সীতা অপহরণের খবর ইত্তেফাক পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছাপা হলো। মওলানা ভাসানী বগুড়ার এক জনসভায় সংখ্যালঘুদের অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে সীতার অপহরণের প্রসঙ্গ তুললেন।
ফরিদের মামলা আবার কোর্টে উঠেছে। হাবীব কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে দোতলা থেকে নামতেই প্রণব ছুটে হাবীবের হাত থেকে ব্রিফকেইস নিতে নিতে বলল, আপনার কাছে আমার একটা আবদার।
হাবীব বললেন, বলো কী আবদার?
আবদার রক্ষা করলে সারা জীবন আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকব।
হাবীব বললেন, কেনা গোলাম তো হয়েই আছ। নতুন কেনা গোলাম কীভাবে হবে।
প্রণব মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, তাও ঠিক।
আবদারটা কী বলো।
নারায়ণ চক্রবর্তীর মেয়ে সীতাকে উদ্ধারের একটা ব্যবস্থা যদি আপনি করেন। মেয়েটাকে আমি দেখেছি। ফাংশানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত। পরীর মতো মেয়ে, কিন্নর কণ্ঠ।
হাবীব বললেন, তোমার কথায় যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছি। তোমার কি ধারণা ডাকাতি আমি করিয়েছি।
না না, ছিঃ ছিঃ কী বলেন!
তাহলে মেয়েটাকে উদ্ধার করব কীভাবে?
আপনি যদি একটু ওসি সাহেবকে বলে দেন। পুলিশের পক্ষে এটা কোনো বিষয়ই না। সব অপরাধীর সঙ্গেই তাদের যোগাযোগ।
হাবীব বললেন, সুযোগমতো বলব।
প্রণব হঠাৎ হাবীবকে চমকে দিয়ে মেঝেতে বসে দু’হাতে তার পা চেপে ধরল। কাঁদো কাদো গলায় বলল, স্যার মেয়েটাকে উদ্ধার করে দিন। স্যার স্যার গো…
হাবীব বললেন, ভালো বিপদে পড়লাম তো।
প্রণব বললেন, আপনি স্বীকার না করা পর্যন্ত আপনার পা আমি ছাড়ব না। ভগবান সাক্ষী, আমি ছাড়ব না।
বিদ্যুত কান্তি দে’র বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার চাকরিটা চলে গেছে। বৈধভাবেই গিয়েছে। সে ছিল লিভ ভ্যাকেনসিতে। যার ছুটির কারণে বিদ্যুত চাকরি পেয়েছে। তিনি Ph.D করে চাকরিতে জয়েন করেছেন।
চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, বিদ্যুত, ভেরি সরি। তোমার মতো ব্রিলিয়ান্ট একজন শিক্ষককে আমরা রাখতে পারছি না।
বিদ্যুত বলল, আমি হিন্দু এই কারণে রাখতে পারছেন না।
এই ধরনের কথা তোমার কাছ থেকে আশা করিনি। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনকানুন জানো।
বিদ্যুত বলল, লিভ ভ্যাকেন্সিতে আমরা তিনজন ছিলাম। দু’জন মুসলমান একজন হিন্দু। চাকরি শুধু হিন্দুটার গেছে। যদিও সেই হিন্দু মালাউনের একাডেমিক কেরিয়ার সবচেয়ে ভালো। সে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছে, আবার এমএসসিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছে।
বিদ্যুত, তুমি উদ্ধত ভঙ্গিতে কথা বলছ।
স্যার, আমি মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে আমি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন। আমার কণ্ঠস্বর এবং মাথা সবসময় নিচু রাখতে হবে।
তুমি আরও কিছু বলবে, নাকি কথা শেষ?
যাবার আগে আপনাকে প্রণাম করে একটা কথা শুধু বলব।
প্রণামের প্রয়োজন নাই—কী কথা বলতে চাও বলো।
বিদ্যুত প্রণাম করতে করতে বলল, আমরা প্রয়োজনের কাজের চেয়ে অপ্রয়োজনের কাজ বেশি করি। যাই হোক, কথাটা বলি। স্যার, পাথরে ঘুণ ধরে না।
তার মানে কী?
আপনি পচা কাঠ। পাথর না, তাই ঘুণ ধরেছে। আমি পাথর। ঘুণ আমাকে ধরবে না।
নরসিংদীর এক গ্রাম, নয়নাতলা।
বিদ্যুত মাথা নিচু করে তার বাড়ির উঠানে বসে আছেন। টিনের বাড়ি। নতুন টিন লাগানোয় ঝকঝক করছে। বাড়ির উত্তরে কুয়া কাটানো হয়েছে। কুয়ায় পানি ওঠেনি, তারপরের কুয়াতলা বাঁধানো। বাড়ির পেছনে টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। টিউবওয়েলের পানি মিষ্টি।
সবই করেছে বিদ্যুত। বেতনের টাকার প্রায় সবটাই বাড়ির পেছনে চলে গেছে। এখন সে নিঃস্ব। বাড়িতে আসার খরচ জোগাড় করার জন্যে সে হাতঘড়ি এবং লেকচারস অব ফাইনম্যান বই বিক্রি করেছে।
সময় দুপুর। বিদ্যুৎ রোদে পিঠ মেলে বসে আছে। রোদে গা চিড়বিড় করছে, সে নড়ছে না। বিদ্যুতের মা সরলা দরজা ধরে দাঁড়ালেন। মানুষটা ছোটখাটো।চোখেরহারা দৃষ্টি। সরলা বলেন, বাবা তোর হাত কি খালি?
বিদ্যুৎ হ্যাঁ–সুচক মাথা নাড়ল।
বড় মাছের একটা টুকরা ভেজে দেই, খা।
মাছ কোথায় পেয়েছ?
সরলা জবাব দিলেন না। বিদ্যুৎ বলল, বাবার পুরানা অভ্যাস যায় নাই।
সরলা বললেন, না।
বাবা কই?
জানি না। মনে হয় সেতাবগঞ্জের হাটে গেছে। আজ হাটবার।
মা, ঘরে কি লেখার কাগজ-কলম আছে?
কলম আছে। কসজ নাই।
বিদ্যুৎ বলল, ঠিক আছে লাগবে না।
সরলা বললেন, আমার কাছে একটা সুর চেইন আছে নিয়া যা, স্বর্ণকারের দোকানে বেইচা দিয়া কাগজ কিন্যা আন।
কাগজ লাগবে না।
বাবা একটা কথা বলি, রাখবি?
ব্যাথার মত কথা গুম রাখব। অন্যায় কথা রাখব না।
অন্যায় কথা না বান্ধব কথা। চল ইন্ডিয়া চলে যাই।
নিজের দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।
ইন্ডিয়ায় গেলে তুই সহজে চাকরি পাবি।
চাকরি আমি এখানেই পাব। দেশজুড়ে আন্দোলনের কারণে সব বন্ধ। আন্দোলন একটু কমুক। চাকরি না পেলেও চলবে।
কীভাবে চলবে?
মা, আমার অনেক বুদ্ধি। বুদ্ধি বেঁচে টাকা জোগাড় করব।
বুদ্ধি কার কাছে বেচবি?
যার বুদ্ধি নাই তার কাছে।
সরলা বললেন, আমার কাছে বেচ, আমার বুদ্ধি নাই।
বলতে বলতে সরলা হাসলেন, বিদ্যুৎ হামল।
বিদ্যুতের বাবা হরি সেতাবগঞ্জের হাটে একটা ছাগলের দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। পুরুষ্ট ছাগল, ভালো দাম পাওয়ার কথা। হরি অল্পদামেই ছাগল ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। কুড়ি টাকা পেলেই তিনি ছেড়ে দিবেন।
ছাগলটা তাঁর না। হাঁটে আসার পথে এক বেগুনক্ষেত থেকে তিনি ধরেছেন। ছাগলের মালিকের এই হাটে আসার সম্ভাবনা আছে। তবে সে তার ছাগল দেখে চিনতে পারবে না। ছাগলের দাড়ি তিনি কাঁচি দিয়ে সুন্দর করে কেটে দিয়েছেন। ছাগলের মুখের কাছে সাদা রঙ কালো জুতার কালি ঘষে কালো করেছেন। এইসব সরঞ্জাম সবসময় তার সঙ্গেই থাকে।
