মাছ ধরায় তিনি বিশেষ পারদর্শী। গভীর রাতে জাল ফেলে অন্যের পুকুরের মাছ। বিষয়টাকে তিনি চুরি হিসেবে দেখেন না। অন্যের আছে তার নাই। যার আছে তার ধনের ওপর যার নাই তার কিছু অধিকার থাকবেই।
বিদ্যুত মাস্টারি পাওয়ার পর তিনি গুরুর কাছ থেকে মন্ত্র নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করেছেন। ছেলে মানিঅর্ডারে ভালো টাকা পাঠাচ্ছে। মাছ চুরি, ছাগল চুরির প্রয়োজন কী? ঝিম ধরে বাড়ির উঠানের কাঁঠালগাছের নিচে বসে মন্ত্র জপ করা।
কিছুদিনের মধ্যেই মন্ত্রের ওপর তার ঘেন্না ধরে গেল। রাতে ঘুম হয় না। খাওয়াদাওয়ায় রুচি নাই।
তারপর এক মাঝরাতে বছির মাতবরের গোয়াল থেকে মাঝারি সাইজের এক বলদ নিয়ে হাঁটা দিলেন। সারা রাত হাঁটলেন। কী উত্তেজনার হাঁটা। বুকের ভেতর গুড়গুড় করছে। কেউ যদি দেখে ফেলে সে আতঙ্ক আছে, আবার সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যাওয়ার রোমাঞ্চও আছে। আতঙ্ক, রোমাঞ্চ, উত্তেজনা এর নামই তো জীবন।
তিনি ভোরবেলা নীলগঞ্জ বাজারে পৌঁছলেন। কসাইয়ের কাছে পঁচাত্তর টাকায় বলদটি বিক্রি করলেন।
ছাগল পনেরো টাকায় বিক্রি হয়ে গেল। হরি চাল-ডাল কিনলেন। ছেলে মাংস পছন্দ করে। এক পোয়া খাসির মাংস কিনলেন। ছেলেটা ঝামেলায় পড়েছে, চাকরি চলে গেছে। একবেলা আরাম করে খাক। তিনি পোলায়ের চাল এবং ঘি কিনলেন। আজ রাতে পোলাও-মাংস হোক। বাপ-বেটা আরাম করে খাবে।
সংসার আর কয়দিনের?
এই আসছি এই নাই
দুই দিনের খাই খাই।
বিদ্যুত উঠানে চক্রাকারে হাঁটছে। মাঝখানে হারিকেন জ্বলছে। সরলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের কাণ্ড দেখছেন। তার ছেলেটা এরকম কেন?
সরলা বললেন, বাবা চা খাবি?
না।
বাবা এরকম করছিস কেন?
একটা ছোট্ট পরীক্ষা করলাম।
কী পরীক্ষা?
তুমি বুঝবে না।
বলে দেখ। বুঝতেও তো পারি।
আমি পরীক্ষা করে বের করলাম, যারা লেফট হ্যান্ডার তারা Anticlokvise দ্রুত ঘুরতে পারে। রাইট হ্যাভারা দ্রুত ঘুরে Clokwise। কিছু বুঝেছ?
সরলা হতাশ গলায় বললেন, বুঝেছি।
বিদ্যুত হো হো করে হাসছে। সরলা মুগ্ধ হয়ে ছেলের হাসি দেখছেন।
ভাটিপাড়া বাড়ির ছাদে
শ্রাবণ মাস।
হাসান রাজা চৌধুরী ভাটিপাড়া বাড়ির ছাদে অনেকক্ষণ হলো দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখাচ্ছে মূর্তির মতো। তার দৃষ্টি হাওরের দিকে। বিস্তীর্ণ হাওর। বড় বড় ঢেউ উঠছে। অনেক দূরে ছোট্ট একটা নৌকা। নৌকা খুব দুলছে। সন্ধ্যার দিকে হাওয়া জোরালো হয়। সমুদ্রের মতো বড় ঢেউ ওঠে।
হাসানকে ঘিরে অসংখ্য পায়। এরা এখন আর উড়ছে না। সন্ধ্যার পর পায়রা আকাশে উড়ে না। বাকবাকুম শব্দও করে না। এরা কীভাবে যেন টের পেয়ে গেছে যে সন্ধ্যা অতি রহস্যময় এক সময়।
ছোট সাব, আজান হয়েছে।
হাসান চমকে তাকাল। জায়নামাজ বগলে নিয়ে বারেক দাঁড়িয়ে আছে। বারেকের বয়স বারো। তাকে হাসানের ফুটফরমাস করার জন্যে রাখা হয়েছে। তার মুখের ভাষায় সিলেটের আঞ্চলিকতা নেই। সুন্দর শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। কাজেকর্মে দক্ষ। সবচেয়ে বড় কথা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চেহারা মেয়েলি। ঘাটুগানের দল থেকে তাকে আনা হয়েছে। আশেপাশে কেউ না থাকলে সে শুনগুন করে গানে টান দেয়।
যমুনার জল দেখতে কালো
ছান করিতে লাগে ভালো
যৌবন মিশিয়া গেছে জলে…
হাসান বলল, আমার অজু নাই। নামাজ পড়ব না।
অজুর পানি কি দিব?
না।
ছোট সাব, কী দেখেন?
নৌকাটা দেখি। অনেকক্ষণ এক জায়গায় আছে। বাতাসের কারণে আসতে পারছে না।
চেয়ার এনে দিব? বসবেন?
না।
বারেক চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ছাদে উপস্থিত হলো। তার মাথায় কাঠের চেয়ার। হাতে এক নলের দুরবিন। এই বাড়িতে দুটা দুরবিন আছে। ঝড়বৃষ্টির সময় দুরবিনে দূরের বিপদগ্রস্ত নৌকা দেখা যায়। তখন সাহায্যের জন্যে এ বাড়ি থেকে নৌকা যায়।
হাসান চেয়ারে বসেছে। হাতে দুরবিন নিয়ে নৌকা দেখছে। বিপদগ্রস্ত কোনো নৌকা না। নৌকার মাঝি ছেলেকে নিয়ে মাছ মারতে বের হয়েছে। ছিপ ফেলেছে। হাসান বলল, সন্ধ্যাবেলায় কি মাছ আধার খায়?
বারেক বলল, সব মাছে খায় না। বোয়াল মাছে খায়। বোয়ালের পেটে ক্ষিধা বেশি। তার বুদ্ধিও কম।
মাছের মধ্যে বুদ্ধি বেশি কার?
খইলসা মাছের। খুইলসা মাছ ধরা কঠিন। ছোট সাব, চা খাবেন? চা এনে দিব?
না।
বারেক চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বিশাল এক কাপ ভর্তি চা নিয়ে উপস্থিত হলো। বারেক সব কাজ নিজের মতো করে। হাসান চা খেতে চায়নি, এটাকে সে গুরুত্ব দেয়নি। তার মনে হয়েছে এই সময় চা খেতে ছোট সাহেবের ভালো লাগবে। সে চা নিয়ে এসেছে।
বারেক, লেখাপড়া জানো?
জে-না।
শিখতে চাও?
না।
কেন না?
আমার দাদাজানের নিষেধ আছে। তিনি খোয়াবে পেয়েছেন—লেখাপড়া শিখলে আমার পানিতে ডুবে মৃত্যু হবে।
সাঁতার জানো?
জানি।
ভালো জানো?
জানি। এইখান থেকে সাঁতার দিয়ে নৌকা পর্যন্ত যেতে পারবে?
পারব।
ভালো করে চিন্তা করে বলো। অনেকথানি দূর।
পারব। সময় লাগবে, কিন্তু পারব।
হাসান হাত থেকে দুরবিন নামিয়ে বলল, আচ্ছা যাও।
সত্যি যাব?
হ্যাঁ, সত্যি যাবে। তোমাকে সাঁতার দিয়ে নৌকা পর্যন্ত যেতে বলেছি, তার কারণ আছে। কারণটা পরে বলব।
হাসান চায়ের কাপে চুমুক দিল। তার দৃষ্টি আকাশে। সূর্য পশ্চিমে ডুবছে, কিন্তু লাল হয়ে আছে পুবের আকাশ। এটা একটা আশ্চর্য ঘটনা। মানুষের চারদিকে সবসময় আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে থাকে। খুব কম মানুষই তা নজর করে।
