হাজেরা বিবি বললেন, জানলে জানস। এখন আমারে বোতলের মিজিকটা আরেকবার দেখা।
বোতলের ম্যাজিক তোমাকে অনেকবার দেখিয়েছি। আর দেখাতে ইচ্ছা করছে না। তাছাড়া আমার মনটা আজ খারাপ।
বাপ আটক দিছে এইজন্যে মন খারাপ?
দাদি তুমি তো সবই জানো। শুধু শুধু কেন জিজ্ঞেস করছ?
হাজেরা বিবির চোখ হঠাৎ চকচক করে উঠল। তিনি আনন্দিত গলায় বললেন, আমারে একবার আমার শ্বশুরআব্বা আটক দিয়েছিলেন। বাপের বাড়ি নাইয়র যাইতে দিবেন না। আমারে নাইয়র নিতে আমার বড় ভাইজান আসছে। বিরাট নাও নিয়া আসছে। শ্বশুরআব্বা তারারে ফিরত পাঠাইছেন। আমি খবর পাইয়া কী করলাম নবি?
শুনতে চাচ্ছি না, ভয়ঙ্কর কিছু তুমি করেছ বুঝতে পারছি।
হাজেরা বিবি হাসিমুখে বললেন, ওন না, শুনলে মজা পাবি। আমি শ্বশুরআব্বার মাথা কামানির ক্ষুর হাতে নিয়া তার কাছে গেলাম। তারে বললাম, আপনে যদি এক্ষণ আমারে বাপের বাড়ি না পাঠান এই ক্ষুর আমি নিজের গলায় বসায়ে দিব। কথা শেষ কইরা ক্ষুর বাইর কইরা গলার কাছে ধরলাম শ্বশুরআব্বা বললেন, হাত থাইকা ক্ষুর নামাও। আমি ব্যবস্থা নিতেছি।
নাদিয়া বলল, আমি কি বাবার একটা ক্ষুর নিজের গলার কাছে ধরব?
হাজেরা বিবি পান ছেচনি হাতে নিতে নিতে বললেন, সেইটা তোর বিবেচনা।
ময়মনসিংহ বার্তা পত্রিকার সম্পাদকের নাম নিবারণ চক্রবর্তী। সম্পাদকের রাত আটটায় আসার কথা। তিনি আটটা বাজার আগেই চলে এসেছেন। ছোটখাটো মানুষ। পুরুষ্ট গোঁফ আছে। ধুতির ওপর কালো কোট পরেছেন। ধূর্ততা মাখানো ছোট হেট, চোখ চিন্তিত মুখে হাবীবের চেম্বারে বসে আছেন। জরুরি তলবের কারণ ধরতে পারছেন না। হাবীব ঠিক আটটায় চেম্বারে ঢুকলেন।
নারায়ণ চক্রবর্তী হাতজোড় করে বললেন, নমস্কার।
হাবীব বললেন, আদাব। ভালো?
জি ভালো।
পত্রিকা কেমন চলছে?
আমার পত্রিকা অপুষ্ট রুগ্নশি, কোনোমতে বেঁচে আছে। নিজের প্রেস থাকায় রক্ষা। প্রেস না থাকলে পত্রিকা কবেই উঠে যেত।
কত কপি ছাপেন?
দুইশ আড়াইশ কপি।
বিক্রি কত কপি হয়?
অল্প কিছু হয়। সবই চলে যায় সৌজন্যে। ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়াই।
হাবীব বললেন, আপনি সাহসী মানুষ। আপনার সাহসের তারিফ করি।
সাহসের কী দেখেছেন?
হিন্দুরা ধুতি ছেড়ে দিয়েছে। আপনি পরছেন। সাহসী কর্মকাণ্ড। মাঝে মাঝে এমন কিছু খবর ছাপেন যা অন্য কেউ ছাপবে না। সাহসের অভাবেই ছাপবে না। আপনার সাহস আছে, আপনি ছাপেন।
কোন খবরের কথা বলছেন?
উদোর পিণ্ডি নিয়ে একটা খবর পড়লাম।
না জেনে ছাপাই নাই। জেনে ছাপায়েছি।
তাই তো করা উচিত। কেউ আপনাকে বলল, চিলে আপনার কান নিয়ে গেছে। আপনি কানে হাত না দিয়েই ময়মনসিংহ বার্তায় লিখলেন, একটা বড় চিল, ময়মনসিংহ বার্তার সম্পাদকের কান নিয়া আকাশে উড়িয়া গেছে। সেটা কি ঠিক?
নারায়ণ চক্রবর্তী অস্বস্তি নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। তার চোখ পিটপিট করছে। তিনি গলা খাকারি দিয়ে বললেন, আমাকে একজন এই খবরটা দিয়েছে।
একজনটা কে?
সম্পাদকের নীতিমালায় খবরের সোর্স বলা যায় না।
আপনি যে বিরাট নীতিবাগিশ লোক সেটা জানা ছিল না। দেশ থেকে নীতি উঠে গেছে। আপনার মধ্যে আছে। অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। আচ্ছা আপনি যান। আপনার সঙ্গে কথা শেষ।
নারায়ণ চক্রবর্তী বললেন, আমাকে কী জন্যে ডেকেছেন তা পরিষ্কার বুঝলাম না।
যথাসময়ে বুঝবেন। যে হাজি সাহেবের মামলা নিয়ে সংবাদ ছেপেছেন তিনি যখন কুড়ি লাখ টাকার মানহানির মামলা করবেন তখন বুঝবেন। টাকাপয়সা কি আছে?
আমি দরিদ্র মানুষ।
একটা প্রেস আছে, দরিদ্র হবেন কেন? প্রেস বেচে দিবেন। ইন্ডিয়াতেও নিশ্চয়ই বিষয়সম্পত্তি করেছেন। বসতবাটি আছে না?
জল খাব।
অবশ্যই জল খাবেন। মুসলমান বাড়িতে এসেছেন বলে আপনাকে পানি খাওয়ায়ে দিব তা না। প্রণব, উনাকে কাঁসার গ্লাসে জল দাও।
নারায়ণ চক্রবর্তী ভীত গলায় বললেন, খবরটা যদি ভুল হয় বিজয়ের দিলে ছাপায়ে দিব।
হাবীব বললেন, জয়েন্ডার বিজয়ের কিছু কেউ দিবে না। গায়ের চামড়া রক্ষার জন্যে নিজেই যা করার করবেন। দেশরক্ষা আইনে যারা গ্রেফতার হচ্ছে তারা সবাই হিন্দু। এই বিষয়টাও খেয়াল রাখবেন। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ এই বাগধারা কি শুনেছেন?
শুনেছি।
‘ছেলে বোবা কালা, বাপ নাম রেখেছে তর্কবাগিশ’—এটা শুনেছেন?
না। আপনার পত্রিকা বোবা কালা, আপনি নাম রেখেছেন তর্কবাগিশ। কাজটা ঠিক হয় নাই। আপনার সঙ্গে কথা বলে অনেক সময় নষ্ট করেছি, আর করব না। আপনি জল খেয়ে চলে যান। ওসি সাহেব আসবেন, তার সঙ্গে জরুরি আলোচনা। আপনার বিষয়েই আলোচনা।
আমার বিষয়ে কী আলোচনা?
পুলিশ একটা হত্যা মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। মামলা শেষ পর্যায়ে, এখন আপনি উল্টাগীত গাইছেন। পুলিশ কি বিষয়টা সহজভাবে নিবে?
যে-কোনো ভুলেরই সংশোধন আছে।
সংশোধনের বিষয় নিয়ে চিন্তা করা শুরু করে দেন। হাতে সময় বেশি নাই।
ওসি সাহেব রাত নটায় এলেন। তার সঙ্গে দরজা বন্ধ করে হাবীব মিটিং করলেন। খাওয়াদাওয়া করে ওসি সাহেব সাড়ে দশটার দিকে চলে গেলেন। ভোর তিনটায় ময়মনসিংহ বার্তা সম্পাদক গ্রেফতার হলেন দেশরক্ষা আইনে। ময়মনসিংহ বার্তা বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল।
মফস্বল শহরের ছোট্ট একটা পত্রিকার বাজেয়াপ্তের খবর কোথাও উঠল না। নারায়ণ চক্রবর্তী জেলহাজতে বসেই খবর পেলেন, তার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতরা নগদ টাকা এবং স্বর্ণালঙ্কারের সঙ্গে তাঁর কিশোরী কন্যা সীতাকে নিয়ে গেছে। সীতার বয়স চৌদ্দ। সে এই বছরই এসএসসি পরীক্ষা দিবে।
