাহেব একটা পত্র লিখেছেন। পত্রটা আমার হাতে দিয়েছেন যেন পৌঁছানোর ব্যবস্থা করি।
হাজি সাহেব বিস্মিত গলায় বললেন, পত্র কাকে দিয়েছে?
ময়মনসিংহের উকিল সাহেবের মেয়েকে! তার নাম নাদিয়া। পত্রটা কি পড়ে দেখবেন?
হাজি সাহেব হা-সূচক মাথা নাড়লেন। সুলতান ফতুয়ার পকেট থেকে খামবন্ধ চিঠি বের করে হাজি সাহেবের সামনে রাখতে রাখতে বলল, রাতে কী খাবেন?
হাজি সাহেব বললেন, রাতে কিছু খাব না। একগ্লাস চিড়া ভিজা পানি আর পেঁপে। তুমি দরজা বন্ধ করে চলে যাও। গান কানে লাগতেছে।
শরীরে হাত দিয়া দেখব জ্বর কেমন?
দেখো।
সুলতান কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখল। সে খানিকটা হকচকিয়ে গেল। হাজি সাহেবের গায়ে অনেক জ্বর। জ্বর যে এত বেশি তা তাঁকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল না।
একজন ডাক্তার কি খবর দিব?
না। তুমি এখন ঘর থেকে যাও। আমি না ডাকলে আসবা না।
হাজি সাহেব চিঠি হাতে নিলেন। তাঁর পুত্র উকিল সাহেবের মেয়েকে চিঠি লিখতে পারে—এটা তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না।
হাসান লিখেছে— নাদিয়া,
আমি হঠাৎ করে চলে এসেছি বলে আপনার সঙ্গে দেখা করে আসতে পারি নাই। তাছাড়া আপনি অসুস্থও ছিলেন। আশা করি এখন সুস্থ হয়েছেন। আপনার ভূত দেখা রহস্যের যে সমাধান আপনার শিক্ষক বিদ্যুত বাবু করেছেন তাতে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমি আমার মুগ্ধতা কখনোই ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারি না। উনার কাছেও প্রকাশ করতে পারি নাই। আপনি দয়া করে আমার মুগ্ধতা তাকে জানাবেন।
আপনি আমাকে যে দড়ির ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন, আমি সেই রহস্য ভেদ করে অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছি। আমার খুব ইচ্ছা আপনাকে ম্যাজিকটা দেখাব।
আমাদের ভাটি অঞ্চলে বর্ষাকালে নৌকায় বেদেরা আলতা-চুড়ি বিক্রি করতে আসে। তারা সাপের খেলা দেখায় এবং অদ্ভুত সব ম্যাজিক দেখায়। আমি ঠিক করেছি তাদের কাছ থেকে কিছু মাজিক শিখে আপনাকে দেখাব। এবং আপনাকে শিখিয়ে দিব।
আমি যে আমাদের বাড়িতে আপনাকে আসার জন্যে দাওয়াত করেছি তা কি মনে আছে? কষ্ট করে যদি একবার আসেন তাহলে আনন্দ পাবেন।
এখানে আমি মোটামুটি নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছি। বই পড়ার আনন্দ থেকেও বঞ্চিত। কারণ এখানে কোনো বই নাই। ঢাকা বা ময়মনসিংহ থেকে প্রচুর বইপত্র যে কিনব তাও সম্ভব না। কারণ বিশেষ কারণে আমি গৃহবন্দি। গৃহবন্দির কারণটি কোনো একদিন আমি আপনাকে বলব।
ইতি
হাসান রাজা চৌধুরী
ভাটিপাড়া, কইতরবাড়ি।
চিঠি শেষ করে হাজি সাহেব সুলতানকে ডাকলেন। নিচুগলায় বললেন, এই চিঠি পাঠানোর প্রয়োজন নাই। চিঠি নষ্ট করে ফেলবে এবং ছোট সাহেবকে বলবে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সুলতান বলল, জি অচ্ছি।
চিঠি চালাচালির বিষয় উকিল সাহেব জানলে বেজায় রাগ হবেন।
জি হবেন। রাগ হওয়ার কথা।
হাজি সাহেব বললেন, চিঠি এখনই পুড়িয়ে ফেলো। আর রাশেদাকে খবর দাও, তার সঙ্গে আমার জরুরি আলাপ আছে। সে যেন এক-দুই দিনের ভেতর চলে আসে। রাশেদার মেয়েটার নাম কী?
রেশমী।
সে কি বিবাহযোগ্য হয়েছে?
মনে হয়।
রাশেদাকে বলবে সে যেন তার মেয়েকে নিয়ে আসে।
জি আচ্ছা।
এখন বিদায় হও।
হাসান যে মামাকে খুন করেছে, রাশেদা তারই স্ত্রী। হাজি সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, রাশেদার মেয়ের সঙ্গে হাসানের বিয়ে দিবেন। যে অন্যায় হয়েছে তার কিছুটা প্রতিকার হবে। রাশেদা এতে আপত্তি করবে এরকম মনে হয় না। রাশেদা হাসানকে অত্যন্ত পছন্দ করে।
